ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৫

ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৫

~~আমজাদ হোসেন

বিকেলের পড়ন্ত রোদ রাতুলের মুখে এসে পড়েছে। ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে গ্রামের পথ ধরে। বহু বছর আগে কোনো এক সময় এই রাস্তা পাকা হয়েছিল। তারই অবশিষ্ট কিছু পাথর আজও দাঁত বের করে আছে। তারা যেন এই গ্রামের মানুষগুলোকে দেখে আর দাঁত বের করে হাসে। কোথাও পিচের এতটুকু চিহ্ন নেই। গত বিশ বছরে প্রতিবার ইলেকশনের সময় প্রতিটা দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে একমাত্র রাস্তা পাকা করে দেবার। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। পিচ তো দূরের কথা এ রাস্তা ঢালাই করার কথা কেউ ভাবেনি। কলেজে পড়ার সময় রাতুল ‘পাগলাপুর’ নামে একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিল। এ গ্রাম যেন কিছুটা পাগলা পুরের মত। ভোট ফুরিয়ে গেলে আর কেউ খোজ নেয় না। অবশ্য গ্রামে তিন তিনটে বুথ থেকে তিনজন মেম্বার পঞ্চায়েতে যায়। তারা কিছুই করে না। প্রায় সকলেই অশিক্ষিত। কাজের ব্যাপারে হয় কিছুই বোঝে না। অথবা জেনে বুঝে কোনো এক অজানা কারনে চুপ থাকে।

রোদের তীব্রতা আর নেই। রাতুল খুব ধীরে হেঁটে চলেছে। পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে ধুলো উড়িয়ে বাইক চলে যাচ্ছে। তাতে প্রায় সে ঢেকে যাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে স্নান না করে ঘরে ওঠা যাবে না। হটাত বাড়িতে ঢুকতে দেখলে তার মা বোন কি কি ভাবতে পারে তার সম্ভাব্য একটা লিস্ট মাথায় আসছে। তারা ভাববে, স্কুলের অন্যদের সাথে মনমালিন্য হয়েছে বলে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে সে। অথবা ভাববে তাকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথাবা… ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠল। বাড়ি থেকে মা ফোন করেছে। রিসিভ করতেই মায়ের উদ্বিগ্ন কন্ঠ কানে এলো-

-খোকা কেমন আছিস তুই? তোর কিছু হয়নিতো খোকা? রাতুল বুঝতে পারছে এতক্ষণে সবাই জেনে গেছে। দুই জন মানুষ স্পটে মার্ডার। তার পরেও গোলা গুলি। ব্যাপারটা তো এখন ছড়িয়ে পড়বেই। মা কে আস্বস্ত করে বলল-

-মা আমি ভালো আছি। বাড়ি আসছি। এখন গ্রামের রাস্তায় হাঁটছি। কিছুক্ষণ পরেই বাড়ি ঢুকছি।

-ঠিক আছে খোকা তাড়াতাড়ি আয়। ফোন কেটে দিল। রাতুলের মনে হল, মা চিরদিন মা’ই। সন্তানের জন্য কি আকূলতা। পেটে ধরেছিল বলেই? নাকি লালন করেছে বলে এতো চিন্তা? মায়ের জন্য হটাত তার মন কেঁদে উঠল। চোখ ছলছল করে উঠল। কি আশ্চর্য এই তো তিন দিন আগেই বাড়ি থেকে গেছে।

আবার ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখল লীনা ফোন করেছে। আচ্ছা মা নাহয় গর্ভে ধারন করেছে, লালন পালন করেছে বলে তার জন্য এত চিন্তা করছে। কিন্তু লীনা কেন ফোন করেছে? সে কীসের জন্য তাকে নিয়ে এত ভাবে? নিশ্চয় সেও এতক্ষণে শুনেছে আকন্দপুরের ঘটনা। সেজন্যই হয়তো তার খোঁজ নিতে ফোন করেছে। সাধারণত লীনা এ সময় ফোন করেনা। তাহলে লীনার তার জন্য এত দুশ্চিন্তা কীসের? মায়ের সাথে লীনাকে মেলানোর চেষ্টা করল। না কিছুতেই তার হিসাব মিলছে না। তবে কী সত্তিই রক্তের সম্পর্কের বাইরেও সম্পর্ক আছে! দ্বিতীয় বার ফোন বেজে উঠল।

-হ্যালো লীনা।

-তুমি ঠিক আছতো রাতুল? সে অবাক হল। এভাবে লীনা কখনও তাকে ডাকেনি। তার জন্য এমন ভাবে কেউ ভাবতে পারে, কেউ তার জন্য দুশ্চিন্তা করতে পারে তা সে ভাবতেই পারে না। কলেজে পড়ার সময় ক্লাসের মেয়ারা তার দিকে তেমন তাকাত না। রাতুলের পোষাকে একটা দারিদ্রতার ছাপ থাকায় তারা তাকে সব সময় এড়িয়ে চলেছে। অবশ্য তানিয়ে রাতুলের কোনো মাথা ব্যাথা হয়নি কখনও।

আজ লীনার এমন দরদের ছোঁয়া পেয়ে রাতুলের ভিতরটা কেমন হয়ে গেল। তার যেন বাক রোধ হয়ে গেছে। পা দুটো চলছে আপন তালে। আবার লীনা কথা বলে উঠল-

-রাতুল শুনতে পাচ্ছ? তুমি ঠিক আছতো?

