বেঁচে থাকলে কিংবদন্তি গায়ক রফি ১০২ বছরে পা দিতেন। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন ১৯৮০ সালের ৩১শে জুলাই। ঠিক এক সপ্তাহ আগে চলে গেছেন উত্তম কুমার। একটি আঘাত সইবার আগেই দ্বিতীয় আঘাত চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা করছিল। দেখতে দেখতে ৪৫ বছর পার হলেও এখনও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি রফির বিকল্প আনতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে কি না সন্দেহ আছে।
২৪শে ডিসেম্বর দিনটি ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয়, কারণ এই দিনেই আমরা পেয়েছি প্লেব্যাক গায়কদের কোহিনূর রফিকে। ক্যারিয়ারের শুরু হয় বিকল্প গায়ক হিসেবে। এক অনুষ্ঠানে প্রধান গায়ক ছিলেন সায়গল; হঠাৎ লাইট চলে যাওয়াতে হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। উত্তেজিত দর্শকদের থামাতে জোর করে বারো বছরের কিশোরকে স্টেজে তুলে দেওয়া হয়। সেই কিশোর একের পর এক গান গেয়ে উত্তেজিত শ্রোতাদের সম্মোহিত করে দিয়েছিল। লাইট আসার পর সায়গল আশীর্বাদ করেছিলেন রফিকে। সেই শুরু, গানকে পেশা করে নেবেন—ভাবেনি সেদিনের সেই কিশোর। তারপর বোম্বে, আর বাকিটা ইতিহাস।
নওশাদ রফির পাঞ্জাবি টোন বাদ দিয়ে শুদ্ধ উর্দু ভাষার ওপর জোর দিয়ে প্লেব্যাক গায়ক হওয়ার তালিম দেন। ‘দুলারি’ ফিল্মের ‘সুহানী রাত ঢল চুকি’ গানটি রফির ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত রফি একমেবাদ্বিতীয়ম, তাঁকে ধরা মুশকিল। তবে রফির ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো সেট-ব্যাক হয় ১৯৬৭ সালে। এর জন্য পরোক্ষভাবে রফি নিজেই দায়ী ছিলেন।
শক্তি সামন্তর ফিল্ম ‘আরাধনা’র সময় রফি হজ করতে যান। ওখানে কেউ তাঁকে বুদ্ধি দেয় যে গান-বাজনা হারাম। ধর্মভীরু রফি বোম্বে ছেড়ে লন্ডনে ছেলেদের কাছে উঠলেন। রফির অভাব টের পাচ্ছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। রফি একের পর এক অনুষ্ঠানের অফার ফেরত দিচ্ছিলেন। শেষে মুশকিল আসান হয়ে এলেন নওশাদ; রফিকে বুঝিয়ে রাজি করলেন আবার গান গাইতে। ওদিকে রফির ছাড়া জুতোয় পা গলিয়ে ফেলেছেন কিশোর কুমার। রাজেশ খান্না নামের ঝড়ে খড়কুটোর মতো সব উড়ে যাচ্ছে। এই সময় ব্যতিক্রম ছিলেন ধর্মেন্দ্র। গুরু দিলীপ কুমারের কাছে বুদ্ধি নিয়ে তিনি রোমান্টিক ফিল্ম ছেড়ে অ্যাকশন ফিল্ম আর কমেডিতে অভিনয় শুরু করে সফল হন। রফি ধর্মেন্দ্রর প্লেব্যাক শুরু করে দেন। ‘লোফার’ ছবির ‘আজ মৌসম বড়া বেঈমান’ হিট হয়। আর ধর্মেন্দ্রর কাল্ট সং ‘ম্যায় জট ইয়ামলা পাগলা দিওয়ানা’ গেয়ে নিজের জায়গা করে নেন তিনি।
রফির বড় ফ্যান মনমোহন দেশাইয়ের ‘অমর আকবর এন্টনি’ ফিল্মে একের পর এক হিট গান দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেন রফি। এর আগের একটি ঘটনা বলতে ভুলে গেছি—Better late than never। ঋষি কাপুর চেয়েছিলেন কিশোর কুমার কণ্ঠ দেবেন ‘লায়লা মজনু’ ফিল্মে। মিউজিক ডিরেক্টর জয়দেব চান রফিকে। দুজনের ইগোর লড়াইয়ের জট খুলতে এগিয়ে আসেন শাম্মী কাপুর। শাম্মীর আদেশ ফেলতে পারেননি ঋষি, তারপরের গল্প ইতিহাস। ‘লায়লা মজনু’র সাফল্যে খুশি হয়ে ঋষি রফির ফ্যান হয়ে যান। এরপর কিশোর কুমারের পাশাপাশি রফিও কণ্ঠ দিয়েছেন ঋষির গলায়। আর একটি ঘটনার উল্লেখ করা দরকার—রফির ফ্যান মনমোহন দেশাই সবার কথা উপেক্ষা করে ‘অমর আকবর এন্টনি’ ফিল্মে রফিকে দিয়ে গাওয়ান। ঋষির অভিনয় আর রফির কণ্ঠের মাদকতা একের পর এক হিট গান উপহার দিয়েছে। এখানেই শেষ নয়, নাসির হোসেনের ‘হাম কিসিসে কম নেহি’ ফিল্মের ‘ক্যায় হুয়া তেরা ওয়াদা’ গানটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। এইভাবেই রফি প্রমাণ করেন তিনি ফুরিয়ে যাননি।
মান্না দের মতে, রফি হচ্ছেন এক নম্বর, বাকিদের কাউন্ট শুরু চার থেকে। মান্না দের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর জুহুর ভিলা ‘আনন্দম’-এ বসে। একজন শিল্পীর প্রতি কি ধরনের সম্মান থাকলে অন্য শিল্পী এমন মন্তব্য করতে পারেন, মান্না দে তার প্রমাণ। অনেকে ভারতরত্ন পেলেও রফি পাননি—ফ্যানরা অনুযোগ করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিই না, কারণ ভারতরত্ন গুরুত্ব হারিয়েছে। আজকাল উমেদারি করলে ভারতরত্ন পাওয়া যায়। Credit goes to the ruling party। আর দ্বিতীয় কারণ হলো কিশোর কুমার। অবাক হলেও সত্যি, কিশোর কুমারও কোনও সরকারি সম্মান পাননি। কাজেই কোনও আক্ষেপ নেই; মুড়ি-মুড়কি এক দর যেখানে, সেখানে প্রত্যাশা করা অর্থ ও সময় নষ্ট করা ছাড়া লাভ নেই। আপনারা কী বলেন, জানার আগ্রহ রইল। রফি ভারতরত্ন নয়, আমার কাছে বিশ্বরত্ন। এ ব্যাপারে আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।
