ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৬

ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৬

~আমজাদ হোসেন

পরদিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ে বাবাছেলে ফিরছে। তাদের বাড়ির কিছুটা দূরে আছে ছোট্ট একটা খেলার মাঠ। গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক স্কুলের মাঠ। প্রাচীর বিহীন এই মাঠে তার শৈশব কৈশর কেটেছে। এক সাথে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল যারা তাদের মধ্যে সে আর রনি ছাড়া কেউই কলেজের গণ্ডি দেখেনি। মাধ্যমিক অবশ্য জনা পাঁচেক দিয়েছিল। তারা এখন সকলেই সংসারি। সবার সাথেই এখনও বন্ধুত্ব আছে। কেউ কেউ আজকাল রাতুলকে বিয়ের জন্য বলতে শুরু করেছে। দুএকজন এমনও আছে যারা পড়া লেখায় ভালো ছিল তারা রাতুলের কাছে এসে আপসোস করে পড়তে পারেনি বলে।

সেই শৈশবের স্বর্গের পাশ দিয়ে আসার সময় রাতুল লক্ষ্য করল একটা পোড়া মাটির তৈরি গোল মত কি পড়ে আছে। সেটা তুলে নিতেই কেমন একটা গন্ধ এলো তার নাকে। মনে পড়েছে এটা তো গাঁজার কলকে। তাহলে কি এখানে বসে লোকেরা রাতে গাঁজা খেতে শুরু করেছে। তার গ্রামের ছেলেরা এত অধপতনে গেছে।

রাতুল থেমে গিয়েছিল বলে তার বাবা কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। পাশে ছেলেকে না পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল রাতুল কিছু একটা দেখছে। কাছে এসে বুঝতে পারল তার হাতে কি ওটা।

-ফেলে দে খোকা। ওপাড়ার কিছু ছেলে রাতের বেলা এখানে আড্ডা দেয়। আজকাল তারা এসব খেতে শুরু করেছে।

-মড়লরা কিছু বলেনা বাবা?

-কি বলবে, মড়লদের ছেলেরাও এতে আছে।

আর কোনো কথা না বলে ছেলের হাত থেকে কলকে টা ফেলে দিয়ে হাত ধরে বাড়ি নিয়ে গেল।

আজকাল পাড়ার মানুষেরাও অনেক বেলা করে উঠতে শুরু করেছে। এ সবই মোবাইলের আশির্বাদ! এখনও তাদের বাড়ির সকলেই খুব সকালে উঠে পড়ে। কানিজ জায়নামাজে বসে পড়ছে। পাশে রেহেলের উপর রাখা আছে কোরান। নামাজের পরে কিছুক্ষিন কোরান পড়া তার অভ্যাস। মাও পড়ে। এখন কানিজ ভৌতবিজ্ঞান পড়ছে। রাতুল পাশে গিয়ে বসল।

-কি রে কি পড়ছিস?

-দেখতে পাচ্ছিস না কি পড়ছি?

-আজকাল খুব কথা ফুটেছে তোর। কি ব্যাপার বল তো?

-ফুটবে না? আমি কি তোমার সত বোন নাকি?

বেস কিছুক্ষন খুনসুটির পর রাতুল কানিজ কে পড়াতে শুরু করল। একমাত্র বোনের মেধার বিকাশ দেখে সে ভীষণই পুলকিত। তার না হলেও বোনটা নিশ্চয় কিছু একটা করতে পারবে। ঘরের ভিতর ফোন রিং হচ্ছে। রাতুল উঠে গেল। লীনার ফোন।

লীনা আজকাল একটু বেশি বেশিই ফোন করছে না তাকে? মনে মনে ভাবতে ভাবতে ফোনটা রিসিভ করল। ওপার থেকে লীনা সুপ্রভাত জানিয়ে তাকে বহরমপুরে যাবার জন্য অনুরোধ করল। কারণ জানতে চাইলে সে রাতুলকে জানাল, এটা নাকি সার্প্রাইজ। গেলেই জানতে পারবে। সে যাবে কি যাবে না ভবাছে। লীনা এবার ভীষণ আকুতি করে বলল-