-হ্যাঁ লীনা ঠিক আছি। কথা গুলো অস্ফুট স্বরে রাতুলের গলা থেকে বেরিয়ে এল। সে জানতে চাইল-

-লীনা তুমি এমন করছ কেন?

-টিভিতে দেখাচ্ছে আকন্দপুরে দুই জায়গায় বোমা বাজি হয়েছে।

-দুই জায়গাতে মানে? শুধু তো পঞ্চায়েতে হয়েছে।

-আরে না না। তোমার স্কুলের সামনেও একটা মার্ডার হয়েছে।

রাতুল আঁতকে উঠল। বাড়ি আসার কথা জানিয়ে ফোন কাটল। তাহলে তারা বেরিয়ে আসার পর কি আরও খারাপ হয়েছে পরিস্থিতি? তখন বেরতে না পারলে কি যে অবস্থা হত, ভাবতেই কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমে উঠল। এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে তার ভিতর। আর কয়েক কদম এগোলেই তাদের পাড়ার গলি। দ্রুত পাচালানোর চেষ্টা করল সে। পা যেন চলছে না।

সন্ধ্যার ঠিক আগেই বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ছোটো বেলার বন্ধু ইব্রাহিম একটা মুদিখানার বারান্দায় বসে মোবাইলে খবর শুনছিল। রাতুলকে দেখে ডাকল-

-আরে রাতুল তুই বাড়িতে। এদিকে তোর স্কুলের সামনে যে মার্ডার হয়েছে জানিস? এই দেখ বলে মোবাইলটা দেখাল। রাতুল দেখতে পেল ঠিক তার স্কুলের মেইন গেটের সামনে একটা রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। মুখ চেনা যায় না। পরনে লুঙ্গী আর পাঞ্জাবি। বয়স্ক মনে হচ্ছে। কে হতে পারে। ইব্রাহিম যোগ করল তাকে জবাই করা হয়েছে। সে আর দাড়াতে পারল না। তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

মা আতঙ্কে বাড়ির সামনে পাইচারি করছিল। রাতুল আসতেই তার চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেল। মা ছেলের মাঝে আর কোনো কথা নেই। বাড়ির ভিতরে গিয়ে রাতুল জানাল স্নান করার কথা। কানিজ তাড়াতাড়ি এক পাতা সস্তার শ্যাম্পু সাবান আর গামছা দিল। অনেকক্ষণ সময় ধরে জল ঢালল। একটা সময় তার শীত করতে লাগলে সে জল ঢালা বন্ধ করল।

রাতে খেতে বসে মা রাতুলকে জিজ্ঞেস করল তার স্কুলের কথা। সেখানে কেমন চলছে সব, অন্যান্য স্যাররা কেমন, ছাত্রছাত্রীরা তার সাথে কেমন ব্যাবহার করে ইত্যাদি। সব কিছু ভালো শুনে বাবামা দুজনের মুখেই হাসি ফুটল। পিচ্চি বোন কানিজ ফোড়ন কেটে হলেও সত্যি কথাটাই বলল-

-শুধু স্কুলের সেক্রেটারি টা পাঁজি। তোর অর্ধেক টাকা মেরে দিচ্ছে বল।

তিন জনেই তার দিকে হাসি মুখে তাকাল। রাতুলের মনে পড়ল জামাল সাহেব কে মার্ডার করার প্ল্যানেই আজকের এই বোমাবাজি। হটাত তার মুখে একটা কালো ছায়া নেমে এল। বাবা সেটা লক্ষ্য করে বলল-

-ওসব নিয়ে তুই ভাবছিস কেন। যা হয়েছে তা ওদের স্থানীয় ব্যাপার। খেয়ে নে।

-তা নয় বাবা, আমি যার বাড়িতে থাকি তাকেই মারতে চেয়েছিল।

-বলিস কি? আঁতকে উঠল সকলে।

-তাহলে বাবা আর ওর বাড়িতে তোকে থাকতে হবে না। রাতুল মাথা নাড়ল। কানিজ দাদার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। বাবা খাবার শেষ করে থালাতে হাত ধুয়ে উঠতে উঠতে বলল-

-আর কবে যে এদের বুদ্ধি হবে।

সবার খাওয়া শেষ হলে বাইরের বারান্দায় রাখা চৌকিতে বসল। এটা এ বাড়ির একটা অনেক দিনের অভ্যাস। রাতুলের বাবা বলেন দিনে অন্তত একবার পরিবারের সকলের একত্র বসা ভীষণ জরুরী। তাতে সংসারে একে অন্যের প্রতি বন্ধন দৃঢ় হয়। রাতুলের দাদা দাদি বেঁচে থতে তারাও বসতেন। কিন্তু তারা এখন নেই। দাদা মারা গেছে আজ বছর পাঁচেক হল। আর দাদি গেল এই তো সেদিন, কোরোনার দ্বিতীয় ঢেউএ। না তার দাদির করোনা হয়নি। বয়স হয়েছিল। স্বাভাবিক মৃত্যু। তবুও গ্রামে কেউ কেউ রটিয়েছিল করোনায় মরেছে বলে। অবশ্য পাড়ার মানুষ তেমন আমল দেয়নি।

