আমজাদ হোসেন – বাংলাকাল https://banglakal.com বাংলা আজ যা ভাবে, দুনিয়া ভাবে কাল। Mon, 20 Oct 2025 08:50:03 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=6.9.4 https://i0.wp.com/banglakal.com/wp-content/uploads/2025/03/cropped-Logo-with-BG.png?fit=32%2C32&ssl=1 আমজাদ হোসেন – বাংলাকাল https://banglakal.com 32 32 242431868 ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৬ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-6/ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-6/#respond Mon, 20 Oct 2025 08:50:01 +0000 https://banglakal.com/?p=1116 ~আমজাদ হোসেন

পরদিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ে বাবাছেলে ফিরছে। তাদের বাড়ির কিছুটা দূরে আছে ছোট্ট একটা খেলার মাঠ। গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলের মাঠ। প্রাচীর বিহীন এই মাঠে তার শৈশব কৈশর কেটেছে। এক সাথে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল যারা তাদের মধ্যে সে আর রনি ছাড়া কেউই কলেজের গণ্ডি দেখেনি। মাধ্যমিক অবশ্য জনা পাঁচেক দিয়েছিল। তারা এখন সকলেই সংসারি। সবার সাথেই এখনও বন্ধুত্ব আছে। কেউ কেউ আজকাল রাতুলকে বিয়ের জন্য বলতে শুরু করেছে। দুএকজন এমনও আছে যারা পড়া লেখায় ভালো ছিল তারা রাতুলের কাছে এসে আপসোস করে পড়তে পারেনি বলে।

সেই শৈশবের স্বর্গের পাশ দিয়ে আসার সময় রাতুল লক্ষ্য করল একটা পোড়া মাটির তৈরি গোল মত কি পড়ে আছে। সেটা তুলে নিতেই কেমন একটা গন্ধ এলো তার নাকে। মনে পড়েছে এটা তো গাঁজার কলকে। তাহলে কি এখানে বসে লোকেরা রাতে গাঁজা খেতে শুরু করেছে। তার গ্রামের ছেলেরা এত অধপতনে গেছে।

রাতুল থেমে গিয়েছিল বলে তার বাবা কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। পাশে ছেলেকে না পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল রাতুল কিছু একটা দেখছে। কাছে এসে বুঝতে পারল তার হাতে কি ওটা।

-ফেলে দে খোকা। ওপাড়ার কিছু ছেলে রাতের বেলা এখানে আড্ডা দেয়। আজকাল তারা এসব খেতে শুরু করেছে।

-মড়লরা কিছু বলেনা বাবা?

-কি বলবে, মড়লদের ছেলেরাও এতে আছে।

আর কোনো কথা না বলে ছেলের হাত থেকে কলকে টা ফেলে দিয়ে হাত ধরে বাড়ি নিয়ে গেল।

আজকাল পাড়ার মানুষেরাও অনেক বেলা করে উঠতে শুরু করেছে। এ সবই মোবাইলের আশির্বাদ! এখনও তাদের বাড়ির সকলেই খুব সকালে উঠে পড়ে। কানিজ জায়নামাজে বসে পড়ছে। পাশে রেহেলের উপর রাখা আছে কোরান। নামাজের পরে কিছুক্ষিন কোরান পড়া তার অভ্যাস। মাও পড়ে। এখন কানিজ ভৌতবিজ্ঞান পড়ছে। রাতুল পাশে গিয়ে বসল।

-কি রে কি পড়ছিস?

-দেখতে পাচ্ছিস না কি পড়ছি?

-আজকাল খুব কথা ফুটেছে তোর। কি ব্যাপার বল তো?

-ফুটবে না? আমি কি তোমার সত বোন নাকি?

বেস কিছুক্ষন খুনসুটির পর রাতুল কানিজ কে পড়াতে শুরু করল। একমাত্র বোনের মেধার বিকাশ দেখে সে ভীষণই পুলকিত। তার না হলেও বোনটা নিশ্চয় কিছু একটা করতে পারবে। ঘরের ভিতর ফোন রিং হচ্ছে। রাতুল উঠে গেল। লীনার ফোন।

লীনা আজকাল একটু বেশি বেশিই ফোন করছে না তাকে? মনে মনে ভাবতে ভাবতে ফোনটা রিসিভ করল। ওপার থেকে লীনা সুপ্রভাত জানিয়ে তাকে বহরমপুরে যাবার জন্য অনুরোধ করল। কারণ জানতে চাইলে সে রাতুলকে জানাল, এটা নাকি সার্প্রাইজ। গেলেই জানতে পারবে। সে যাবে কি যাবে না ভবাছে। লীনা এবার ভীষণ আকুতি করে বলল-

-প্লিজ রাতুল না বলো না। তাছাড়া তোমার স্কুল তো বন্ধ।

-আচ্ছা আসছি।

ফোন রাখতেই তার মনে অনেক প্রশ্ন দেখা দিল। লীনা কি চাইছে তার কাছে? সে তো সামান্য বন্ধু ছাড়া আর কিছুই না। বড়লোকের মেয়েদের এই সমস্যা, তারা কখন কি ভাবে বোঝা দায়। যদিও লীনা খামখেয়ালী মেয়ে মোটেই নয়। কেন যে তাকে ডাকল তাও বলল না।

বাইরে থেকে মা ডাক দিল-

-পান্তা খাবি খোকা?

পান্তা রাতুলের প্রিয় খাবার। কানে আসতেই বিছানা থেকে নেমে মায়ের কাছে এসে একটা পাটি বিছিয়ে বসে গেল। একটা বেশ বড়ো বাটিতে পান্তা দিল মা।

-কি নিবি? তরকারি নাকি…

-না না, কাচা লঙ্কা আর পেয়াজ লবন দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে দাও। আগে যেমন দিতে।

ছোট্ট খোকার মত রাতুল পরম তৃপ্তিতে পান্তা খেতে লাগল। পান্তার জলটা চুমুক দিয়ে খেয়ে বলল-

-মা আমি একটু পরে বহরমপুর যাব। ফিরতে সন্ধ্যা হবে।

-কেন কোনো কাজ?

-না মা, একজন বন্ধু ডাকল।

এতক্ষণে কানিজ পাশে বসে গরম গরম রুটি খাচ্ছিল আলুভাজা আর আচার দিয়ে। সে মুখ টিপে হেসে বলল-

-বন্ধু নাকি বান্ধবীরে দাদা?

-তুই মার খাবি কিন্তু কানিজ? কপট রাগ দেখিয়ে উঠে গেল। মা কানিজকে ধমক দিয়ে বলল-

-এই তোর মুখে কি কিছুই আটকায় না?

-না মা, আমি দখেছি দাদার ফোনে এতদিন কোনো মেয়ের নাম্বার সেভ ছিল না। কয়েক মাস থেকে লীনা নামে একটা নাম্বার যোগ হয়েছে।

-তুই চরম শয়তান তো! রাতুলের ফোন ঘাঁটিস।

-সেই লীনা সারাদিনে অন্তত তিনচার বার ফোন করে। হে হে হে।

-এতে হাসির কি আছে শুনি। চুপচাপ খেয়ে পড়তে বস গে যা।

রাতুল বড় হয়েছে। তার মেয়ে বান্ধবী আছে! ভাবতে মা হিসাবে ভালোই লাগল আলেয়া বিবির। রাতুলের মা সে, তাকে কেউ ফোন করে এটা তো এক রকম প্রাপ্তি। আজকাল তো স্কুলের ছেলেরা বান্ধবী নিয়ে ঘোরে, সেক্ষেত্রে তার রাতুল একটা স্কুলে মাস্টারি করছে। হোক সে একবছরের জন্য। তার বান্ধবী থাকবে না? মেয়েটা নিশ্চয় খুব সুন্দর দেখতে হবে। একেবারে পরীদের মত। ছোট্ট চাঁদ মুখে তার নিশ্চয় সব সময় হাসি লেগে থাকে। আহা এমন সুন্দর একটা বউ ঘরে আনার খুব ইচ্ছে তার। কবে যে সে দিন আসবে কে জানে।

রাতুল বাড়ি থেকে বেরবে, এমন সময় মা তার হাতে একশ টাকার পাঁচটা নোট ধরিয়ে দিল। বলল কাছে রাখ, দরকার হলে খরচ করিস। সে কিছু না বলে বোকার মত মায়ের মুখের দিকে চেয়ে আছে। মা তাড়া দিল-

-অমন হা করে আছিস কেন? বের। আমি মেঝেতে ছাঁচ দেব তুই বেরলে।

বেরিয়ে পড়ল। বাসস্টপ পর্যন্ত সে একটা কথা বার বার ভেবেছে- মায়েরা কীভাবে বুঝতে পারে সন্তানের প্রয়োজনের কথা? সে তো চায় নি। অথচ তার দরকার ছিল। কারণ তার কাছে যে কটা টাকা আছে তা জামাল সাহেবের বাড়িতে বাক্সের মধ্যে। কাল তো তাকে শূন্য হাতে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সত্তিই কি মায়েরা অন্তর্যামী? একটা মানুষ যার কোনো উপার্জন নেই সে কীভাবে অভাবের সংসারেও টাকা জমাতে পারে। রাতুল আগেও লক্ষ্য করেছে, মাঝে মাঝে তার বাবাকে অল্প অল্প টাকা বের করে দিতে। কিন্তু কীভাবে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর হয়ত আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। শুধু জানে মা যারা তারা সব পারে।

বাসে উঠে আজ সৌভাগ্য বসত সিট পেয়েছে সে। একটু পরেই ব্যাগ থেকে একটা উপন্যাস বের করল। সমরেশ মজুমদারের ‘ডানায় রোদের গন্ধ’। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বর্তমান সময়ের ঢাকা শহর। সেখানের শিক্ষিত যুবক যুবতীরা কীভাবে সংগ্রাম করে জীবনে জাতে ওঠার চেষ্টা করছে সেটা এ উপন্যাসের উপজীব্য। তুষার আহম্মেদ এ কাহিনীর নায়ক। গ্রামের অভাব ক্লিষ্ট সন্তান। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়তে এসে চাকরির জন্য তার যে লড়াই এবং সেই লড়াই তাকে নিয়ে গিয়ে ফেলবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে ম্যানহাটন শহরে। নায়িকা দিলারা অসুস্থ বাবার এক মাত্র মেয়ে। ভার্সিটিতে পড়ে। কবিতা লেখার সখ তার। শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে হয় আয়ার কাজ নিয়ে পোর্ট সৈয়দ শহরে।

বাস এসে যখন বহরমপুর মোহনা বাসস্ট্যান্ডে দাড়াল তখন বইটা প্রায় শেষের দিকে। ব্যাগের ভিতর বইটা ঢুকিয়ে নেমে পড়ল। এখন বেলা প্রায় এগারোটা। এই সময় এখানে পা রাখার যায়গা থাকে না। তার উপর টোটোর ভিড়। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যে পারছে ঢুকে যাচ্ছে যেখানে খুশি। আজকাল আবার পকেট মারের উৎপাত বেড়েছে। লকডাউনের আগে এমনটা ছিল না। বেশ নিশ্চিন্তে বহরমপুরের যে কোনো প্রান্তে যাওয়া যেত যে কোনো সময়। কিন্তু আজকাল আর সেটা সম্ভব হয় না। সবই অর্থনৈতিক অবনমনের প্রভাব।

বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে সমবায়িকা মোড়ে দাঁড়িয়ে রাতুল ফোনটা বের করল। লীনাকে একটা ফোন করা দরকার। ঠিক কোথায় যেতে হবে তা তো বলেনি। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল পাঁচটা মিসড কল। লীনা ফোন করেছিল।

কল ব্যাক করল রাতুল। একবার রিং করতেই ওপার থেকে অভিযোগ ভেসে এল-

-কি ব্যাপার ফোন তুলছ না কেন?

-সাইলেন্ট মোডে ছিল। বুঝতে পারিনি।

-তুমিতো মহা কেয়ার লেস! রাস্তায় বেরিয়ে কেও ফোন সাইলেন্ট রাখে?

-বুঝতে পারিনি কখন সাইলেন্ট মোড অন হয়েছে।

-আচ্ছা, এখন কোথায় আছ তুমি? জানতে চাইল লীনা।

-আমি তো সমবায়িকা মোড়ে। কোথায় আসব?

-তুমি সোজা ডিএম বাংলোর সামনে চলে এসো।

-আচ্ছা আসছি। বলে ফোন কেটে দিল রাতুল।

দ্রুত পায়ে হেঁটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেল। কিন্তু আশেপাশে লীনাকে দেখতে পেল না। ঠিক তখনই লীনা আবার ফোন করল-

-তুমি পৌঁছে গেছো?

-হ্যাঁ, কিন্তু কোথায় তুমি?

-তুমি দুমিনিট দাড়াও। কলটা আচমকা কেটে গেল।

রাস্তা পেরিয়ে মাঠের দক্ষিণপশ্চিম কোনে গিয়ে দাড়াল সে। স্কয়ার ফিল্ড নামে খ্যাত এই মাঠ। বলা যেতে পারে এ শহরের প্রাণকেন্দ্র। সারাদিনে কত মানুষের আনাগোনা এখানে তার ইয়াত্তা নেই। গোটা মাঠের চারিধার সুন্দর করে বাধানো হয়েছে। লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা হয়েছে বাধানো অংশ। তার পাশ দিয়ে চার পাঁচ ফুট চওড়া কংক্রিটের রাস্তা। সকালে বিকালে এই পায়ে হাঁটা রাস্তা দিয়ে শহরের নাগরিকরা হাঁটাহাঁটি করে। মাঠের চারিধারে আছে বহু প্রাচীন মেহেগুনি, শিরিশ,কৃষ্ণচূড়া গাছ। তার ছায়া তলে কত মানুষ বসে আছে। কেউ আছে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে। কেউ আছে অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণের সময়ের অপেক্ষায়। আবার কেউ কেউ হতাশ হয়ে মাথা নামিয়ে দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে বসে আছে। কপতকপতির সংখ্যাও নিতান্ত কম নেই। তারা নিজেদের মিথ্যা জীবনের স্বপ্ন বুনছে একে অন্যের হাত ধরে। তাদের কাছে চা কফি বাদাম ছোলা পেয়ারা পৌঁছে দিচ্ছে একদল গরীব ফেরিওয়ালা।

রাতুল একটু ঘন ছায়া খুঁজে নিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। কোথা থেকে একটা চা ওয়ালা এসে সামনে দিয়ে চলে গেল। তার মাথায় নানান ভাবনা এক এক করে জড় হচ্ছে। লীনা হটাত তাকে এখানে কেন ডাকল? এখানে আসতে বলার কারণ কি? আর কেনই বা সে এলো?

সে কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সাথে দুএকবার এসেছিল এখানে। তার ভালো লাগেনি। কেন শুধু শুধু সময় অপচয় করবে। পকেট থেকে বারফোনটা বের করে আনমনে নাড়া চাড়া করছে। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। আজকের দিনে যার নিজের হাতে একটা স্মার্টফোন থাকে না তার এভাবে এখানে একদমই মানায় না। কোনো দিন যে কিনতে পারবে তারও সম্ভাবনা নেই। কারণ তাকে বাবার জন্য সবকটা টাকা সঞ্চয় করে রাখতে হবে। এক টাকাও অনর্থক অপচয় করা যাবে না।

-হাই রাতুল। পিছন থেকে লীনা আচমকা ডেকে উঠল। রাতুল চমকে উঠে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল তাকে। একটা সাদা চুড়িদার পরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে আলতো হাসি। উঠে দাড়াল সে। বোকার মত জিজ্ঞেস করল-

-কেন ডেকেছ বলো?

-এখনি শুনবে? খুব তাড়া আছে নাকি?

-না না।

কি বলবে সে বুঝতে পারছে না। এই প্রথম কোনো মেয়ের সাথে দেখা করতে আসা। কি বলতে হয় না হয় কিছুই সে জানে না। অবশ্য গল্প উপন্যাস সিনেমাতে অনেক দেখেছে সে। প্রেমের প্রথম প্রথম এমনই হয়। কিন্তু বাস্তব আর সাহিত্য তো এক জিনিস নয়। তাহলে সে কি লীনার প্রেমে পড়েছে? মনে হতেই রাতুল ভিতরে ভিতরে চমকে উঠল। তা কি করে সম্ভব! কোথায় তার অবস্থান আর কোথায় লীনার। বামন হয়ে এমন স্বপ্ন কেন আসবে তার মাথায়? স্বভাবিক হয়ে রাতুল বলল-

-আসলে তুমি কেন ডেকেছ সেটাই তো জানি না। তাই আর কি।

-ও এই কথা। বলেই লীনা ঘাসের উপর বসে পড়ল। রাতুল এখনও দাঁড়িয়ে আছে ক্যাবলার মত।

-কি হল বসো।

রাতুল একটু দুরত্ব বজায় রেখে বসল।

-বাড়িতে সবাই কেমন আছে? জানতে চাইল লীনা।

-আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে সকলে।

-আর তোমার স্কুলের খবর?

-সবই তো খবরে প্রকাশ। তুমিও জানো।

-স্কুল কবে খুলবে কিছু বলেছে স্যার?

-না, পরিস্থিতি শান্ত না হলে কি করে খুলবে। তাছাড়া স্কুল গেটের সামনেই মার্ডার। আবার রাতুলের মনটা ভারি হয়ে গেল। তার শুধু মনে হয়, কেন এই মানুষগুলো এমন করে। এরা কি বোঝে না, নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে। ভাই হয়ে ভাইকে হত্যা করছে।

লীনা বুঝতে পারে রাতুলের মনের অবস্থা। প্রসঙ্গ ঘোরাতে সে বলে –

-বেশ তো ভালোই হল। এই কদিন মন দিয়ে প্রস্তুতি নাও। আবার তো পরীক্ষা হবে বলছে।

-আর পরীক্ষা! হলেই বা কি হবে? আমাদের তো আর হবে না।

-এভাবে হাল ছেড়ো না রাতুল। মনে রেখো, একটা চাকরিও যদি লিগ্যালি হয় সেটা যেন তোমার হয়।

রাতুলের মুখে শুকনো হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটি এত পজিটিভ কি করে? এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কেউ যে এভাবে পজিটিভ ভাবতে পারে সেটা ভেবে অবাক হচ্ছে সে।

-আজ রবীন্দ্র সদনে একটা প্রগ্রাম আছে, বেলা দুটো থেকে। তোমার জন্য আমি একটা সিট বুক করেছি?

-কী প্রগ্রাম? আগে বলোনি তো! রাতুলের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

-গেলেই বুঝতে পারবে।

আর প্রশ্ন করেনি সে। লীনা নিশ্চয় খারাপ কিছুতে ইনভলব করাবে না। এতদিনে তাকে রাতুলের একজন নিস্বার্থ শুভাকাঙ্খী বলেই মনে হয়েছে। তায় এখন আর প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। সত্তিই মেয়েটি অমায়িক। সে খনও ভাবেনি এমন একজন মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে পারবে।

রাতুলের ঠিক বামদিকে একটু দূরে দুজন ছেলেমেয়ে হেসে হেসে গল্প করছে। তাদের বয়স কত হবে? বড়ো জোর সতেরো আঠারো। হয়তো তারা খুব ভালো বন্ধু, অথবা প্রেম করছে। এত অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে কি করে লোকে? জীবনটাকে না বুঝেই প্রেম! ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে রাতুল। তাহলে অন্যরাও কি তাকে আর লীনাকে এক সাথে বসে থাকতে দেখে ভাবছে, তারা প্রেম করছে? সে কি করে সম্ভব! কোথায় লীনা আর কোথায় সে। না না তাদের এখানে এভাবে বসা ঠিক হচ্ছে না।

-চা দেব ম্যাডাম চা? চা ওয়ালার আওয়াজে রাতুল সামনে তাকাল। লীনা বলল-

-তুমি কী খাবে চা না কফি?

রাতুলের বাড়িতে শুধুমাত্র শীতের সকালে মাঝে মাঝে মা লাল চা করে। এর বাইরে চা পান করাকে বিলাসীতা বলেই মনে হয় তার। আর কফি সেতো দুরের কথা। তবে দুএকবার সে কফি পান করেছে। বেশ ভালোই লাগে। চা এর থেকে যেন কফির মধ্যে একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে।

-কি হল চা না কফি?

-কফি। কফির কথা বলেই সে মনে মনে অবাক হল। নিজেকে একটু একটু করে অচেনা মনে হচ্ছে তার। মনে পড়ছে, দাদু বলত- ‘সময় আর সুযোগের অভাবে মানুষ যেন মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। বুঝলি দাদুভাই তুই অনেক বড়ো মানুষ হবি। তোকে হতেই হবে। জানিস, রাতুল বেঁচে থাকার অধিকার কেউ তোকে দেবে না। অর্জন করতে হয়। তুই পারবি রাতুল তুই পারবি। পারতে তোকে হবেই’। দাদু আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে কি বলত দাদু? রাতুল কি মানুষ হতে পেরেছে?

কাগজের কফি কাপে চুমুক দিয়ে রাতুল যেন মানুষ হল আরও একটু। এভাবেই একটু একটু করে তাকে মানুষ হতে হবে। সমাজের চোখে তারা যেন মানুষ নয়। তার বাবা অন্যের মুদির দোকানে কাজ করে। সে তো কর্মচারী, মানুষ নয়! মানুষ হতে গেলে লাগবে টাকা। অনেক না হলেও পর্যাপ্ত পরিমানে টাকা। যাদের সেই টাকা নেই তারা এই সমাজের চোখে মানুষ নয়! কেউ কর্মচারী, কেউ টোটোওয়ালা, কেউ শ্রমিক, কেউ মজুর। তারদের মানুষ হতে হবে! রাতুলকে মানুষ হতে হবে! দাদু প্রায়ই বলত- “জাতে উঠতে হবে রাতুল, তোকে জাতে উঠতে হবে।”

-কফি ঠান্ডা হয়ে যাবে তো। কী ভবাছ অত তুমি? লীনা ভেবেছে সে হয়ত স্কুলের কথা ভাবছে অথবা তার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাবছে। কিন্তু সে কি করে জানবে রাতুল এখন মানুষ হবার কথা ভাবছিল।

-কই কিছু না তো। কথা ঘোরাল সে। দুজনে নীরবে কফি পান করেত লাগল।

হাতে সস্তার একটা ডিজিটাল ঘড়ি পরে রাতুল। এই তার একমাত্র শখ। কবজি উলটিয়ে দেখল, এখন বারোটা তিরিশ বাজে। কোন সকালে পান্তা খেয়ে বেরিয়েছে। বেশ খিদে পেয়েছে তার। বাড়িতে থাকলে এতক্ষন কিছু না কিছু খেয়ে ফেলত। কিন্তু এখানে কি খাবে সে। আসার সময় মা তাকে পাঁচশ টাকা দিয়েছে। তার কাছেও শ’দুয়েক ছিল। সে একা থাকলে সস্তার কোনো হোটেলে সবজী ভাত খেয়ে নিত। কিন্তু সাথে তো লীনা আছে। কোনো রেস্টুরেন্টে যাওয়া দরকার।

-চলো ওঠা যাক। রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল লীনা।

-কেন? দুটো বাজতে অনেক দেরি তো।

-খেতে হবে না? পনে একটা বাজে তো।

লীনা কি অন্তর্যামী? সে তো এতক্ষণ খাবারের কথায় ভাবছিল। ও জানতে পারল কীভাবে? অবাক হয়ে রাতুল জানতে চাইল-

-তুমি বুঝলে কীভাবে যে আমার খিদে পেয়েছে? আমিতো বলিনি।

-সত্যি তুমি বোকা আছো। আমাকে অনেক খাটতে হবে তোমায় নিয়ে।

-তুমি এমন রহস্য করে কথা বলছ কেন? কীভাবে জানলে বলো?

-বলছি চলো।

দুজনে উঠে পড়ল। রাস্তায় উঠে একটা টোটো ধরল লীনা। টোটোওয়ালাকে আদি ঢাকা হিন্দু হোটেলে যাবার কথা জানিয়ে দুজনেই উঠে পড়ল। রাতুল সামনের সিটে বসতে যাচ্ছিল। লীনা তাকে তার পাশে বসার ইশারা করল। একটু জড়োসড়ো হয়ে বসল পাশে।

-জানো ওখানে এত ভ্যারাইটিস রকমের মাছ রান্না হয় কি বলব। বছরের যে কোনো সময়ে যাও। যে মাছ চাইবে ওরা দেবে। রান্নাও হয় অসাধারণ। আমি তো মাঝে মাঝে যাই।

রাতুল কি করে জানবে এত কিছু। সে তো কখনও এসব ভাবতেও পারেনি। মায়ের হাতের রান্না তার কাছে অমৃত। বর্ষার কয়েকটা মাসে গ্রামের খালে প্রচুর মাছ হয়। তখন খুব সস্তা মাছের ঝোল রান্না করে তার মা। সবই দেশি মাছ। চোখ বন্ধ করলেই রাতুল সেসব ঝোলের স্বাদ পায়। আহ মায়ের হাতের রান্না!

-তোমাকে আজ আমি ট্যাংরা মাছের ঝোল খাওয়াবো। দেখবে মুখ থেকে ছাড়াতে পারবে না।

-নিশ্চয় অনেক দাম না? কি বলা উচিৎ না উচিৎ কিছুই যেন রাতুল বুঝতে পারছে না। তাই বোকার মতো এই কথাটাই বলে ফেলল।

-আরে না না। দাম খুব বেশি না। তবে ফুট পথের দোকান গুলোর থেকে একটু বেশি।

হোটেল থেকে বেরিয়ে লীনা আবার একটা টোটো ধরল। রাতুলকে বিল দিতে দেয়নি সে। রাতুল আপত্তি করলেও সে শোনে নি। পাশে বসে রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল-

-তুমি রাগ করেছ?

-এর পরে কখনও খেলে কিন্তু আমি বিল দেব। অভিমানের সুর চড়িয়ে উত্তর দিল সে।

-আচ্ছা বাবা তাই হবে। এখন বলো কেমন লাগল খেতে?

-একেবারে আমার মায়ের হাতের ট্যাংরার ঝোলের মতো। বিশ্বাস করো মায়ের রান্নার স্বাদ এর থেকেও ভালো। তবে এরা মশলা কিছু বেশি দিয়েছে।

-তাহলে তো একদিন খেতে হয় দেখছি ! কি বলো খাওয়াবে না?

-নিশ্চয়! তবে তো তোমাকে আমাদের বাড়ি যেতে হবে?

-যেতেই তো চাই। বিড় বিড় করে বলে উঠল লীনা। রাতুল ঠিক স্পষ্ট শুনতে পেল না।

-কি বললে?

-না কিছু না। যাব একদিন।

তারপর লীনা কথা ঘোরাল। একথা সেকথা বলতে বলতে টোটো এসে তাদের রবীন্দ্রসদনে পৌঁছে দিল। রাতুল তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে দিল। দুজনে পাশাপাশি হেঁটে প্রবেশ করল সদন চত্তরে। এই কবছরে সদনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চারিদিকে উঁচু পাচীরে ঘেরা সদন চত্তর। পায়ে হাঁটার রাস্তা গুলো পাথর দিয়ে বাঁধানো। প্রাচীরের ভিতরে অনেক ফুলের গাছ। ঝাও গাছও আছে অনেক গুলো। মূল গেটের সামনে গোল করে ঘিরে সেখানে বিদেশি ফুলের গাছ বসানো হয়েছে। তার দুই পাশ দিয়ে অর্ধবৃত্তাকার পথ চলে গেছে সদনের মূল ভবনের সামন।

এখনও লোকজন তেমন প্রবেশ করেনি। লীনা রাতুলকে নিয়ে রিসেপশনে গেল। সেখানে টিকিট দেখিয়ে সদনের ভিতরে নির্ধারিত আসনের দিকে এগোল।

বাইরের তীব্র আলো থেকে এসে ভিতরটা কেমন অন্ধকার মনে হল রাতুলের। হলের মাঝ বরাবর রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। এখন অনেকটা পরিষ্কার মনে হচ্ছে তার। বিরাট হল ঘর। কলেজে পড়ার সময় একটা প্রগ্রামে এসেছিল সে। তখন এত চাকচিক্য ছিল না। এসি চালানো হয়েছে। বাইরের তুলনায় ভিতরের ঠান্ডাটা বেশ ভালোই লাগছে রাতুলের।

লীনা একেবারে সামনের দিকের দ্বিতীয় সারির দুটো সিট দেখিয়ে রাতুলকে বলল-

-এ দুটো সিট আমাদের। চলো বসে পড়ি।

রাতুল কোনো কথা না বলে বসে পড়ল। তার পাশের সিটে বসল লীনা। এখন একটা বেজে পঁয়তাল্লিশ। অনুষ্ঠান শুরু হতে আরও পনের মিনিট বাকি। রাতুল অবাক বিস্ময়ে চারিকিদ দেখছে। মঞ্চে কত বড়ো বড়ো কালো পর্দা ঝোলানো। একজন সেখানে কি সব পরীক্ষা করছে। মঞ্চের বাম দিকে আছে পোডিয়াম। একজন লোক এসে সাউন্ট সিসটেম পরীক্ষা করে দেখল।

-তুমি আগে কখনও আসনি এখানে?

-কলেজে পড়ার সময় একবার এসেছিলাম। তবে ওই পিছনের দিকে বসে ছিলাম। এত সামনে এই প্রথম।

-আচ্ছা শোনো এখুনি অনুষ্ঠান শুরু হবে।

লীনার মুক থেকে এ কথা বেরতেই মঞ্চের পিছনে উপরের দিকে একটা সাদা কাপড়ের উপর লেখা ফুটে উঠল ‘রবীন্দ্র চর্চায় মূর্শিদাবাদের বাঙালি’। রাতুলের মন আনন্দে ভরে উঠল। বাহ নিশ্চয় খুব ভালো মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান হবে। এবার ঘোষক মাইকে ঘোষণা করলেন। তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, গান কবিতা আবৃত্তি আর রবীন্দ্র আলোচনা আজকের অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

একটু নড়ে বসে রাতুল লীনাকে ধন্যবাদ জানাল, এমন সুন্দর অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দেবার জন্য। পিছনের দিকে দেখল সে, এতক্ষণে অনেক লোকের সমাগম ঘটেছে হলে। বাহ কত সংস্কৃতি মনা মানুষ বাস করে এই শহরে। আর তার গ্রামের মানুষ হয়তো এসব কথা ভাবতেই পারে না। সে নিজেই কি আজ সকাল পর্যন্ত ভাবতে পেরেছিল? তার মনের সুপ্ত মানুষটি যেন সত্তিই আনন্দে আত্মহারা। সে আজ রবীন্দ্র সদনে রবীন্দ্র চর্চার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে, এটা কম কীসের।

-রাতুল আমাকে এবার মঞ্চে যেতে হবে। কিছুক্ষণ পরে তোমার কাছে ফিরে আসব। বলেই লীনা মাঝের রাস্তা দিয়ে মঞ্চে উঠে গেল। তখনি মাইকে সঞ্চালক ঘোষণা করলেন-

-অনুষ্ঠেনে আগত সকল মননশীল নাগরিককে জানাই রাবিন্দ্রীক অভিনন্দন। এখনি আমরা আমাদের অনুষ্ঠান শুরু করছি। আজ উদবোধনী সংগীত পরিবেশনের জন্য আমি অনুরোধ করছি বিশিষ্ট সংগীত ও বাচিক শিল্পী মাননীয়া নাজনীন খন্দেকার লীনাকে। লীনা আপনাকে মঞ্চে আসার জন্য অনুরোধ করছি।

রাতুল হতবাক হয়ে বসে আছে। তার ভাবনা যেন থেমে গেছে। সে কিছুই ভাবতে পারছে না। লীনা মঞ্চে উঠতেই করতালিতে ভরে গেল হল। তাহলে লীনা নিশ্চয় এদের কাছে জনপ্রিয় একজন শিল্পী। তা না হলে এত হাততালি কেন পড়বে? রাতুল হাততালি দিতেও ভুলে গেছে।

লীনার সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে ভরে যাচ্ছে রবীন্দ্রসদন। আর রাতুলের মনে তখন সম্ভব অসম্ভব যত ভাবনারা একসাথে জড়ো হতে শুরু করেছে। কোনো কিছুই সে স্বাভাবিক ভাবে ভাবতে পারছে না। তার মত একজন অতি সাধারণ মানুষের সাথে লীনা কেন এত মিশছে? তার কী এমন যোগ্যতা আছে যা দেখে লীনা তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছে? নাকি তাকে দয়া করছে মেয়েটি?

কখন গান শেষ হয়েছে, করতালিতে ফেটে পড়েছে হল ঘর তা টের পায়নি রাতুল। লীনা এসে পাশে বসে জিজ্ঞেস করল-

-খুব ভালো হয়নি বলো পরিবেশনটা?

অ্যাঁ! গানের সে তো কিছুই জানে না। ভালোমন্দ বিচার করবে কি করে? মুখে বলল-

-এমন বলছ কেন? ভালোই তো গেয়েছ।

-তাহলে তুমি হাত তালি দিলে না কেন?

এবার লজ্জায় পড়েগেল সে। কি বলবে এখন? তার মনের ভিতর তো চলছিল ভুমিকম্পের তোলপাড়। সে তো ঠিকঠাক শুনতেই পায়নি লীনা কী গেয়েছে। লজ্জা লুকাতে মুখে বলল –

-খুব ভালো গেয়েছ।

প্রায় দেড় ঘন্টার অনুষ্ঠান মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখল সে। আর কত কথা যে লীনা তার কানে ফিসফিস করে বলে গেল তার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। অনুষ্ঠান শেষে লীনা রাতুলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিষিষ্ট সাংবাদিক কবি সাহিত্যিক গবেষক দের সাথে। রাতুল এক নতুন জগতের সাথে পরিচিত হল। জীবনের এক নতুন অধ্যায় খুলে গেল।

রবীন্দ্রসদন থেকে বেরিয়ে লীনা দুটো কর্নেটো নিয়ে একটা রাতুলকে দিল। আইসক্রিম খেতে খেতে লীনা বলল-

-চলো হেঁটে যায়।

-কোথায় আবার যাবে?

-কেন তোমাকে বাসে তুলে দিতে।

-আমি তো একাই যেতে পারব। বোকার মত বলে বসলো রাতুল।

-আমি গেলে আপত্তি আছে তোমার?

লীনার এ কথার কোনো উত্তর দিতে পারল না সে। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল লালদিঘীর পাড় বরাবর রাস্তা দিয়ে। দিনের আলোর প্রখরতা কমে এসেছে। বিকেলের সোনালী আলো এসে পড়েছে লীনার মুখে। রাতুল তার মুখের দিকে তাকাতেই অভিভূত হয়ে গেল। একজন নারী যে এত সুন্দর মায়াবী মুখের অধিকারী হতে পারে তা রাতুল ভাবতেই পারছে না। তার ক্লাসের মেয়েগুলোকে দেখেছে, কই তাদেরতো এমন মনে হয়নি কখনও? তবে কি রাতুল লীনার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে ? তা কি করে সম্ভব, কোথায় সে আর কোথায়… না কি সব ভাবছে সে। নিজেই নিজেকে বোঝায়। হয়তো লীনা শুধু মাত্র তাকে বন্ধু মনে করে। তার থেকে বেসি কিছু নয়।

বাসস্ট্যান্ডের কাছে বেশ কিছু বই এর দোকান আছে পরপর। সেখান থেকে লীনা একগুচ্ছের বই কিনে রাতুলের হাতে ধরিয়ে দিল। এত বই রাতুল কখনও এক সাথে কেনার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সে আপত্তি করা সত্ত্বেও বই গুলো তাকে নিতে হল।

ঠিক তখনি তার পিচ্চি বোন কানিজের কথা মনে পড়ল। সে সাইন্সের বই খুব পছন্দ করে। সামনে রাখা ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির বইদুটো হাতে নিয়ে পাতা উলটে দেখল অনেক দাম। দুটো বই এ প্রাই এগারোশ টাকা। তার কাছে অত নেই। রেখে দিল সে। লীনা সেটা লক্ষ্য করে বলল-

-কার জন্য?

-কানিজ আমার বোনের জন্য। ও খুব পছন্দ করে। কিন্তু…

-ও দুটোও দিন দাদা। দোকানিকে উদ্দেশ্য করে বলল লীনা।

-কিন্তু অনেক দাম তো। বাধা দিতে গেল রাতুল।

-তোমার বোন কি আমার বোন নয়?

লীনার প্রশ্নে রাতুল আর কিছু বলতে পারল না। ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে বাসে উঠল সে। জানলার কাছে এসে লীনা তাকে বাড়ি ফিরে ফোন করতে বলে চলে গেল। যাবার আগে সে দেখতে পেল, বিকেলের শেষ আলোয় লীনাকে যেন কোন এক অজানা জগতের পরীদের মত মনে হচ্ছে। তার ছোয়াতে যেন পৃথীর সব অসুখ সেরে যাবে।

বাস ছুটে চলেছে বাড়ির দিকে। রাতুল তার স্বপ্নের জগত থেকে যেন খুব দ্রুত ফিরে আসছে বাস্তবের মাটিতে। তার বাব মা ছোট্ট বোন, তার এক বছরের চাকরি। চাকরির কথা মনে পড়তেই গতকালকের ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে পড়তেই সে আঁতকে উঠল। সে যে সমাজে বাস করে সেই সমাজ তো এর থেকে ভালো কিছু নয়। শুধু কি তার সমাজ, কান পাতলে যেন বাতাসের মাঝে শোনা যায় অসহায় মানুষের আহাজারি। সে তো সেই মানুষদের একজন।

]]>
https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-6/feed/ 0 1116
ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৫ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-5/ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-5/#respond Fri, 26 Sep 2025 13:39:37 +0000 https://banglakal.com/?p=1077 ~~আমজাদ হোসেন

বিকেলের পড়ন্ত রোদ রাতুলের মুখে এসে পড়েছে। ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে গ্রামের পথ ধরে। বহু বছর আগে কোনো এক সময় এই রাস্তা পাকা হয়েছিল। তারই অবশিষ্ট কিছু পাথর আজও দাঁত বের করে আছে। তারা যেন এই গ্রামের মানুষগুলোকে দেখে আর দাঁত বের করে হাসে। কোথাও পিচের এতটুকু চিহ্ন নেই। গত বিশ বছরে প্রতিবার ইলেকশনের সময় প্রতিটা দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে একমাত্র রাস্তা পাকা করে দেবার। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। পিচ তো দূরের কথা এ রাস্তা ঢালাই করার কথা কেউ ভাবেনি। কলেজে পড়ার সময় রাতুল ‘পাগলাপুর’ নামে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিল। এ গ্রাম যেন কিছুটা পাগলা পুরের মত। ভোট ফুরিয়ে গেলে আর কেউ খোজ নেয় না। অবশ্য গ্রামে তিন তিনটে বুথ থেকে তিনজন মেম্বার পঞ্চায়েতে যায়। তারা কিছুই করে না। প্রায় সকলেই অশিক্ষিত। কাজের ব্যাপারে হয় কিছুই বোঝে না। অথবা জেনে বুঝে কোনো এক অজানা কারনে চুপ থাকে।

রোদের তীব্রতা আর নেই। রাতুল খুব ধীরে হেঁটে চলেছে। পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে ধুলো উড়িয়ে বাইক চলে যাচ্ছে। তাতে প্রায় সে ঢেকে যাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে স্নান না করে ঘরে ওঠা যাবে না। হটাত বাড়িতে ঢুকতে দেখলে তার মা বোন কি কি ভাবতে পারে তার সম্ভাব্য একটা লিস্ট মাথায় আসছে। তারা ভাববে, স্কুলের অন্যদের সাথে মনমালিন্য হয়েছে বলে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে সে। অথবা ভাববে তাকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথাবা… ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠল। বাড়ি থেকে মা ফোন করেছে। রিসিভ করতেই মায়ের উদ্বিগ্ন কন্ঠ কানে এলো-

-খোকা কেমন আছিস তুই? তোর কিছু হয়নিতো খোকা? রাতুল বুঝতে পারছে এতক্ষণে সবাই জেনে গেছে। দুই জন মানুষ স্পটে মার্ডার। তার পরেও গোলা গুলি। ব্যাপারটা তো এখন ছড়িয়ে পড়বেই। মা কে আস্বস্ত করে বলল-

-মা আমি ভালো আছি। বাড়ি আসছি। এখন গ্রামের রাস্তায় হাঁটছি। কিছুক্ষণ পরেই বাড়ি ঢুকছি।

-ঠিক আছে খোকা তাড়াতাড়ি আয়। ফোন কেটে দিল। রাতুলের মনে হল, মা চিরদিন মা’ই। সন্তানের জন্য কি আকূলতা। পেটে ধরেছিল বলেই? নাকি লালন করেছে বলে এতো চিন্তা? মায়ের জন্য হটাত তার মন কেঁদে উঠল। চোখ ছলছল করে উঠল। কি আশ্চর্য এই তো তিন দিন আগেই বাড়ি থেকে গেছে।

আবার ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখল লীনা ফোন করেছে। আচ্ছা মা নাহয় গর্ভে ধারন করেছে, লালন পালন করেছে বলে তার জন্য এত চিন্তা করছে। কিন্তু লীনা কেন ফোন করেছে? সে কীসের জন্য তাকে নিয়ে এত ভাবে? নিশ্চয় সেও এতক্ষণে শুনেছে আকন্দপুরের ঘটনা। সেজন্যই হয়তো তার খোঁজ নিতে ফোন করেছে। সাধারণত লীনা এ সময় ফোন করেনা। তাহলে লীনার তার জন্য এত দুশ্চিন্তা কীসের? মায়ের সাথে লীনাকে মেলানোর চেষ্টা করল। না কিছুতেই তার হিসাব মিলছে না। তবে কী সত্তিই রক্তের সম্পর্কের বাইরেও সম্পর্ক আছে! দ্বিতীয় বার ফোন বেজে উঠল।

-হ্যালো লীনা।

-তুমি ঠিক আছতো রাতুল? সে অবাক হল। এভাবে লীনা কখনও তাকে ডাকেনি। তার জন্য এমন ভাবে কেউ ভাবতে পারে, কেউ তার জন্য দুশ্চিন্তা করতে পারে তা সে ভাবতেই পারে না। কলেজে পড়ার সময় ক্লাসের মেয়ারা তার দিকে তেমন তাকাত না। রাতুলের পোষাকে একটা দারিদ্রতার ছাপ থাকায় তারা তাকে সব সময় এড়িয়ে চলেছে। অবশ্য তানিয়ে রাতুলের কোনো মাথা ব্যাথা হয়নি কখনও।

আজ লীনার এমন দরদের ছোঁয়া পেয়ে রাতুলের ভিতরটা কেমন হয়ে গেল। তার যেন বাক রোধ হয়ে গেছে। পা দুটো চলছে আপন তালে। আবার লীনা কথা বলে উঠল-

-রাতুল শুনতে পাচ্ছ? তুমি ঠিক আছতো?

-হ্যাঁ লীনা ঠিক আছি। কথা গুলো অস্ফুট স্বরে রাতুলের গলা থেকে বেরিয়ে এল। সে জানতে চাইল-

-লীনা তুমি এমন করছ কেন?

-টিভিতে দেখাচ্ছে আকন্দপুরে দুই জায়গায় বোমা বাজি হয়েছে।

-দুই জায়গাতে মানে? শুধু তো পঞ্চায়েতে হয়েছে।

-আরে না না। তোমার স্কুলের সামনেও একটা মার্ডার হয়েছে।

রাতুল আঁতকে উঠল। বাড়ি আসার কথা জানিয়ে ফোন কাটল। তাহলে তারা বেরিয়ে আসার পর কি আরও খারাপ হয়েছে পরিস্থিতি? তখন বেরতে না পারলে কি যে অবস্থা হত, ভাবতেই কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমে উঠল। এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে তার ভিতর। আর কয়েক কদম এগোলেই তাদের পাড়ার গলি। দ্রুত পাচালানোর চেষ্টা করল সে। পা যেন চলছে না।

সন্ধ্যার ঠিক আগেই বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ছোটো বেলার বন্ধু ইব্রাহিম একটা মুদিখানার বারান্দায় বসে মোবাইলে খবর শুনছিল। রাতুলকে দেখে ডাকল-

-আরে রাতুল তুই বাড়িতে। এদিকে তোর স্কুলের সামনে যে মার্ডার হয়েছে জানিস? এই দেখ বলে মোবাইলটা দেখাল। রাতুল দেখতে পেল ঠিক তার স্কুলের মেইন গেটের সামনে একটা রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। মুখ চেনা যায় না। পরনে লুঙ্গী আর পাঞ্জাবি। বয়স্ক মনে হচ্ছে। কে হতে পারে। ইব্রাহিম যোগ করল তাকে জবাই করা হয়েছে। সে আর দাড়াতে পারল না। তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

মা আতঙ্কে বাড়ির সামনে পাইচারি করছিল। রাতুল আসতেই তার চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেল। মা ছেলের মাঝে আর কোনো কথা নেই। বাড়ির ভিতরে গিয়ে রাতুল জানাল স্নান করার কথা। কানিজ তাড়াতাড়ি এক পাতা সস্তার শ্যাম্পু সাবান আর গামছা দিল। অনেকক্ষণ সময় ধরে জল ঢালল। একটা সময় তার শীত করতে লাগলে সে জল ঢালা বন্ধ করল।

রাতে খেতে বসে মা রাতুলকে জিজ্ঞেস করল তার স্কুলের কথা। সেখানে কেমন চলছে সব, অন্যান্য স্যাররা কেমন, ছাত্রছাত্রীরা তার সাথে কেমন ব্যাবহার করে ইত্যাদি। সব কিছু ভালো শুনে বাবামা দুজনের মুখেই হাসি ফুটল। পিচ্চি বোন কানিজ ফোড়ন কেটে হলেও সত্যি কথাটাই বলল-

-শুধু স্কুলের সেক্রেটারি টা পাঁজি। তোর অর্ধেক টাকা মেরে দিচ্ছে বল।

তিন জনেই তার দিকে হাসি মুখে তাকাল। রাতুলের মনে পড়ল জামাল সাহেব কে মার্ডার করার প্ল্যানেই আজকের এই বোমাবাজি। হটাত তার মুখে একটা কালো ছায়া নেমে এল। বাবা সেটা লক্ষ্য করে বলল-

-ওসব নিয়ে তুই ভাবছিস কেন। যা হয়েছে তা ওদের স্থানীয় ব্যাপার। খেয়ে নে।

-তা নয় বাবা, আমি যার বাড়িতে থাকি তাকেই মারতে চেয়েছিল।

-বলিস কি? আঁতকে উঠল সকলে।

-তাহলে বাবা আর ওর বাড়িতে তোকে থাকতে হবে না। রাতুল মাথা নাড়ল। কানিজ দাদার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। বাবা খাবার শেষ করে থালাতে হাত ধুয়ে উঠতে উঠতে বলল-

-আর কবে যে এদের বুদ্ধি হবে।

সবার খাওয়া শেষ হলে বাইরের বারান্দায় রাখা চৌকিতে বসল। এটা এ বাড়ির একটা অনেক দিনের অভ্যাস। রাতুলের বাবা বলেন দিনে অন্তত একবার পরিবারের সকলের একত্র বসা ভীষণ জরুরী। তাতে সংসারে একে অন্যের প্রতি বন্ধন দৃঢ় হয়। রাতুলের দাদা দাদি বেঁচে থতে তারাও বসতেন। কিন্তু তারা এখন নেই। দাদা মারা গেছে আজ বছর পাঁচেক হল। আর দাদি গেল এই তো সেদিন, কোরোনার দ্বিতীয় ঢেউএ। না তার দাদির করোনা হয়নি। বয়স হয়েছিল। স্বাভাবিক মৃত্যু। তবুও গ্রামে কেউ কেউ রটিয়েছিল করোনায় মরেছে বলে। অবশ্য পাড়ার মানুষ তেমন আমল দেয়নি।

বাবা রাতুলকে জিজ্ঞেস করল সে একবছর পর কি করবে কারণ তার চাকরিটা এক বছরের। রাতুল পড়ার বাইরে যে কোনো পরিকল্পনা নেই তা জানাল। তাছাড়া সে চায় এই কমাসের টাকা যা জমবে তা দিয়ে তার বাবা যেন নিজে একটা ছোট্ট করে হলেও মুদির দোকান করে।

-তোর টাকা নিয়ে আমি দোকান করব কেন? তুই কিছু কর।

-না বাবা আমি এখনও কয়েক বছর চাকরির চেষ্টা করে দেখি। না হলে শেষে তোমার দোকানে বসব।

-তা বলে তোর প্রথম উপার্জনে…

রাতুল কিছুটা অভিমানের সুরে বলল-

-বারবার তুমি ‘তোর টাকা’ কথাটা কেন বলছ? আমার টাকা মানেই তো তোমার। কোনো কথা নয়, অনেক হল অন্যের দোকানে কাজ করা। আর কয়েকটা মাস কর। তারপর নিজের দোকান চালাবে। আমাদের জন্য অনেক স্যাক্রিফাই করেছ।

-খোকা তো ঠিকই বলছে। তাছাড়া তোমার যে মালিক তাকে বললে সে নিশ্চয় অখুশি হবে না। মালপত্র কিছু ধারেও পাবে।

রাতুল বাধা দিয়ে বলল-

-না, খুব ছোটো করে দোকান করো। অল্প অল্প মাল রাখ। কিন্তু ধারে একদম না। ধারে যেমন মাল আনবে না। তেমনি ধারে বিক্রিও করবে না।

কানিজ মজা করে হেসে উঠে বলল-

-আমি ভাবছিলাম, দাদার টাকাতে আমি একটা আইফোন কিনব। না তা আর হবে না।

-নারে, তোর আই ফোন এখন সাইন্সের বই। ওদিকে একদম মন দিস না। পড় অনেক অনেক পড়তে হবে তোকে।

আমি মজা করলাম। তুইও না একটা বুদ্ধু। তবে মা, আজকাল ভাইয়ার রাতে একটা ফোন আসে! বলেই হে হে করে হাসতে হাসতে পালাল। রাতুল তার পিছু পিছু নেমে গেল। বাবমা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মনেই প্রশ্ন- তবে কি রাতুল এতদিনে প্রেমে পড়েছে?

ঘুমনোর আগে রাতুলের মা বাবা অনেক স্বপ্ন বুনল তাদের এক বছর পরের মুদির দোকান নিয়ে। মা জানাল, বাড়িতে দোকান হলে সেও সময় দিতে পারবে। আসন্ন সুখের স্বপ্ন দেখতে দেখতে তারা ঘুমিয়ে পড়ল।

রাতে আনারুল স্যার ফোন করে রাতুল কে জানাল দুটো নয়, মোট তিনটে মার্ডার আর যখম হয়েছে অন্তত আট দশ জন। তাঁর কাছে জানতে পারল স্কুল গেটের সামনে যাকে মারা হয়েছে সে এবার জামাল সাহেবের বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়াবে বলে ঠিক হয়েছিল। সেই নাকি প্রথমে জামালকে মারতে লোক লাগিয়েছিল। পরে জামালের লোকেরা তাকে তাড়িয়ে এনে স্কুলের সামনে প্রথমে গুলি করে। পায়ে গুলি লেগে পড়ে গেলে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কবে যে আবার স্কুল খুলতে পারবে তাঁর ঠিক নেই। প্রায় তিরিশ মিনিট ধরে অনর্গল কথা বলে গেলেন ভদ্রলোক। তাতে রাতুল যা বুঝল, এই জামাল লোকটা মোটেই সোজা নয়। তাকে বিরোধীরা বহুবার মারতে গিয়েও পারেনি। এবার দিয়ে পাঁচ বার হল। তার চোখের উপরের কাটা দাগটা এরই সাক্ষী। তবে জামাল লোকটার একটা গুন নাকি খুব ভালো তা হল, সে কখনও মদ ও মেয়েদের দিকে নজর দেয় না। ফোন রাখার পর মনে মনে বলল- যে মানুষ হয়ে মানুষ হত্যা করতে পারে তার আবার ভালো গুন। স্কুল যতদিন না খোলে ততই ভালো। গেলেই তো আবার তাকে জামালের বাড়িতেই উঠতে হবে। জেনে বুঝে এমন মানুষের আশ্রয়ে সে কীভাবে থাকবে?

চলবে

]]>
https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-5/feed/ 0 1077
ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৪ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-4/ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-4/#respond Mon, 22 Sep 2025 09:09:23 +0000 https://banglakal.com/?p=1063 কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। ফজরের আজান কানে আসতেই ঘুম ভাঙল। মসজিদ এখান থেকে প্রায় পাঁচ সাতশ মিটার দূরে। বিছানা ছেড়ে ব্রাসে পেস্ট লাগিয়ে গামছা কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরল। ভোরের সৌন্দর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করে রাতুল। প্রাতক্রিয়া সেরে হাত মুখ ধুয়ে একেবারে অযু করে নিল। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। 

গামছায় মুখ মুছতে মুছতে ঘরে এলো। একটা হলুদ রঙের টিশার্ট আর ট্রাকপ্যান্ট পরে বেরিয়ে পড়ল। বেরনোর আগে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিল। বারান্দা থেকে নেমে বেশ চওড়া উঠান পেরিয়ে সদর দরজা। দরজার পাশেই একটা ছোট্ট ঘরে দারোয়ান রহিম চাচা থাকে। চাচাও নামাজ পড়ে কিন্তু মাঝে মাঝে আজান শুনতে পায় না। রাতুল ডাক দিল। সে হুড় মুড় করে উঠে গেট খুলে দিতে দিতে বলল-

-আজকাল কি যে হচ্ছে আজান শুনতে পাচ্ছি না। তুমি না ডাকলে নামাজটা কাজা হয়ে যেত।

-সমস্যা নেই, আমি ডেকে দেব রোজ। বলেই সে বেরিয়ে গেল। 

মসজিদে যখন পৌছাল তখন নামাজ শুরু হতে কয়েক মিনিট দেরি আছে। ভিতরে প্রবেশ করে দেখল অন্যান্য দিনের মত আজও গুটি কয়েক সাদা মাথার মানুষ এসেছে। 

নামাজ শেষ করে সোজা ফিরে এলো। স্বাস্থ্য সচেতন হলেও অন্যান্যদের মত বিলাসী মর্নিং ওয়াকে যাবার ইচ্ছা তার হয় না। তাছাড়া এটা গ্রাম, এখানে ওসব বেমানান লাগবে। ফেরার সময় মাঠ মুখি অনেক লোকের সাথে দেখা হয়। সকলেই প্রায় তার দিকে তাকিয়ে সরল হাসি বিলিয়ে দেয়। রাতুল তার উত্তরে হাসি ফিরিয়ে দেয়। কেউ কেউ অবশ্য দুএকটা কথাও বলে। তাদের মধ্যে একজন জাব্বার চাচা। সেই প্রায়ই কথা বলে। লোকটা বেশ ভালো মনের বলেই মনে হয়। তার কথা ওই কেমন আছেন মাস্টার, আমার মেয়ে কেমন পড়ছে, একটু দেখবেন ইত্যাদি। 

ঘরে ফিরে বই নিয়ে বসে পড়ল। সকাল সাতটার সময় দরজায় টোকা পড়ল। এই কিছুদিনেই টোকাটা পরিচিত হয়ে গেছে। সারা রাতদিন যে রহিম চাচা দরজা পাহারা দেয়, সেই সকালের চা, দশটার ভাত, বিকেলের নাস্তা ও রাতের খাবার নিয়ে আসে। রাতুল রেঁধে খাবে বলে জানিয়েছিল জামালকে। কিন্তু তাতে সে রাজি হয়নি। স্বভাবচিত কর্কশ কণ্ঠে বলেছিল-

-আমার বাড়িতে থাকবে আর রান্না করে খাবে তা হতে পারে না। আমার বাড়ির খাবারই মাস্টারকে খেতে হবে। ব্যাস আর কথা বলতে পারেনি রাতুল। শুধু হেডমাস্টারের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে ছিল। তিনি ইশারায় মেনে নিতে বলেছিলেন। না মেনে উপায় ছিল না। কারণ অর্ধেক বেতনে সে বাড়ি থেকে রোজ যাতায়াত করতে পারবে না। আর এই গণ্ড গ্রামে অন্য কোথাও ঘর ভাড়াও পাবেনা সে। আর পাওয়া গেলেও, জামালের ভয়ে কেউ হয়ত তাকে ঘর দেবেই না। তাই অগত্যা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

দরজায় দ্বিতীয় বার টোকা পড়তেই রাতুল আওয়াজ দিল- খোলা আছে।

বয়স্ক রহিম চাচা একটা সাদা ট্রেতে করে চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। একি দেখছে সে! চায়ের সাথে আস্ত ডিমের টোস্ট তার সাথে ছোট্ট একটা প্লেটে ফল কাটা! রাতুল বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করল-

-কী ব্যাপার চাচা? আজ এত কিছু?

-জানি না বাপজান। বড়োলোকের খেয়াল। বলেই সামনে ট্রে রেখে চলে যাচ্ছিল। দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বলল-

-কিছু মনে না করলে একটা কথা বলব? ডিম টোস্টে সবে কামড় দিয়েছে রাতুল। রহিম চাচার প্রশ্নের উত্তরে তারদিকে তাকিয়ে বলল-

-অবশ্যই চাচা।

-তুমি একটু সাবধানে থেকো। বলেই অন্য কোনো কথার অপেক্ষা না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

মুখের ডিমটোস্ট মুখেই আটকে গেল। কি ব্যাপার আজ হটাত তাকে চায়ের সাথে এত খাবার কেন? একেবারে জামাই আদর যাকে বলে। আর রহিম চাচাই বা তাকে সাবধানে থাকতে কেন বলল? কী ধরনের সবধানতা তাকে অবলম্বন করতে হবে? কিছুই ভেবে পেলো না। কতক্ষণ যে সে এই ভাবে বসে ছিল কে যানে। এই তার এক প্রবলেম হয়েছে আজকাল। সব কিছুতেই বেশি ভেবে ফেলছে। বিছানায় পড়ে থাকা ফোন বেজে উঠতেই রাতুলের হুশ ফিরল। 

কামড়ানো টোস্টটা চিবোতে চিবোতে ফোন তুলে দেখল, কোম্পানির কল। চায়ে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করে ফেলল। একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। খাওয়া যাবে না। কোনো মতে টোস্টটুকু খেয়ে ট্রে টা সরিয়ে রাখল। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল এখন সকাল আটটা বেজে পনেরো মিনিট। মনে মনে হিসাব কষে আবার পড়াতে মন দিল। আজ স্নানের আগে একবার চাচার সাথে কথা বলতে হবে। জানতে হবে ঠিক কি ধরনের সাবধানের কথা তিনি বলতে চাইছেন?

ঠিক এই ভয়টা সে করছিল প্রথম থেকে। না আর জামাল সাহেবের অট্টালিকার কয়েদ খানার স্বেচ্ছা বন্দী বানাবে না নিজেকে। মাত্র এক মাস হয়েছে তার চাকরির। এখনও দশ মাস বাকী। বাড়ি থেকে যাতায়াত করাও সম্ভব নয়। স্কুলেও থাকার কোনো ব্যাবস্থা নেই। এদিকে জামালের বাড়িতে বেশিদিন থাকাও তার পক্ষে অসম্ভব। স্কুলের স্টাফ রুমে বসে এ সব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েছিল রাতুল। 

  -কি অত ভাবছেন রাতুল বাবু? সিনিয়র টিচার বিপিন বাবুর কথায় এক প্রকার চমকে উঠল সে। কিছু না বলে স্বভাব শুলভ হাসি দিল সে। বিপিন বাবু আবার বলে উঠলেন-

-এমন হোপ লেস হবেন না। বয়স কম। নিয়মিত পড়াটা চালিয়ে যান। স্কুল সার্ভিস হলেই ঝাপিয়ে পড়বেন। মনে রাখবেন একটা চাকরি যদি বৈধ ভাবে হয় তাহলে সেটা যেন আপনার হয়। 

আবারও হেসে উঠল সে। এখানে সেই একমাত্র ডেপুটেড, বাকিরা সকলে পার্মানেন্ট। বিপিন বাবু স্যার হিসাবে যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনি কখনও নেগেটিভ ভাবেন না। ছাত্রছাত্রিরা হয়ত সেজন্যই তাকে এত পছন্দ করে। 

-স্যার আপনার কি মনে হয়, এত দূর্নিতির, কেসের জটিলতার পরেও এস এস সি হবে? রাতুলের কথা অনেকটা মৃত্যু পথ যাত্রী যেমন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে ‘আমি বাচব তো’ ঠিক সেরকম শোনাল। রাতুলের কথায় অন্যান্য স্যাররা তার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। সে মুখ ফসকে এ কথা বলে নিজের কাছেই নিজে বোকা হয়ে গেছে যেন। বিপিন বাবু একটু ভেবে বললেন-

-দেখেন রাতুল স্যার। সরকারের মনের কথা আমরা জানি না। তবে আশাবাদী আমি। যেভাবেই হোক আজ না হলেও কাল স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ করতেই হবে। আর ‘স্যার’ ডাকের স্বাদ যখন আপনি একবার পেয়েছেন, তখন অন্য কাজ করতেও পারবেন না। 

রাতুল মুখে কিছু বলল না কিন্তু মনে মনে বিপিন স্যারের সাথে একমত হল। পাশ থেক রাহেলা ম্যাডাম বললেন-

-শুধু কি স্কুল সার্ভিস, কোনো সেক্টরেই নিয়োগ নেই। সর্বত্র হাহাকার। আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং করে বাড়িতে বসে আছে। 

-আপনার ছেলের কমপ্লিট হয়েগেছে? কিসের উপর করল? সব থেকে বয়স্ক স্যার আনারুল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। 

-কেমিক্যাল এ। ক্যাম্পাসিং নেই। যেসব কোম্পানি আসছে তারা দশ থেক পনের হাজার মত বেতন দিতে চাইছে। 

-বেকারত্বের সুযোগ আর কি! রাতুলের মুখ থেকে কথাটা আপনা থেকেই যেন বেরিয়ে এল। সকলে তার কথাকে সমর্থন করে মাথা নাড়ল। 

ঠিক তখনি বাইরে কোথাও প্রচন্ড আওয়াজ হল। একটা দুটো তিনটে চারিদিক চুপচাপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। আবার একড়া তীব্র খনখনে আওয়াজ। একটা নয়, এবার অনর্গল শব্দ হতে লাগল। বয়স্ক স্যার আনারুল সাহেব অস্ফুট স্বরে বলে উঠল “আবার শুরু হল”!

রাতুলের আর বুঝতে বাকি নেই কি শুরু হল। লড়াই শুরু হয়েছে। ওগুলো সব বোম আর বন্দুকের গুলি ছোড়ার শব্দ। একটা আতঙ্কের কালো ছায়া সকলের মুখে। হেড মাস্টার ছুটতে ছুটতে এসে স্টাফ রুমে ঢুকলেন। হাফাতে হাফাতে জিজ্ঞেস করলেন-

-স্কুলের কি হবে? 

-এখন ছুটি দিতে হবে না। আনারুল সাহেব বললেন। 

-তাহলে ছেলে মেয়েগুলোর… আতঙ্কে হেড মাস্টারের মুখ থেকে কথা বেরল না আর। তার ভয়ের বিশেষ কারণ হল, সে হিন্দু ধর্মের মানুষ। এটা পুরপুরি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম। নিরীহ মানুষটার ভয় একটু বেশি। আনারুল সাহেব তাকে অভয় দিয়ে বসতে বললেন-

-আপনি বসুন আমি দেখছি। বলেই স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার সাথে সাথে আরও একজন স্যারকে বেরতে দেখে রাতুলও বেরল। স্কুলে এখন প্রায় হাজার বারোশ ছাত্রছাত্রী আছে। সকলে ভয়ে নিরব হয়ে আছে। খুব ভয় পেলে সমবেত মানুষ হয় খুব চিৎকার করে নয়ত একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায়। প্রতিটা ক্লাস রুমে স্যারদের আসতে দেখে কেউ কেউ ডুকরে কেঁদে উঠল। সকলকে বাইরে বেরতে বারন করে মেন গেটে তালা লাগাতে নির্দেশ দিলেন আনারুল সাহেব। যদিও স্কুলের মাঠের দিকটা পুরপুরি ফাঁকা। 

স্টাফ রুমে ফিরে এসে হেড স্যারকে থানায় ফোন করতে বললেন। 

-আমি করব? 

-আপনি করলে ভালো হবে। আপনি পরিচয় দিন যে হেড মাস্টার বলছি।

থানা থেকে আশ্বাস এল এখনি পুলিশ পাঠানোর। তবুও সবার মুখ থেকে ভয়ের সেই কালো ছায়া সরেনি। এতক্ষণে সব চুপচাপ হয়ে গেছে। কিন্তু রাস্তায় একদল মানুষের ছোটা ছুটি শুরু হয়েছে। নিশ্চয় দুচার জন মার্ডার হল। বিড়বিড় করে উঠলেন আনারুল সাহেব। ‘কবে যে এই মূর্খদের জ্ঞান ফিরবে’। 

রাতুল এতক্ষণে কথা বলল-

-আমাদের এখানে না থেকে প্রতিটা ক্লাস রুমে থাকা উচিৎ। নইলে বাচ্চাদের মাঝে প্যানিক তৈরি হতে পারে। 

-ঠিক বলেছেন। যান যে যার ক্লাস রুমে গিয়ে বসেন। আর সকলেই বলবেন তেমন কিছু হয় নি। অন্য গল্প না করে পড়াতে শুরু করবেন। তাতে ওদের ভয় কেটে যাবে। এই রতন ঘন্টা দাও ক্লাস বসার। দেখো ছুটির ঘন্টা দিও না যেন। 

সকলে উঠে পড়লেন। হেড স্যার বাইরের বারান্দায় গিয়ে পাইচারি করতে লাগলেন। আনারুল সাহেব গিয়ে বললেন

-আপনি আপনার অফিসে গিয়ে বসেন। ভয় পাবেন না। আমরা আছি তো। 

হেড স্যার কিছু না বলে নিজের অফিসে গিয়ে বসলেন। অন্যান্য স্যাররা তখন নিজ নিজ ক্লাস রুমে ভয়ে ভয়ে পড়ানোর অভিনয় করছে। আর কান পেতে আছে কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে কি না। 

কিছুক্ষণ পরেই একটা পুলিশ ভ্যান এসে স্কুল গেটের সামনে থামল। রতন ভয়ে ভয়ে ছুটে গিয়ে গেট খুলে দিল। একজন অফিসার ও চারজন কন্সটেবল স্কুলের ভিতরে ঢুকল। পিছনে পিছনে রতন এলো। হেড স্যারের রুমে ঢুকতেই উঠে দাড়ালেন তিনি। বসতে বললেন সকলকে। অফিসার একটার চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। বললেন ভায় পাবার কোনো কারণ নেই। পঞ্চায়েতের সামনে বোমা বাজি হয়েছে। কয়েক রাউন্ড গুলিও চলেছে। স্কুলের তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। 

এরই মাঝে বেশ কিছু অভিভাবক স্কুলের সামনে হাজির হয়েছে তাদের সন্তানদের নিয়ে যেতে। অফিসার হেড মাস্টারকে স্কুল ছুটি দিতে বললেন। পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। রতন তাড়াতাড়ি ছুটির বেল বাজিয়ে দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্কুল খালি হয়ে গেল। 

আনারুল সাহেব আর রাতুল এসে প্রবেশ করল। অফিসার তাদের দিকে তাকিয়ে উঠে দাড়ালেন। আনারুল সাহেব তাকে বসতে বললেন-

-বসুন স্যার বসুন।

-আমাকে চিনতে পারেন নি স্যার? আমি ইব্রাহিম।

-কোন ইব্রাহিম? স্মৃতি পথে হাঁটার চেষ্টা করলেন। একটু পরেই বললেন-

-ইব্রাহিম শেখ? আমি যাকে ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলতাম?

-হ্যাঁ স্যার আমিই আপনার সেই বাঁদর খলিলুল্লাহ। বলেই হাত বাড়িয়ে দিল। আনারুল সাহেব হাত ধরে বুকে টেনে নিলেন। শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন তার প্রথম জীবনের বাঁদর ছাত্রটিকে। উপস্থিত সকলে অবাক বিস্ময়ে দেখল ছাত্র আর শিক্ষকের অটুট বন্ধন। 

এমন খারাপ সিচুয়েশনেও সকলের মনে একটা প্রশান্তির হাওয়া ছুঁয়ে গেল। এখানে সকলেই শিক্ষক। শিক্ষক জীবনের এই তো পরম প্রাপ্তি। আর কি চায়!

আবার সেই তীব্র আওয়াজ শুরু হল। ঠিক বোঝা যাচ্ছে দুই পক্ষ সামনা সামনি হয়ে গুলি ছুড়ছে। এবার বোমার আওয়াজ একটা দুটো তিনটা… 

পুলিশ অফিসার ইব্রাহিম বলে উঠলেন-

-দুদুটো মরার পরেও এদের সাধ মিটল না! আবার শুরু করল। 

-কি! দুটো মার্ডার হয়ে গেছে? আনারুল সাহেব আঁতকে উঠলেন।

-হ্যাঁ স্যার। আসলে প্রধানকে টার্গেট করেছিল। অল্পের জন্য তিনি বেঁচে গেছেন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত দুজন স্পটেই মারা গেচ্ছে। এখনও প্রধান সাহেব পঞ্চায়েত অফিসে আটকে আছেন। 

সকলে আঁতকে উঠলেন। আর রাতুলের জ্ঞান হারাবার অবস্থা। সে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে বসে পড়ল। আনারুল সাহেব সেটা লক্ষ্য করে তাকে আজ বাড়ি চলে যাবার পরামর্শ দিলেন। অফিসার ইব্রহিম বললেন-

-আমার মনে হয় কয়েক দিন স্কুল ছুটি দেওয়া উচিৎ। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে বোঝা যাচ্ছে না। 

সকলে একমত হলেন। স্কুলের গেটে অনির্দিষ্ট কালের ছুটির নোটিশ টাঙানো হবে। পুলিশের ভ্যানে করে সকল টিচার দের বাসস্টপ পর্যন্ত নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত হল। মুশকিলে পড়ল রাতুল। সে কি করবে। তার ফোনটা ছাড়া সব কিছুই তো জামাল সাহেবের বাড়িতে। তার কি এখন ও বাড়িতে যাওয়া ঠিক হবে। আবার না বলে বাড়ি চলে গেলেও তো খারাপ ভাবতে পারেন। উনি যা মানুষ তাতে তাকে চটানো মোটেই উচিৎ হবে না। 

ঠিক সেই সময় রাতুলের ফোনটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বের করতেই দেখতে পেল, জামাল সাহেব নিজেই ফোন করেছে। রাতুলের হাত কাঁপছে। সকলের দৃষ্টি এখন তার দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন ধরল-

-হ্যালো।

-মাস্টার তুমি আজ বাড়ি চলে যাও অথবা অন্য কোথাও গিয়ে থাকো। নিশ্চয় এতক্ষণে সব শুনেছ?

-জী শুনেছি। আপনি কেমন আছেন। 

-আমি ঠিক আছি। তুমি বাড়ি চলে যাও। কলটা কেটে গেল। আহত মানুষের মত মুখে বলল-

-জামাল সাহেব।

-কি বললেন? হেড মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন।

-বাড়ি চলে যেতে বললেন। 

-আলহামদুলিল্লাহ্‌। বেশ জোরে উচ্চারণ করলেন আনারুল স্যার। 

আর অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি অফিস বন্ধ করে স্যাররা বেরিয়ে পড়লেন। পুলিশ ভ্যানে অনেক ঠাসাঠাসি করে সকলে উঠে পড়লেন। কন্সটেবল কজন উঠলেন গাড়ির উপরে। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল বাসস্টপে। এতটা সময় কারও মুখে কোনো কথা ফোটেনি।

চলবে…

]]>
https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-4/feed/ 0 1063
ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৩ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-3/ https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-3/#respond Sat, 20 Sep 2025 06:42:05 +0000 https://banglakal.com/?p=1051 ~আমজাদ হোসেন

সেদিনের কাকতালীয় সাক্ষাতে দেওয়া কথার ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেছিল। স্কুল থেকে জুম্মার নামাজ পড়তে এসেছিল রাতুল। খুৎবার সময় সে লক্ষ্য করেছে, নামাজ শুধুমাত্র বয়স্করা পড়ে। অন্যান্য গ্রামে তবুও জুম্মার নামাযে কিছু ইয়াং ছেলেদের দেখা মেলে। কিন্তু এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। সবই সাদা মাথার লোক। ইমাম যিনি তিনিই একমাত্র যুবক। ভুল আরবি উচ্চারণে শতচ্ছিন্ন একটা পাতলা বই থেকে দেখে দেখে রিডিং পড়লেন। ব্যাস ওটাই এখানে খুৎবা। খুৎবা চলাকালীন মুচ্ছুলিদের অধিকাংশই প্রাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। 

নামাজ শেষে বাইরে আসতেই সেই ডাক কানে এল। ঘুরে দাড়াতেই দেখতে পেল, বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাতুল কয়েক কদম ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল-

-কিছু বলছেন দাদাজী?

-তাহলে কবে বসবে তুমি?

-কোন বসার কথা বলছেন বুঝলাম না!

-সেই যে গ্রামের ছেলেদের সাথে বসার কথা বলেছিলাম মনে নেই তোমার?

রাতুল ভুলে গেছে দেখে সে নিজেয় লজ্জায় পড়ে গেল। কথায় কথায় সে জানাল, এসে এখন জামাল সাহেবের রাড়িতে থাকছেন। এ গ্রামে থাকছেন জেনে ভদ্রলোক খুশি হলেন। কিন্তু জামাল সাহেবের নামটা যে তার পছন্দের নয় তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। রাতুল চলে যাচ্ছিল। বৃদ্ধ আবার ডাকলেন-

-শোনো, তুমি আমায় দাদাজী ডাকলে না?

-হ্যাঁ। হাসি মুখে উত্তর দিল রাতুল। 

তার পর কি যেন ভাবলেন ভদ্রলোক, বললেন ঠিক আছে তুমি যাও। আমি কাল তোমার সাথে দেখা করব। 

দুজনে দুইদিকের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। স্কুলে পৌঁছাতে ছাত্রছাত্রীরা রাতুলকে ছেঁকে ধরল। কে যেন রটিয়েছে, সে টিউশানি করাবে। ব্যাস ছাত্রছাত্রীরা টিউশন পড়ার জন্য আবদার করছে। কারন এ গ্রামে কোনো টিউশন মাস্টার নেই। সকল স্যারই অনেক দূর থেকে আসেন রোজ। রাতুল সামনে হেডমাস্টারকে দাঁড়িয়ে থেকতে দেখে তার দিকে স্বপ্রশ্নে তাকালেন। হেডমাস্টার মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো মতে বেরিয়ে এল। 

হেডমাস্টার তাকে নিজের অফিসে ডাকলেন। ভদ্রলোক অমায়িক মানুষ। সকলের ভালোর জন্য যেন তার প্রাণ কাঁদে। আর এই দূর্বলতার সুযোগ নেন অনেক টিচার। তারা এ সরলতার অপব্যাবহার করেন। রাতুলকে তিনি বললেন-

-আমিই ওদের বলেছি তুমি পড়াবে। স্কুলের একটা ঘরও তোমার জন্য বরাদ্দ করেদিয়েছি। চাবি দিয়ে যাব তোমাকে।

-কিন্তু স্যার…

-কোনো কিন্তু নয় রাতুল। তুমি আমার ছেলের বয়সী। অন্তত এটুকু করতে দাও আমাকে।

রাতুল আর কথা বলতে পারেনি হেড স্যারের সামনে। মাথা নিচু করে অনেকক্ষন বসেছিল। একসময় স্যার বলে উঠলেন-

-রাতুল, আমাদের অনেক পিছুটান। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারাই আমাদেরও প্রাণ কাঁদে। কিন্তু কিছুই করতে পারিনা। তোমার প্রাপ্য বেতনের অর্ধেক ওরা কেড়ে নিলেও আমি কিছু করতে পারছিনা। কিন্তু অন্যভাবে কিছুটা অন্তত যদি পুষিয়ে দিতে পারি, তার জন্য এই ব্যাবস্থা। প্লিজ তুমি না করো না।

-স্যার এভাবে বলে আমাকে পাপে ফেলবেন না। আপনার মত মানুষদের জন্যই আজও পৃথিবীটা বসবাসের উপযোগী। আমি আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ স্যার। 

-হয়েছে। আর বলতে হবে না। তাহলে কাল থেকেই শুরু করে দাও। আমি ওদের বেতন ঠিক করে দিয়েছি। এবং বলেছি মাসের শুরুতে দিতে হবে। 

-স্যার, গ্রামের মানুষ কীভাবে নেবে ব্যাপারটা?

-ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। মানুষগুলো অশিক্ষিত হলেও ভীষণ সরল। কয়েকজন গার্জিয়ানকে আমি বলে দিয়েছি। তোমার যাতে কোনো সমস্যা না হয়। তাছাড়া…

-তাছাড়া কী স্যার? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল রাতুল।

-আর যাই হোক জামালের বাড়িতে থাকলে কেউই তোমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে সাহস পাবে না।

বাইরে ঘন্টা বাজতেই রাতুল উঠে দাড়াল। তার নবম শ্রেণিতে ক্লাস আছে। হেড স্যারের কাছে পারমিশন নিয়ে ক্লাসে গেল। যেতে যেতে সে ভাবল- সত্যি আজও কিছু মানুষ আছে এই পৃথিবীতে। আর আছে বলেই সমাজ টিকে আছে। আজ অনেক দিন পর একটা প্রকৃত মানুষের সান্নিধ্য লাভ করতে পেরেছে ভেবে আনন্দিত হল। মনে মনে নিজেকে এমন পরপোকারী করে তোলার শপথ নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করল। 

প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করে আসছে, ছেলেমেয়ে গুলো অপরিচ্ছন্ন হলেও সত্যিই খুব সহজ সরল। তারা আজও শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে, ভালোও বাসে। হয়ত গ্রাম বলেই এটা সম্ভব। হয়তোবা শহরের প্রভাব সেভাবে পড়েনি বলেই এ গ্রামের ছেলেমেয়ে গুলো আজও ঋষি বালকদের মত পবিত্র হয়ে আছে। কিন্তু রাতুল কিছুতেই বুঝতে পারে না কীভাবে এই সরল শিশু কিশোররা ক্রমশ নেশায় জড়িয়ে পড়ে। কীভাবে তারা বড় হবার সাথে সাথে অপরাধ জগতের সাথে মিশে যায়! তবে কি এদের পরিকল্পিত ভাবে কেউ বা কারা ভুল পথে পরিচালিত করে? মনে মনে প্রশ্ন করতে থাকে নিজেই নিজেকে। 

ক্লাসে প্রথম প্রথম রাতুলের বেশ অসুবিধা হত পড়াতে। তার প্রধান কারণ, এই এলাকার ভাষার বিশেষ উচ্চারণ প্রবণতা। প্রচুর শব্দের বিকৃত উচ্চারণ এদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট। ধীরে ধীরে সেগুলো তার পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। সে চেষ্টা করছে ছাত্র ছাত্রীদের মান্য চলিত ভাষায় কথা বলার অভ্যাস করাতে। সে নিজেও গ্রামের ছেলে কিন্তু মা-বাবার সচেতনতাতে তার ভাষাগত দোষ নেই। 

ধীরে ধীরে রাতুল এ গ্রামের মানুষদের প্রিয় পাত্রে পরিণত হচ্ছে। আজকাল অনেক অভিভাবক তার কাছে নানান বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসে। কার ছেলেকে কোন বিষয়ে পড়াবে, কার মেয়ের কবে বিয়ে দেবে, এমন কি কেউ কেউ তো পারিবারিক সমস্যার কথাও তার সামনে অবলীলায় বলে যায়। এসব শুনে মাঝে মাঝে তার অস্বস্থি লাগে বইকি। কিন্তু কি আর করার। এই সব ফরমাইশ শুনতেই রাতুলের সন্ধ্যার অনেকটা সময় চলে যায়। কিছুটা সময় নষ্ট হলেও আজকাল আর খারাপ লাগেনা তার। সরল সাদাসিধে মানুষগুলোর মনের গভীরটা যেন সে স্পষ্ট দেখতে পায়। 

সকলে চলে যাবার পর রাতুল মাত্র বই খুলে বসেছে। ভিতরের দরজায় টোকা পড়ল। জামাল সাহেবের বিরাট বাড়ির বাইরের অংশে কয়েকটা ঘর আছে। এই ঘর গুলোর বাসিন্দাদের জন্য বাইরে স্নান, প্রাতকৃয়া প্রভৃতির জন্য ব্যাবস্থা করা আছে। বিরাট বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম বরাবর পরপর চার খানা ঘর বারান্দ সহ। একেবার পশ্চিম দিকের ঘরটা রাতুলের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। এই ঘরের উত্তর দিকে বারান্দা, পশ্চিমে বড়ো জানলা। জানলার পরেই মূল বাড়িতে প্রবেশের ঢালাই রাস্তা। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে নানান ধরনের পাতাবাহারের বাহার। এমন প্রাত্যান্ত গ্রামে এমন বিলাসী বাড়ি ভাবা যায় না। লোকটা অশিক্ষিত হলেও রুচি আছে বলতে হবে। 

রাতুলের ঘরের একটা বৈশিষ্ট, এই ঘরের সাথে বাড়ির ভিতরে যাবার একটা দরজা আছে। সেই দরজাতেই টোকা পড়েছে। তার এ ঘরে থাকা প্রায় এক মাস হয়ে গেল। আজই প্রথম টোকা পড়ল। কী ব্যাপার এ দরজায় তো টোকা পড়ার কথা নয়! একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করতে শুরু করেছে। কে হতে পারে ওপারে? আবারও টোকা পড়লো। এবার সে ভয়ে ভয়ে উঠে গিয়ে দরজার পাশে গিয়ে দাড়াল। জিজ্ঞেস করল- 

-কে আছেন ওদিকে?

-আমি জামাল। দরজা খোলো মাস্টার।

রাতুল ভয়ে ভয়ে দরজা খুলল। সেই স্কুলে প্রথম বার দেখেছিল। তারপর আর দেখা হয়নি। শুধু এ বাড়িতে আসার আগে ফোনে একবার কথা হয়েছিল। হেডমাস্টার নিজেই এসে তাকে রেখে গেছে। এ বাড়ির ভিতরে কে বা কারা থাকে তার কিছুই সে জানে না। জানার প্রয়োজন মনে করেনি। 

-কেমন আছো মাস্টার? সেই কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করল জামাল। রাতুল একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল-

-বসুন স্যার। এই বেশ চলছে।

-তা তোমার থাকতে টাকতে অসুবিধা হচ্ছে না তো?

-না না তেমন একটা হচ্ছে না। শুধু…

-কীসের অসুবিধা তাহলে?

-জী, এখান থেকে মসজিদ অনেকটা দূরে। ফজরের জামাত ধরতে সমস্যা হচ্ছে। 

-ও এই কথা। দেখো একটু অ্যাডজাস্ট করে নাও। একটু ভেবে ঘরের চারিদিক দেখে বলল- 

-খাবার আসতে কোনো সমস্যা হচ্ছেনা তো? ঘরে তো বই ছাড়া আর কিছু আনোনি। 

-জী না। আর বই-ই আমার সব স্যার।

-দেখো মাস্টার আমি মূর্খ মানুষ আমাকে স্যার বলো না। শুধু জামাল বললেই হবে। 

-কী বলেন, তা কি করে হয়। আপনি স্কুলের সেক্রেটারি।

-না না, তাও বলবে না। 

-আচ্ছা ঠিক আছে। 

-শোনো যে জন্য আসা সেটা বলি। শুনলাম তুমি টিউশন করাচ্ছ?

-জী, হেড স্যার…

-হ্যাঁ, স্যারই আমাকে বলল। ঠিক আছে তাহলে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে বুঝলে।

মনে মনে প্রবাদ গুনতে শুরু করল রাতুল। না জানি কি এমন কাজের কথা বলবে! তবুও বুকে সাহস এনে মুখে বলল-

-বলেন কি কাজ।

-আরে, তেমন কিছু না। পঞ্চায়েতের কিছু কাগজের মানে বুঝিয়ে দিতে হবে মাঝে মাঝে। বুঝতেই পারছ, কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। যা দিনকাল পড়েছে কে কোথায় ফাঁসিয়ে দেয়। 

-আচ্ছা ঠিক আছে, সে বুঝিয়ে দেব। 

-ঠিক আছে মাস্টার কাল রাতে তাহলে নিয়ে আসব। 

মতামতের অপেক্ষা না করেই ভিতরের দরজা দিয়ে ঢুকে গেল।  রাতুল তার চলে যাবার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে ভাবতে লাগল। লোকটা অশিক্ষিত হলেও বেস ধুরন্ধর। 

আজ আর পড়তে বসতে ইচ্ছে করছে না। বাড়িতে ফোন করল সে। অনেকক্ষণ ধরে মা-বাবার সাথে কথা বলল। শেষে পিচ্চি বোনটা ফোনে নিল। তার সেই একই আবদার। তাকে প্রথম মাসের বেতন পেলে অনেক বই কিনে দিতে হবে। কানিজ অন্যান্য মেয়েদের মত না। পড়াশোনার প্রতি তীব্র ঝোঁক। যা করেই হোক, বোনটার পড়ালেখায় কোনো বাধা সে হতে দেবে না। কষ্টে সৃষ্টে নিজের পড়া করতে পেরেছে। বাধা বিপত্তি তারও কম আসেনি। বাবামা যথা সাধ্য যেষ্টা করেছে। এখন সময় এসেছে বোনের দ্বায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবার। 

বোনের সাথে কথা বলার সময় লীনা দুই বার কল করেছিল। এখন একবার কল ব্যাক করবে নাকি সে? ভাবতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভ করতেই লীনা বলে উঠল-

-কী মাস্টার মশায় ব্যাস্ততা মিটলো?

-বাড়িতে কথা বলছিলাম। কি করছ তুমি?

-কিছু না। বিছানায় গড়া গড়ি দিচ্ছি আর তোমার কথা ভাবছি।

-মানে? 

– না কিছু না। তুমি কি করছ বলো? নতুন স্কুল নতুন বাসা কেমন সব?

-এত ভালোমন্দ ভেবে লাভ আছে বলো?

-কেন কি হল আবার?

-কিছু হয় নি। কদিনের অতিথি আমি!

তারপর লীনার সাথে অনেক ক্ষণ কথা হল। সে সব কথার হয়ত বাস্তবে কনো মূল্য নেই। হয়তবা অদূর ভবিষ্যতে মূল্য পেলে পেতেও পারে। 

এখন রাত এগারটা তিরিশ। ফোনটা রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করছে রাতুল। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। রাত জাগার অভ্যাস তার কখনই ছিল না। এখনও বেশি রাত করে না। নিয়ম করে এগারোটা তিরিশের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আজ তার ঘুম আসছে না কেন? আজ কথার শুরুতে লীনা বলেছে সে নাকি তার কথা ভাবছিল। কিন্তু কেন ভাবছে তার কথা? আর এখন সেই বা লীনার কথা ভাবছে কেন? তাহলে কি সেও…

লীনা আর রাতুল খুব বেশি দিনের পরিচিত নয়। কিছুদিন আগে একটা আর্ট এক্সিবিশনে তাদের দেখা। অনেক বড়োলোক বাবার আদরের মেয়ে সে। সেই যেচে রাতুলের সাথে পরিচয় করেছে। অতি সাদামাটা চেহারার মানুষ রাতুল। চেহারায় কোথাও যেমন আভিজাত্যের আভাষ নেই তেমনি এতটুকু অহঙ্কারও নেই। যেটা আছে সেটা, নিপাট ভদ্রতা আর সারল্য। তার সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। লীনা মেধাবী স্মার্ট ভদ্র। বাবার টাকার অকারণ অহংকার নেই। আর তাই খুব সহজেই রাতুলের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। 

লীনাই সেদিন প্রথম কথা বলেছিল- 

-ছবিটা কি আপনার আঁকা? রাতুল চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকিয়েছিল মাত্র। তার চোখে তখন বিষ্ময়। তাকে কেও এভাবে কথা বলবে সে ভাবেনি। ঘোর কাটার পর রাতুল উত্তর দিয়েছিল-

-জী না, আমি একজন দর্শক মাত্র। 

-ও, আমি ভাবলাম আপনি বুঝি। যাই হোক এই ছবিটার ব্যাপারে আমাকে কিছু বলতে পারবেন? 

-আমি? বোকার মত প্রশ্ন করেছিল।

-হ্যাঁ, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি আর্টের উপর দখল রাখেন।

সেদিন রাতুল কি বলেছিল জানে না। তবে সেই ব্যাখ্যা তাদের বন্ধুত্ব হতে আর আটকাইনি। প্রথম দিকে রাতুল অনেক হেজিটেড করত লীনার সাথে কথা বলতে, তার সাথে ঘুরতে। এখন অবশ্য আর তেমন সমস্যা হয় না। লীনার চলাফেরা খুব সাধারন। পার্কে বসা, ফুটপাথের দোকানের খাবার খাওয়া, কেটলিতে করে ফেরি করা চাওয়ালাদের কাছে চা খাওয়া – কিছুতেই তার সমস্যা নেই। ফলে রাতুল আর লীনা এখন খুব ভালো বন্ধু। 

ঘুমহীন চোখে সে তাকিয়ে আছে সিলিঙের দিকে। সেখানে ঝুলে থাকা ফ্যানটার মত তার মনটাও যেন বনবন করে ঘুরপাক খাচ্ছে। 

]]>
https://banglakal.com/literature/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-3/feed/ 0 1051
ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ২ https://banglakal.com/literature/novels/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-2/ https://banglakal.com/literature/novels/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-2/#comments Fri, 22 Aug 2025 09:33:58 +0000 https://banglakal.com/?p=1035 ~আমজাদ হোসেন

বাড়িতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে গেছে। বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিমি পথ পায়ে হেঁটে তবে বাড়ি পৌঁছাতে পারে। গ্রামের আর সকলে এই সামান্য পথ টুকুও হাঁটে না, সকলেই টোটোতে করেই যাতায়াত করে। একমাত্র সেই হেঁটে আসে যায়। কারণ দশটা টাকারও তার কাছে এখন অনেক মূল্য। 

বাড়িতে ঢুকতেই মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেল রাতুল। মা তাকে নিয়েই যেন কার সাথে কথা বলছে। কাছাকাছি হতেই বুঝতে পারে, তার বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে। মনে মনে হাসল। এই অসময়ে বিয়ে, নিজেরই পথ চলার উপার্জন নেই সে নাকি করবে বিয়ে! মাকে ডাক দিতেই চকিত হয়ে মা বলল-

-রাতুল, এত দেরি হল যে খোকা?

-এমনি মা। বাসটা আসতে অনেক লেট করেছে। বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে সে কলের পাড়ে গেল হাতে মুখে জল দিতে। 

-আপনার ছেলে কিন্তু ভাবী অনেক সুন্দর হয়েছে। মেয়ের বাবা দেখলে আর না করবে না। 

কলের পাড় থেকে রাতুল সবই শুনতে পেল। ঘরে উঠে চিনতে পারলো ঘটক মহাশয়কে। তার দিকে তাকিয়ে রাতুল জিজ্ঞেস করল-

-কেমন আছেন কাকা?

-ভাল আছি বাবা। তুমি কেমন আছ?

-জী আলহামদুলিল্লাহ্‌। মা, বাবা এখনও ফেরেনি?

-না, তবে ফেরার সময় হয়ে গেছে। তুই জামাকাপড় ছাড়।

আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রাতুল নিজের ঘরে গেল। নিজের ঘর বলতে মাত্র দুকামরার একতলা ইটের বাড়ির একটাতে সে থাকে আর একটাতে বাবামা। কোনো আত্মীয় পরিজন এলে অধিকাংশ সময় রাতুলকে ঘর ছাড়তে হয়। অনেক দিন আগে তার বাবা হায়দার আলি ব্যাবসা করে কটা টাকা ইনকাম করেছিল। তা দিয়ে এই ঘর দুটো করেন। প্লাসটার হলেও আজও রং করা হয়নি। 

রাতুল ঘরে ঢুকে আলো জ্বালল। একটা সস্তার বাল্ব জ্বলছে। ঘরে ছাতে ঝুলছে খুব কম দামের একটা পুরাতন ফ্যান। গায়ের জামাটা খুলে দেওয়ালে লাগানো হুকে টাঙিয়ে রেখে বিছানায় উঠে বসল। বাইরে থেকে ঘটক ও মা’র কথা কানে আসছে। সেদিকে অবশ্য রাতুলের কোনো লক্ষ্য নেই। সে ভাবছে, বাড়িতে এখন কি জানাবে? কীভাবে বলবে যে এভাবে তার চাকরি করার কোনো ইচ্ছে নেই। সে না চাইলে যে বাবা-মা চাপ দেবে না তাও জানে। কিন্তু বাবার অপারগতার কথা ভাবতেই তার চোখে জল চলে আসে। কি অমানুষিক কষ্ট না তার বাবামা করছে। 

-দাদা আমার বইটা এনেছিস? বলতে বলতে ছোটো বোন ঘরে ঢুকল।

-হ্যাঁ এনেছি। কিন্তু তুই এখনি দশমের সাইন্স বই কি করবি?

-পড়বো। আমার নাইনের বই শেষ হয়ে গেছে।

-বলিস কি! সত্যি শেষ হয়েছে?

-হ্যাঁ দাদা। তুই না, আমার কিছুই বিশ্বাস করিস না। কি মনে হয় তোর? তুই একাই সাইন্স বুঝিস আর কেউ বোঝেনা?

-না তা ঠিক নয়। মাত্র পাঁচ মাসে তুই নাইনের পুরো বই শেষ করে ফেলেছিস। আমিও তো কখনও এভাবে পারিনিরে। 

-তুই পারিসনি বলে কি আমি পারব না?

-আচ্ছা পরীক্ষা নিই তোর থাম। 

-চকলেট লাগবে কিন্তু?

চকলেটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল পিচ্চি বোনের দিকে। আর কানিজ একের পর এক সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে গেল। বোনের এমন মেধা দেখে রাতুল ভীষণ আপ্লুত। গদগদ হয়ে সে বোনকে জিজ্ঞেস করল অন্যান্য বিষয় গুলোর খবর। কানিজ জানাল সেগুলোও তার শেষ হয়েগেছে। রাতুল একটা বই দিয়ে বলল- 

-আচ্ছা ঠিক আছে তোকে আমি দশম শ্রেণির সব বই যোগাড় করে দিচ্ছি। এখন পড়তে বসগে যা।

-যাচ্ছি। দাদা তোর কাজটার কি হল? বোনের উদ্দীপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বলল-

-মনে হচ্ছে হবে।

-সত্যি বলছিস তো?

-হ্যাঁ। কিন্তু বাবামাকে এখনই কিছু জানাস না।

-জানাব না। কিন্তু প্রথম মাসের বেতন পেলে আমাকে অ্যাডভান্স লেবেলের কিছু বই কিনে দিবি বল?

-আচ্ছা দেব। তুই যা।

বাইরে থেকে মায়ের কথা কানে এল। রাতুলের বাবাকে লক্ষ্য করে বলছে-

-এত দেরি করলে যে আজ? কোনো সমস্যা হয়নি তো?

-না গো কোনো সমস্যা হয়নি। দোকান বন্ধ করব ঠিক সেই সময় দুরের এক কাস্টমার এল। মালিক আর ফেরাল না। তাই দেরি।  আচ্ছা রাতুল ফেরেনি?

-হ্যাঁ ফিরেছে। তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসো। আমি খাবার বাড়ছি।

খেতে বসে রাতুলকে বাবা জিজ্ঞেস করল তার ইন্টার্ভিউ সম্পর্কে। এতকক্ষন সে ঘরে বসে এটা নিয়েই ভাবছিল। অসুস্থ বাবার অন্যের মুদি দোকানে কাজ করা, বোনের পড়াশোনার খরচ, মায়ের অভাব ক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে সে অন্যায়কে মেনে নিয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাফ বেতনেই চাকরিটা করবে। 

রাতুলকে চুপ থাকতে দেখে তার বাবা ভেবেছে এটাও হয়নি। তিনি বললেন-

-ঠিক আছে। অন্য কোথাও চেষ্টা কর। এটা হয়নি বলে ভেঙে পড়িস না।

-না বাবা, এটা মনে হচ্ছে হবে। কিন্তু-

-কিন্তু কি?

-ওরা অর্ধেক বেতন কেটে নেবে। 

-ও… 

আর কেউ কিছু বলতে পারেনা। কারণ সকলেই জানে রাতুল ঠিক কতটা আদর্শবাদী। এই হাফ বেতন এক প্রকার ঘুষ। এটা মানতে যে তার কেমন কষ্ট হচ্ছে সে সকলেই জানে। মা নিরবতা ভেঙে বলে-

-রাতুল কচুশাকটা আর একটু নে, তুইতো পছন্দ করিস। বলেই পাতে আরও কিছুটা কচুশাক ঘন্ট দিল। চুপচাপ সকলে খেয়ে উঠে গেল। 

একটু পরেই কানিজ এসে হাজির। সে দাদার কাছে জানতে চায়, এমন অন্যায় মেনে নিয়ে কেন সে চকরি করবে। নানান কথা ও যুক্তি দিয়ে রাতুল তার পিচ্চি বোনটাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। আসল কারণ সে কিছুতেই বলল না। কানিজ পড়তে চলে গেলে রাতুল হেডমাস্টারকে ফোন করল-

-হ্যালো স্যার আমি রাতুল বলছি।

-হ্যাঁ রাতুল স্যার বলেন, কী সিদ্ধান্ত নিলেন?  

-স্যার আমি করব। সেক্রেটারির প্রস্তাবে আমি রাজি আছি।

-খুব ভাল করলেন আপনি। আচ্ছা তবে কাল সমস্ত পেপারস নিয়ে চলে আসেন। দুএকদিনের মধ্যে আপনার জয়নিং করিয়ে দেব।

হেড স্যার কে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা রেখে দিল। ঠিক তখনি আবার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতে লীনার নামটা ভেসে উঠল। হাতে নিয়ে রিসিভ করল-

-হ্যালো।

-কি ব্যাপার কল রিসিভ করলে না তখন?

-তখন ব্যাস্ত ছিলাম। বলো?

-কি হল কাজটার?

-কাল সাক্ষাতে বলব। এখন ভীষণ ক্লান্তি লাগছে। ঘুমাব।

-আচ্ছা রাখছি তাহলে। শুভ রাত্রি।

-শুভ রাত্রি।

ফোন রেখে দেবার পরেও কিছুতেই ঘুম আসছে না রাতুলের। জীবনে এমন পরাজয় তার আগে কখনও হয়নি। সে কখনও অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমন যে সে বাধ্য হচ্ছে আপোষ করতে। আর বিকল্প কোনো উপায় তার ছিল না। কাল সকালে উঠেই যেতে হবে। 

স্কুলে যেতে হবে মনে হতেই সেক্রেটারির চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল। এমন মানুষদের জন্যই আজ সমাজটা এরকম। এদের পেটে সামান্য বিদ্যাবুদ্ধি যদি থাকত! শর্তের কথা মনে পড়তেই আতকে উঠল রাতুল। এমন ভয়ঙ্কর মানুষের বাড়িতে থাকতে হবে ভাবা যায় না। আবার চাকরিটাও তাকে করতে হবে। দেখা যাক কি হয়- মনে মনে ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। 

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

]]>
https://banglakal.com/literature/novels/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-2/feed/ 1 1035
ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ১ https://banglakal.com/literature/novels/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-1/ https://banglakal.com/literature/novels/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-1/#comments Sun, 10 Aug 2025 11:04:00 +0000 https://banglakal.com/?p=997 ~আমজাদ হোসেন

মসজিদ থেকে বেরিয়ে জুতো পরার জন্য মাথা ঝুঁকিয়েছে। কানে এলো কে যেন তাকে ডাকছে। এক পাটি জুতোয় পা গলিয়ে মাথা ডানদিকে কাত করে দেখার চেষ্টা করল রাতুল। না কাউকে দেখতে পেল না। অন্য পাটির জন্য মাথা ঝুঁকিয়েছে। তখনি ডাকটা স্পষ্ট হল। জুতো গলিয়ে মাথা সোজা করে উঠে দাড়াতেই দেখতে পেল সামনে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। 

রাতুল জিজ্ঞেস করল- 

-কিছু বলছেন?

-আমার গ্রামের কোনো যুবক তো মসজিদ মুখি হয় না।কিন্তু তুমি? 

-আমি ভিন গ্রামের। এদিকে একটা স্কুলে ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছি।

-খুব ভালো কথা বাবা। তোমাদের মত যুবকরা যদি মসজিদ মুখি হয় তবেই না ইসলামের সাফল্য। আমরা বুড়োরা আর কি করতে পারি বলো। বৃদ্ধের কন্ঠ থেকে আক্ষেপ ঝরে পড়ল। 

-কিন্তু আপনার গ্রামের যুবকরা কেউ সালাত আদায় করেনা কেন? 

-অধিকাংশ অশিক্ষিত। তারা সব নেশায় ডুবে আছে। যে দু’একজন লেখাপড়া করে তারাও মসজিদ মুখি হয় না। কথা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল বৃদ্ধ।

রাতুল আর কিছু না বলে স্কুলের দিকে পা বাড়াবে ভাবছে। বৃদ্ধ আবার কথা বলে উঠল। করুন আকুতির স্বর যেন গলা থেকে বেরিয়ে এলো।

-বাবা একটা উপকার করবে? রাতুল কিছু না বলে তার মুখের দিকে তাকালো।

-আমি গ্রামের কিছু যুবকদের ডাকব। তুমি যদি তাদের বুঝিয়ে বলো সালাতের জন্য। এমন আকুল আবেদন সে কখনও কোথাও শুনেছে বলে মনে হয় না। 

-আমি সাধারণ শিক্ষিত। ধর্মের কতটুকুবা জানি। ইমাম সাহেবকে দিয়ে তাদের বোঝান।

-সে চেষ্টা অনেক করেছি বাবা, কোনো কাজ হয় নি। 

এরপর আর কোনো কথা খাটে না। রাতুল অগত্যা রাজি হয়ে স্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

ইন্টার্ভিউ থেকে বেরিয়ে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রাতুল। চাকরিটা তার হবে কি না কিছুই বুঝতে পারছে না। কেননা বোর্ডে তাকে তেমন কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। সাধারন কথা বার্তা স্যারেদের সাথে। তাহলে কি তাকে নেবে না? আগে থেকেই কি কাউকে সেটিং করে রেখেছে? যদি তা হয়, তাহলে এত দীর্ঘ সময় নিয়ে তার সাথে সদর্থক কথা কেন বললেন? নাকি তাকে নিতে পারে! পাওয়া না পাওয়ার দোলায় তার মন দোদুল্যমান। 

এখন কি করবে সে? কি করা উচিৎ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে কি স্কুল থেকে চলে যাবে নাকি অপেক্ষা করবে হেড স্যারের উত্তরের জন্য। এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে তার মধ্যে। এমন সময় পিয়ন এসে রাতুলকে বলে গেল সে যেন এখনই চলে না যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুলের সেক্রেটারি আসছেন। তিনি কথা বলে ফাইনাল জানাবেন। 

রাতুল অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে। পিয়ন চলে যাবার সময় তার হাতে এক কাপ গরম লাল চা দিয়ে গেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে সে ভাবতে থাকে –তাহলে কি তার চাকরিটা শেষ পর্যন্ত হবে? তাকে নেবে তারা? ডেমো ক্লাসে ছেলেমেয়ে গুলোর উজ্জ্বল মুখ তার মনে পড়ছে। তারা তার ক্লাসে ভীষন খুশি হয়েছে, সে দেখেই বুঝেছে। তারা নিশ্চয় হেড স্যারকে সদর্থক রিপোর্ট করেছে। তাছাড়া ভাইভার সময় বাকি স্যারেদের আচরণও সদর্থক ছিল বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে কি সত্যি চাকরিটা হবে?

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে রাতুল শূন্যের দিকে চেয়ে আছে। স্কুলটা খুব বড় নয় আবার খুব ছোটও নয়। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে স্কুলের অবস্থান যেন এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। স্কুলের একদিকে গ্রাম অন্যদিকে ধানক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শুধু ধান আর ধান। চোখ জোড়ানো সবুজ ধানের জমি। সেখান থেকে মৃদুমন্দ হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে রাতুলের দেহমনকে। এমন টেনশনের সময়েও রাতুলের মনে গুন গুন করে বেজে উঠে কত সব গানের কলি। 

পিওন এসে রাতুলের হাত থেকে শূন্য কাপটা নিয়ে বলল- 

-স্যার, আপনার চাকরিটা হবে। চিন্তা করবেন না। আবারও মনের ভিতরে এক সুপ্ত বাসনা দুলে উঠল। 

একটা চাকরি তার সত্যিই খুব দরকার। যদিও এটা কোনো পার্মানেন্ট চাকরি নয়, একবছরের ডেপুটেশন ভ্যাকান্সি। যদি হয় তাহলে অন্তত একবছর প্রতিমাসে তিরিশ হাজারের উপর বেতন। তা দিয়ে আরও কয়েকটা বছর লড়াই করার বল পাওয়া যাবে। চাকরির আকালের বাজারে এটা কম কিসের! 

রাতুলের মাকে খুব মনে পড়ছে এখন। যখনই তার মনে একটু সুখের হাওয়া লাগে তখন প্রথমেই মনে পড়ে তার দুখিনী মায়ের মুখ। কত কষ্ট করে তাকে পড়ালেখা করিয়েছে তা রাতুল ছাড়া আর কেইবা জানে। কোনো এক কালে তার মা প্রাইমারি পাশ করেছিলেন। মায়ের মাথা ছিল ভালো। কিন্তু নানার অভাবের সংসারে পড়ালেখা আর হয়ে ওঠেনি। তায় মা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে আপোষ করেননি। গ্রামের সকলে রাতুলের বাবামাকে পাগল বলতো, ইটভাটার কাজে না পাঠিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য। 

কি এক অদম্য ইচ্ছা রাতুলের বাবা-মাকে দমাতে পারেনি। সংসারে প্রচন্ড অভাব সত্ত্বেও কখনও রাতুলকে কাজে যাবার কথা বলেনি তার বাবামা। তারা শুধু স্বপ্ন দেখে, তাদের সন্তান একদিন অনেক বড়ো মানুষ হবে। চাকরি করবে। সকলে এক নামে চিনবে তাদের অপত্যকে। তারা আজও সেদিনের সেই স্বপ্ন দেখে রোজ।

খুব মনে পড়ছে মাকে। পকেট থেকে ছোট্ট ফোনটা বের করে মাকে ফোন করবে কি করবে না ভাবছে। না থাক আগে কনফার্ম হোক তার পর না হয় জানাবে সে। পকেটে রাখতে যাবে এমন সময় ফোন বেজে উঠল। লীনা ফোন করেছে। সেই তাকে এখানের ভ্যাকান্সির খোঁজটা দিয়েছিল।

কলটা বেজে বেজে কেটে গেল। রাতুল দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ভাবল- থাক, একেবারেই খবরটা দেব। শেষে যদি না হয়। 

এই অসময়ে কোথায় যেন একটা পাখি ডাকছে। কোন পাখি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ডেকে ডেকে যেন ক্লান্ত হয়ে পাখিটা ফিরে গেছে। চারিদিকে কেমন এক শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করেছে রাতুল। তাহলে কি তার চাকরিটা হবে না? যদি নাই হয় তাহলে তাকে বসিয়ে রেখেছে কেন? না কি হবার সম্ভাবনা আছে। সময় যেন আর কাটতে চায় না। 

সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেল, ধান জমির আল দিয়ে লুঙ্গি পরে একজন কে আসছে। কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল ঠোঁটে আটকে আছে জ্বলন্ত বিড়ি। লুঙ্গি হাটুর উপরে ভাঁজ করে পরা। গায়ে কলার তোলা ডোরাকাটা হাফহাতা গেঞ্জি। 

মাঠ থেকে এসে স্কুলের সামনের টিউবয়েলের জলে পায়ের কাদা ধুয়ে স্কুলের বারান্দায় উঠলেন। পায়ে চটি জুতার বালাই নেই। তার পর সোজা ঢুকে গেলেন হেড মাস্টারের ঘরে। রাতুল লক্ষ্য করেছে, ঢোকার সময় এই আগন্তুক সামান্য পারমিশন টুকুও নেননি। একটু পরেই পিওন এসে হাসি মুখে বলল-

-আসুন স্যার সেক্রেটারি এসেছেন। আপনাকে ডাকছেন। রাতুলের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এমন মানুষ যদি স্কুলের সেক্রেটারি হন তাহলে তো খবর আছে। কি আর করার, মিথ্যা আশা বাইরে রেখে হেড মাস্টারের ঘরের সামনে গিয়ে দাড়াল। পর্দা সরিয়ে অনুমতি চাইল-

-আসব স্যার? হেড মাস্টার সরল গোবেচারা টাইপের মানুষ। তিনি হেসে উঠে বললেন-

-আসুন আসুন। আসুন স্যার। রাতুল ভিতরে প্রবেশ করতেই তিনি একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন-

-বসুন। ইনি হচ্ছে স্কুলের সেক্রেটারি। জামাল সাহেব। উনি এই পঞ্চায়েতের প্রধানও। 

রাতুল সেক্রেটারির দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ জানাল। তার উত্তরে লোকটা কর্কশ কন্ঠে এক নিশ্বাসে বলে গেলেন-

-দ্যাখেন মাস্টার। আপনাকে আমি নিতে পারি। কিন্তু একটা শর্তে। তা হল আপনি যা বেতন পাবেন তার অর্ধেক আমাকে দিতে হবে প্রতি মাসে। তার বিনিময়ে আমার বাড়িতে আপনার থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করে দেব। শুনলাম আপনি বেলডাঙ্গার ওদিক থেকে এসেছেন। অত দূর থেকে তো আর রোজ যাওয়া আসা করতে পারবেন না। আর এখানে এই গ্রামে বাড়ি ভাড়াও পাবেন না। আমার বাড়িতেই থাকবনে, খাবেন আর স্কুল করবেন। বেতন হলে আমাকে অর্ধেক টাকা দিতে হবে। রাজি থাকলে বলুন। আজই হেডমাস্টার সব কাগজ করে দেবে। আমার লোক আছে কোনো সমস্যা হবে না। 

সেক্রেটারি থামার পরপরই আবার বিড়ি ধরালেন। সামনে যে হেডমাস্টার বসে আছেন। এটাযে স্কুল সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রাতুল চুপ হয়ে গেছে। সে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এতক্ষণে সে লক্ষ্য করেছে, ভদ্রলোকের বামদিকের চোখের উপরে বেশ বড়ো একটা কাটা দাগ। সে দাগ গালেও ফুটে উঠেছে। আর বুঝতে বাকি থাকে না, ইনি কে! 

হেড মাস্টার রাতুলকে চুপ থাকতে দেখে বললেন-

-তাহলে স্যার রাজি তো নাকি? রাতুল একটু নড়ে বসে গলা ঝেড়ে বলল-

-স্যার, একেবারে অর্ধেক টাকা! তাহলে তো আমার কোনো কিছুই থাকবে না। পাশ থেকে বিষধর সাপের মত গলা বাঁকিয়ে বিড়ির ধোয়া ছেড়ে বললেন-

-তাহলে মশায় আপনাকে করতে হবে না। অন্য যারা আছে তাদের ডেকে নেব। অনেকেই দিতে রাজি আছে। আপনার পড়ানো ভালো, নাম্বার ভালো তায় বলছি। নইলে- 

রাতুল ঘাবড়ে গিয়ে বলল-

-স্যার, কিছুটা কম করা যায় না? মানে যদি কুড়ি শতাংশ নিতেন, তাহলে আমার বাড়িতে কিছু কিছু পাঠাতে পারতাম।

-দেখুন আপনাদের মতো অত পড়ালেখা করা লোক না আমি। কোনোদিন স্কুলের চৌকাঠ মাড়ায়নি। এখন আপনার ওই প্যাঁচের হিসাব আমি বুঝিনা। যদি করেন তাহলে অর্ধেক লাগবে, ব্যাস। 

-প্লিজ স্যার, গরিব মানুষ। একটু এদিকটা ভাবুন।

-ধ্যাততেরিকে মশায়। বেশি ভ্যাজর ভ্যাজর করেন নাতো। করতে হয় করুন, না হয় না করুন। এই হেড মাস্টার আমি চললাম। আপনি দেখেন। বলেই লোকটা যেভাবে যেদিক থেকে এসেছিলেন, সেভাবে লুঙ্গি ভাঁজ করতে করতে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

রাতুল পাথরের মত বসে আছে। হেড মাস্টারও চুপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর হেড মাস্টার কথা বলে উঠলেন-

-সরি স্যার। আমার কিছু করার নেই। এভাবেই আমাদের চলতে হচ্ছে। অনেক দূর থেকে চাকরি করতে আসি। প্রতিবাদ করতে গেলে কি হবে বুঝতেই পারছেন। 

-তা বলে এভাবে?

-দেখুন স্যার, এটা আপনি নিশ্চয় বুঝে গেছেন যে আমার কিছু করার নেই। এখন আপনার ইচ্ছে।

রাতুল ভেবে পাচ্ছে না সে কি করবে। এই ভাগাড়ের দেশে তাহলে আর কিছুই বাকি নেই। অথচ তার চাকরিটা খুব দরকার। সামান্য একটা ডেপুটেশন ভ্যাকান্সির জন্য যদি এই হয়, তাহলে পার্মানেন্ট পোষ্ট গুলোর ক্ষেত্রে কি হচ্ছে তা আন্দাজ করতে পারছে। এখন তার মাথায় কিছুই আসছে না। এদিকে হেড স্যার তাড়া দিচ্ছে যা বলার তাড়াতাড়ি বলার জন্য।

-স্যার আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিন, বাড়িতে একটু কথা বলে নিই।

-আচ্ছা ঠিক আছে, তা করুন। কিন্তু দেরি করবেন না। এখুনি সেক্রেটারি ফোন করে গালাগালি করতে শুরু করবে।

হেড স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমে বাড়িতে ফোন লাগাল। মা কে জিজ্ঞেস করতেই অন্যান্য বিষয়ের মতো এবারও বলল- দেখ তুই যা ভালো বুঝিস। 

কিছুক্ষণ পর হেড স্যারের ঘরে প্রবেশ করে কোনো ভূমিকা ছাড়া জানিয়ে দিল, সে এভাবে জয়েন করবে না। যদি পূর্ণ বেতন দেয় তবেই জয়েন করতে পারে সে। হেড স্যার কি যেন ভাবলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-

-আপনার মত হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তবে স্যার আপনাকে আমি দুই দিন সময় দিলাম। ভেবে দেখবেন। আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলাম। 

অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। স্কুল থেকে বেরনোর সময় একদল ছাত্রছাত্রী জিজ্ঞেস করছিল কবে থেকে আসছেন তাদের রাতুল স্যার। হাসি মুখে মাথা নেড়ে বিদায় নিলো। হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি সে। 

রাস্তায় আসতে আসতে কত কি ভাবনা তার মাথায় এসে জমেছে। শুধু বার বার তার মনে হয়েছে, সে যেন ন্যায়, নীতি, আদর্শের বোঝা মাথায় নিয়ে এক ভাগাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারদিকে ছড়িয়ে আছে মৃত লাশ। চিল-শকুনি, শেয়াল-কুকুরে কাড়াকাড়ি করছে। তার কাছে সেই সব কাড়াকাড়ির পৈশাচিক উল্লাস যেন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।  

]]>
https://banglakal.com/literature/novels/novel-bhagar-by-amjad-hossain-chapter-1/feed/ 1 997