বাঁকুড়া, সোনামুখী,ইনামূল ভূঁইয়া:
“এই বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর বাণীসহ সাম্য ও নারীশক্তির নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল সোনামুখী উত্তর চক্রের মদনপুর ও জয়নগর গ্রাম। উপলক্ষ ছিল ১১৬তম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্যাপন।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সোনামুখী উত্তর চক্রের মদনপুর জয়নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগে দিনটি সাড়ম্বরে পালন করা হয়। যদিও দিনটি রবিবার হওয়ায় বিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তবুও বিদ্যালয়ের ছাত্রী, তাদের মায়েরা, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
দিনের সূচনা হয় একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে। বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা, তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকরা স্লোগান দিতে দিতে বিউগল বাজিয়ে মদনপুর ও জয়নগর—এই দুই গ্রাম পরিক্রমা করেন। শোভাযাত্রা ঘিরে গ্রামজুড়ে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়।
পরে বিদ্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নারী দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরেন এবং সমাজে নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন। অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা ও তাদের মায়েরা কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য, কুইজসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তাদের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই মহতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডিহিপাড়া এলাকার চিন্ময়ী সরকার, দিলীপ মণ্ডলসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনন্দময় ঘোষ বলেন, “প্রতিবছরের মতো এ বছরও যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়েছে। যদিও দিনটি রবিবার ছিল, তবুও ছাত্রীরা ও তাদের মায়েরা উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সূচনা হয় ১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে সূচশিল্পে নিযুক্ত প্রায় ১৫ হাজার নারী শ্রমিকের আন্দোলনের মাধ্যমে। পরে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের জন্য আহ্বান জানায়। এরপর থেকে সারা বিশ্বে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। এবছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘Give to Gain’, অর্থাৎ লাভের জন্য দান করুন। নারীর নিরাপত্তা, অধিকার ও নেতৃত্বে বিনিয়োগ করলে সমগ্র সমাজই শক্তিশালী হয়।”


ডিহিপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান পাপিয়া বাউরী বলেন, “বর্তমানে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জলে, স্থলে ও অন্তরীক্ষে সমানভাবে এগিয়ে চলেছে। তবুও সমাজে নারীরা এখনও লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাই সমাজের পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।”
শিক্ষানুরাগী চিন্ময়ী সরকার বলেন, “আজ নারী দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেল। এখনও অনেক পরিবারে কন্যাসন্তান জন্মালে বিষাদের ছায়া নেমে আসে, আর পুত্রসন্তান জন্মালে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এই মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। সঠিক শিক্ষা পেলে মেয়েরাও কোনও অংশে পিছিয়ে থাকবে না।”
অভিভাবিকা সুশান্তি মণ্ডল ও কোয়েল চক্রবর্তী বলেন, “মেয়েদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে এবং তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। যখন সমাজ বুঝবে নারী কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং শক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক—তখনই নারী দিবস পালনের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে।”
সার্বিকভাবে উৎসাহ, সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক আবহে ভরপুর এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারী সম্মান, সমঅধিকার এবং সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়।