বাবা রাতুলকে জিজ্ঞেস করল সে একবছর পর কি করবে কারণ তার চাকরিটা এক বছরের। রাতুল পড়ার বাইরে যে কোনো পরিকল্পনা নেই তা জানাল। তাছাড়া সে চায় এই কমাসের টাকা যা জমবে তা দিয়ে তার বাবা যেন নিজে একটা ছোট্ট করে হলেও মুদির দোকান করে।

-তোর টাকা নিয়ে আমি দোকান করব কেন? তুই কিছু কর।

-না বাবা আমি এখনও কয়েক বছর চাকরির চেষ্টা করে দেখি। না হলে শেষে তোমার দোকানে বসব।

-তা বলে তোর প্রথম উপার্জনে…

রাতুল কিছুটা অভিমানের সুরে বলল-

-বারবার তুমি ‘তোর টাকা’ কথাটা কেন বলছ? আমার টাকা মানেই তো তোমার। কোনো কথা নয়, অনেক হল অন্যের দোকানে কাজ করা। আর কয়েকটা মাস কর। তারপর নিজের দোকান চালাবে। আমাদের জন্য অনেক স্যাক্রিফাই করেছ।

-খোকা তো ঠিকই বলছে। তাছাড়া তোমার যে মালিক তাকে বললে সে নিশ্চয় অখুশি হবে না। মালপত্র কিছু ধারেও পাবে।

রাতুল বাধা দিয়ে বলল-

-না, খুব ছোটো করে দোকান করো। অল্প অল্প মাল রাখ। কিন্তু ধারে একদম না। ধারে যেমন মাল আনবে না। তেমনি ধারে বিক্রিও করবে না।

কানিজ মজা করে হেসে উঠে বলল-

-আমি ভাবছিলাম, দাদার টাকাতে আমি একটা আইফোন কিনব। না তা আর হবে না।

-নারে, তোর আই ফোন এখন সাইন্সের বই। ওদিকে একদম মন দিস না। পড় অনেক অনেক পড়তে হবে তোকে।

আমি মজা করলাম। তুইও না একটা বুদ্ধু। তবে মা, আজকাল ভাইয়ার রাতে একটা ফোন আসে! বলেই হে হে করে হাসতে হাসতে পালাল। রাতুল তার পিছু পিছু নেমে গেল। বাবমা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনের মনেই প্রশ্ন- তবে কি রাতুল এতদিনে প্রেমে পড়েছে?

ঘুমনোর আগে রাতুলের মা বাবা অনেক স্বপ্ন বুনল তাদের এক বছর পরের মুদির দোকান নিয়ে। মা জানাল, বাড়িতে দোকান হলে সেও সময় দিতে পারবে। আসন্ন সুখের স্বপ্ন দেখতে দেখতে তারা ঘুমিয়ে পড়ল।

রাতে আনারুল স্যার ফোন করে রাতুল কে জানাল দুটো নয়, মোট তিনটে মার্ডার আর যখম হয়েছে অন্তত আট দশ জন। তাঁর কাছে জানতে পারল স্কুল গেটের সামনে যাকে মারা হয়েছে সে এবার জামাল সাহেবের বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়াবে বলে ঠিক হয়েছিল। সেই নাকি প্রথমে জামালকে মারতে লোক লাগিয়েছিল। পরে জামালের লোকেরা তাকে তাড়িয়ে এনে স্কুলের সামনে প্রথমে গুলি করে। পায়ে গুলি লেগে পড়ে গেলে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কবে যে আবার স্কুল খুলতে পারবে তাঁর ঠিক নেই। প্রায় তিরিশ মিনিট ধরে অনর্গল কথা বলে গেলেন ভদ্রলোক। তাতে রাতুল যা বুঝল, এই জামাল লোকটা মোটেই সোজা নয়। তাকে বিরোধীরা বহুবার মারতে গিয়েও পারেনি। এবার দিয়ে পাঁচ বার হল। তার চোখের উপরের কাটা দাগটা এরই সাক্ষী। তবে জামাল লোকটার একটা গুন নাকি খুব ভালো তা হল, সে কখনও মদ ও মেয়েদের দিকে নজর দেয় না। ফোন রাখার পর মনে মনে বলল- যে মানুষ হয়ে মানুষ হত্যা করতে পারে তার আবার ভালো গুন। স্কুল যতদিন না খোলে ততই ভালো। গেলেই তো আবার তাকে জামালের বাড়িতেই উঠতে হবে। জেনে বুঝে এমন মানুষের আশ্রয়ে সে কীভাবে থাকবে?

চলবে

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply