ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১) নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ওড়িশা রাজ্যে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা এই মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘনের উদাহরণ হয়ে উঠেছে। জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার এক বয়স্ক মুসলিম কম্বল বিক্রেতাকে বিজেপি সমর্থক কয়েকজন যুবক লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করছে। অভিযোগ, তাঁর কাছে আধার কার্ড না থাকায় এবং তিনি বাংলাভাষী মুসলিম হওয়ায় তাঁকে এই নৃশংস আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং রাজ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, অসহিষ্ণুতা এবং সংখ্যালঘু-বিরোধী মনোভাবের একটি ভয়াবহ প্রতিফলন।ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, প্রায় ৬০ বছর বয়সী ওই বিক্রেতা রাস্তার ধারে কম্বল বিক্রি করছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন যুবক তাঁকে ঘিরে ধরে আধার কার্ড দেখাতে বলে। তিনি মোবাইলে সফট কপি দেখাতে চাইলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং “আসল আধার কার্ড” দাবি করে। না পাওয়ায় তারা লাঠি দিয়ে তাঁকে মারতে শুরু করে। একই সঙ্গে তাঁকে “জয় শ্রী রাম” ধ্বনি দিতে বাধ্য করা হয় এবং রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা তাঁকে “বাংলাদেশি” বলে অভিহিত করে এবং বলে, “ওড়িশায় আসা উচিত নয়, কলকাতায় ফিরে যাও।”
এই ঘটনা ওড়িশার কোনও একটি গ্রামীণ এলাকায় ঘটেছে বলে জানা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর কংগ্রেস নেতা আমিয়া পান্ডব সহ অনেকে এটিকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যের সংখ্যালঘু-বিরোধী মনোভাবের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।এই ধরনের হামলার পিছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ওড়িশায় বাংলাভাষী মুসলিম অভিবাসী শ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতি সন্দেহের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকে তাদের “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” বলে মনে করেন, যা রাজনৈতিকভাবে উস্কানি দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, আধার কার্ডকে জাতীয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখার ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে, যদিও আধার কোনও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। তৃতীয়ত, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির প্রভাবে স্থানীয় যুবকরা নিজেদের “পাহারাদার” ভেবে স্বেচ্ছায় এ ধরনের কাজে লিপ্ত হচ্ছে। ২০২৫ সাল থেকে ওড়িশায় এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।এই হামলার প্রাথমিক দায় অভিযুক্ত হামলাকারীদের। কিন্তু গভীর দায় রয়েছে রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের। বিজেপি-শাসিত ওড়িশায় সংখ্যালঘু-বিরোধী ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বারবার উঠেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ভোটের হাতিয়ার করে, তখন এ ধরনের ঘটনা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ভুল তথ্য ও উস্কানিমূলক পোস্টও এই পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে।এই ধরনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথমেই দ্রুত পুলিশি তদন্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সচেতনতা অভিযান চালিয়ে জানাতে হবে যে আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় এবং অভিবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্কুল-কলেজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিক্ষা জোরদার করা দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় হেট স্পিচ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।ওড়িশা সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করে এ ধরনের ঘটনার তদন্ত করা।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হেল্পলাইন চালু করা যেতে পারে। অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য পরিচয়পত্র সহজলভ্য করা এবং স্থানীয় পুলিশকে সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। রাজ্য সরকারের উচিত স্পষ্ট বিবৃতি দিয়ে বলা যে কোনও ধরনের সাম্প্রদায়িক হিংসা সহ্য করা হবে না। কেন্দ্রীয় সরকারও এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে জাতীয় স্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা নিতে পারে।এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভারতের বৈচিত্র্যই তার শক্তি। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে সকলের সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। অন্যথায় এমন ঘটনা আরও বাড়বে এবং দেশের সামাজিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


Pingback: ওড়িশায় বাঙালি মুসলিম শ্রমিকদের উপর হামলা: একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা – বাংলাকাল
Pingback: ওড়িশায় বাঙালি মুসলিম বিক্রেতার উপর হামলা: একটি ঘৃণামূলক অপরাধের ধারাবাহিকতা – বাংলাকাল
Pingback: ওড়িশায় দরিদ্র মুসলিম বিক্রেতার উপর হামলা: সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা – বাংলাকাল