হিজাব বিতর্কে উত্তপ্ত উলুবেড়িয়ার ঝামটিয়া হাই স্কুল: সংখ্যালঘু কমিশনকে ‘জঙ্গি সংগঠন’ আখ্যা, ক্ষুব্ধ কমিশন চেয়ারম্যান

হিজাব বিতর্কে উত্তপ্ত উলুবেড়িয়ার ঝামটিয়া হাই স্কুল: সংখ্যালঘু কমিশনকে ‘জঙ্গি সংগঠন’ আখ্যা, ক্ষুব্ধ কমিশন চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা আঙিনায় ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও একটি সাংবিধানিক কমিশনকে অবমাননা করার এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক অভিযোগ সামনে এল। হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া ব্লকের অন্তর্গত ঝামটিয়া হাই স্কুলের এক মুসলিম শিক্ষিকা, মুর্শিদা মল্লিক, তাঁর হিজাব পরিধান এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নিয়মিত মানসিক হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন। অভিযোগের তির স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (Teacher-in-Charge) কার্তিক পালের দিকে।

অভিযোগের মূল বিষয়গুলি:
▫️হিজাব বিরোধী মানসিকতা: ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুর্শিদা মল্লিককে হিজাব না পরার জন্য নিয়মিত চাপ দিচ্ছেন। এমনকি ছাত্রীরা যারা হিজাব পরে আসে, তাদেরও হিজাব খুলে রাখতে বলার জন্য ওই শিক্ষিকাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
▫️মানসিক হেনস্থা: রমজানের রোজা পালন এবং নামাজ আদায় করার ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারি ছুটি বা ছাড়ের নিয়ম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
▫️নিরাপত্তাহীনতা: শিক্ষিকা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে চরম ভয়ের মধ্যে কাজ করছেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বৈষম্য ও কুৎসিত মন্তব্য করা হচ্ছে।


ঘটনার ভয়াবহতা: কমিশনকে ‘জঙ্গি সংগঠন’ আখ্যা
ভুক্তভোগী শিক্ষিকা মুর্শিদা মল্লিক যখন প্রতিকার চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের (West Bengal Minority Commission) দ্বারস্থ হন, তখন পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কার্তিক পাল অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে সংখ্যালঘু কমিশনকে একটি ‘জঙ্গি সংগঠন’ বলে অভিহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি অভিযোগকারী শিক্ষিকাকেও ওই তথাকথিত ‘জঙ্গি সংগঠনের’ অংশ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। একজন সরকারি পদাধিকারীর মুখ থেকে একটি সাংবিধানিক কমিশন সম্পর্কে এমন মন্তব্য প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।


সংখ্যালঘু কমিশনের কড়া অবস্থান ও চেয়ারম্যানের বক্তব্য
এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান আহমেদ হাসান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। আহমেদ হাসান বলেন:

“ভারতের সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। হিজাব পরা বা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা কারও মৌলিক অধিকার। একজন শিক্ষিকাকে তাঁর পোশাকের জন্য হেনস্থা করা এবং একটি সরকারি কমিশনকে ‘জঙ্গি সংগঠন’ বলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছি এবং জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

শিক্ষা দপ্তরের তলব ও প্রধান শিক্ষকের নীরবতাএই অভিযোগের প্রেক্ষিতে উলুবেড়িয়া শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ শুনানির ডাক দেওয়া হয়েছিল। নির্যাতিতা শিক্ষিকা মুর্শিদা মল্লিক যথাসময়ে দপ্তরে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য পেশ করলেও, অভিযুক্ত শিক্ষক কার্তিক পাল এই শুনানিতে অনুপস্থিত ছিলেন।


উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদন তৈরির সময় আমাদের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কার্তিক পালের সাথে ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করার একাধিক চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি।


বর্তমান পরিস্থিতি: অধিকার মিললেও মেলেনি দুঃখপ্রকাশ
শিক্ষা দপ্তরের কড়া বার্তার পর বর্তমানে স্কুলে মুর্শিদা মল্লিককে তাঁর ধর্মীয় অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ হেনস্থার পর অবশেষে তিনি নিজের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করতে পারছেন। তবে পরিস্থিতির আপাত সমাধান হলেও কিছু মৌলিক প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাঁর পূর্বের কুরুচিকর মন্তব্য বা আচরণের জন্য এখনও পর্যন্ত কোনও দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা প্রার্থনা করেননি।


সাংবিধানিক অধিকার বনাম সংকীর্ণতা
ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ঝামটিয়া হাই স্কুলের এই ঘটনা কেবল একজন শিক্ষিকার সম্মানহানি নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত বলে মনে করছেন শিক্ষানুরাগী মহল।
বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, মুর্শিদা মল্লিক প্রশাসনের কাছে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, সংখ্যালঘু কমিশন ও শিক্ষা দপ্তর এই চরম অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কারণ, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারও নেই।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply