সম্পাদনা: ড. মোঃ শামিম ফিরদৌস ও ড. টোটন শেখ
প্রকাশক: কুনাল বুকস, নয়াদিল্লি
পর্যালোচনায়ঃ- সফিউল ইসলাম, গবেষক, ইতিহাস বিভাগ, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা।
উপনিবেশিক সময়কালে বাংলায় শিক্ষার ইতিহাস কেবল পাঠশালা বা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাহিনি নয়; এটি উপনিবেশবাদ, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সংস্কার ও জাতীয় চেতনার এক জটিল মিলনক্ষেত্র। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই নতুন সম্পাদিত গ্রন্থ ‘Perspectives on the History of Education in Colonial Bengal and Beyond’ পাঠকদের সামনে উন্মোচন করেছে শিক্ষার বহুমাত্রিক গতিপথ। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মোঃ শামিম ফিরদৌস এবং নিস্তারিণী কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. টোটন শেখের যৌথ সম্পাদনায় এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে চৌদ্দটি প্রবন্ধ, যেখানে অধ্যাপক থেকে গবেষক সকলেরই চিন্তাশীল অবদান রয়েছে।
গ্রন্থটির মূল বক্তব্য হলো, শিক্ষার ইতিহাসকে কোনো সরলরেখার মতো অগ্রগতির কাহিনি হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল। উপনিবেশিক ভারতে শিক্ষা ছিল রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—যেখানে ব্রিটিশ শাসন কর্তৃপক্ষ শিক্ষাকে ব্যবহার করেছে শাসনযন্ত্রের দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে, আবার দেশীয় সমাজ সেই শিক্ষাকে রূপান্তরিত করেছে আত্মপরিচয় ও সামাজিক সংস্কারের হাতিয়ারে।
গ্রন্থের প্রথম অংশটি শুরু হয়েছে ড. সাফুরা রাজেকের প্রবন্ধ ‘Education as an Instrument of Colonial Control for British India’-এর মাধ্যমে, যেখানে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক নীতির অন্তরালে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যবহৃত করা হয়েছিল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে। এরপর ড. কবিরুল হক খানের প্রবন্ধ ‘Development of Western Education in Nadia District During 19th and 20th Centuries: A Historical Analysis’ স্থানীয় শিক্ষাগত প্রতিক্রিয়ার এক আকর্ষণীয় চিত্র তুলে ধরে। ড. সাবির আলির ‘The Arrival of Portuguese and the Introduction of Modern Medicine in Indian Sub-Continent’ প্রবন্ধটি প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জ্ঞানের বিনিময়ের সূচনা-পর্বকে সামনে আনে, বিশেষত চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় প্রভাবের প্রাথমিক ধাপগুলিকে।
মহিলাদের শিক্ষার প্রসঙ্গে মোঃ একরামুল হকের প্রবন্ধ ‘Bengal Renaissance and the Question of Women’s Education in Colonial Bengal: 1815-1939’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি সমাজ সংস্কার ও নারীর শিক্ষার মধ্যকার সংঘাত ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে সৌমাল্য মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ ‘Contribution of the Christian Missionaries in Spreading Western Education in Bengal with Special Reference to Serampore’ উপনিবেশিক বাংলায় মিশনারি শিক্ষার ভূমিকা ও তার সামাজিক প্রভাবের বিশ্লেষণ করেছে।
দ্বিতীয় অংশে উঠে এসেছে কারিগরি শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষার সঙ্গে মানসিক বিকাশ এবং স্থানীয় সংস্কৃতি নির্ভর শিক্ষার বিষয়বস্তু। ড. টোটন শেখের ‘Technical Education and Social Changes in Bengal (1858–1947)’ প্রবন্ধে দেখা যায়, কীভাবে কারিগরি শিক্ষার প্রসার বাংলার সামাজিক রূপান্তরকে প্রভাবিত করেছিল। আবদুল্লাহ ও ড. মোঃ শামিম ফিরদৌসের যৌথ প্রবন্ধ ‘Women’s Education in Murshidabad District during Colonial Period’ উপনিবেশিক মুর্শিদাবাদে মুসলিম নারীর শিক্ষার প্রেক্ষাপটে এক অনালোচিত অধ্যায় উন্মোচন করেছে।
ড. মোঃ আবু নাসিমের প্রবন্ধ ‘Physical Activities and Mental Health with Special Reference to Sports-Education’ শিক্ষার ইতিহাসে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ নিয়ে আসে। তিনি দেখিয়েছেন, শারীরিক শিক্ষা কেবল দেহগত বিকাশের জন্য নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ও জাতীয় চেতনা গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ড. মোঃ রেজাউল করিমের প্রবন্ধ ‘Gambhira as a Traditional Folk Teacher’ লোকসংস্কৃতি ও শিক্ষার সংযোগকে তুলে ধরেছে। গম্ভীরা কেবল বিনোদন নয়, সমাজশিক্ষার এক শক্তিশালী মাধ্যম—এই ধারণাই তিনি যুক্তি ও উদাহরণসহ বিশ্লেষণ করেছেন।

তৃতীয় অংশে মূলত মুসলিম সমাজে শিক্ষার অবস্থা ও সংস্কারের ধারাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রফেসর কাজী সুফিয়র রহমানের গবেষণা ‘Patterns of Lower Primary Education among Muslims in Bengal A case study of Burdwan District’ স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। ড. মোঃ কামরুল হাসানের ‘The State of Higher Education among the Muslims in Colonial Bengal 1857-1921’ ও ড. মোঃ গোলাম মুর্শিদের ‘Education for Muslims in the Nineteenth Century Bengal: A Historical Perspective’ প্রবন্ধ দুটি মুসলিম সমাজে উচ্চশিক্ষা ও ইংরেজি শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় বিতর্কের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
চতুর্থ ও শেষ অংশে স্মৃতি, প্রতিরোধ ও শিক্ষার উত্তরাধিকারের আলোচনা এসেছে। ড. মোঃ আলমগীর হোসেনের প্রবন্ধ ‘Demands of the Muslims of Basirhat Sub-Division for Education Reform (1905–1947)’ এক গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অধ্যয়ন হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লেখক বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে বসিরহাট মহকুমার মুসলিম সমাজ শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সংস্কারের দাবি তুলেছিল। মৃত্যুঞ্জয় সামন্তের ‘Documenting the Anti-Colonial Resistance and Martyrdom of Kaiee sha in The Black Hill by Mamang Dai’ এই বইয়ের শেষ প্রবন্ধ, এই প্রবন্ধে শিক্ষাকে প্রতিরোধ ও জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছে—একটি সাহিত্যিক অথচ গভীর ঐতিহাসিক পাঠ হিসেবে।
গ্রন্থটির অন্যতম শক্তি হলো এর অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্য। এখানে প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা যেমন আলোচ্য হয়েছে, তেমনি স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকশিক্ষা, নারীর শিক্ষার প্রশ্ন, মুসলিম সমাজের শিক্ষাগত পরিবর্তন—সবকিছুই সমান ভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে বইটি কেবল একাডেমিক গবেষণার পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজচিন্তা, ইতিহাস ও সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থার মূল প্রশ্নগুলিকেও ছুঁয়ে যায়। সম্পাদকদ্বয় তাঁদের ভূমিকায় যেমন বলেছেন, শিক্ষার ইতিহাসকে নতুন করে ভাবা আজকের সময়ে অত্যন্ত জরুরি। পাঠক্রম, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়—এই সব বিষয় নিয়ে যে বিতর্ক আজও চলমান, তার মূলে রয়েছে সেই ঔপনিবেশিক শিক্ষার উত্তরাধিকার। এই গ্রন্থ সেই উত্তরাধিকারের পুনর্মূল্যায়নের এক মূল্যবান প্রচেষ্টা।
সব মিলিয়ে ‘Perspectives on the History of Education: Bengal and Beyond’ বইটি ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিক্ষক ও পাঠপ্রিয় সকলের জন্য এক প্রয়োজনীয় সংযোজন। এটি শুধু অতীতের শিক্ষার রূপ নয়, বর্তমানের শিক্ষাচিন্তার জন্যও এক অনুপ্রেরণাদায়ক পাঠ।
বইটি সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য:
নাম: Perspectives on the History of Education: Bengal and Beyond
সম্পাদক: ড. মোঃ শামিম ফিরদৌস ও ড. টোটন শেখ
প্রকাশক: কুনাল বুকস (Kunal Books),
4648/21, First Floor, Ansari Road,
Daryaganj, New Delhi-110002.
Website: www.kunalbooks.com
প্রকাশকাল: ২০২৫