-প্লিজ রাতুল না বলো না। তাছাড়া তোমার স্কুল তো বন্ধ।

-আচ্ছা আসছি।

ফোন রাখতেই তার মনে অনেক প্রশ্ন দেখা দিল। লীনা কি চাইছে তার কাছে? সে তো সামান্য বন্ধু ছাড়া আর কিছুই না। বড়লোকের মেয়েদের এই সমস্যা, তারা কখন কি ভাবে বোঝা দায়। যদিও লীনা খামখেয়ালী মেয়ে মোটেই নয়। কেন যে তাকে ডাকল তাও বলল না।

বাইরে থেকে মা ডাক দিল-

-পান্তা খাবি খোকা?

পান্তা রাতুলের প্রিয় খাবার। কানে আসতেই বিছানা থেকে নেমে মায়ের কাছে এসে একটা পাটি বিছিয়ে বসে গেল। একটা বেশ বড়ো বাটিতে পান্তা দিল মা।

-কি নিবি? তরকারি নাকি…

-না না, কাচা লঙ্কা আর পেয়াজ লবন দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে দাও। আগে যেমন দিতে।

ছোট্ট খোকার মত রাতুল পরম তৃপ্তিতে পান্তা খেতে লাগল। পান্তার জলটা চুমুক দিয়ে খেয়ে বলল-

-মা আমি একটু পরে বহরমপুর যাব। ফিরতে সন্ধ্যা হবে।

-কেন কোনো কাজ?

-না মা, একজন বন্ধু ডাকল।

এতক্ষণে কানিজ পাশে বসে গরম গরম রুটি খাচ্ছিল আলুভাজা আর আচার দিয়ে। সে মুখ টিপে হেসে বলল-

-বন্ধু নাকি বান্ধবীরে দাদা?

-তুই মার খাবি কিন্তু কানিজ? কপট রাগ দেখিয়ে উঠে গেল। মা কানিজকে ধমক দিয়ে বলল-

-এই তোর মুখে কি কিছুই আটকায় না?

-না মা, আমি দখেছি দাদার ফোনে এতদিন কোনো মেয়ের নাম্বার সেভ ছিল না। কয়েক মাস থেকে লীনা নামে একটা নাম্বার যোগ হয়েছে।

-তুই চরম শয়তান তো! রাতুলের ফোন ঘাঁটিস।

-সেই লীনা সারাদিনে অন্তত তিনচার বার ফোন করে। হে হে হে।

-এতে হাসির কি আছে শুনি। চুপচাপ খেয়ে পড়তে বস গে যা।

রাতুল বড় হয়েছে। তার মেয়ে বান্ধবী আছে! ভাবতে মা হিসাবে ভালোই লাগল আলেয়া বিবির। রাতুলের মা সে, তাকে কেউ ফোন করে এটা তো এক রকম প্রাপ্তি। আজকাল তো স্কুলের ছেলেরা বান্ধবী নিয়ে ঘোরে, সেক্ষেত্রে তার রাতুল একটা স্কুলে মাস্টারি করছে। হোক সে একবছরের জন্য। তার বান্ধবী থাকবে না? মেয়েটা নিশ্চয় খুব সুন্দর দেখতে হবে। একেবারে পরীদের মত। ছোট্ট চাঁদ মুখে তার নিশ্চয় সব সময় হাসি লেগে থাকে। আহা এমন সুন্দর একটা বউ ঘরে আনার খুব ইচ্ছে তার। কবে যে সে দিন আসবে কে জানে।

রাতুল বাড়ি থেকে বেরবে, এমন সময় মা তার হাতে একশ টাকার পাঁচটা নোট ধরিয়ে দিল। বলল কাছে রাখ, দরকার হলে খরচ করিস। সে কিছু না বলে বোকার মত মায়ের মুখের দিকে চেয়ে আছে। মা তাড়া দিল-

-অমন হা করে আছিস কেন? বের। আমি মেঝেতে ছাঁচ দেব তুই বেরলে।

বেরিয়ে পড়ল। বাসস্টপ পর্যন্ত সে একটা কথা বার বার ভেবেছে- মায়েরা কীভাবে বুঝতে পারে সন্তানের প্রয়োজনের কথা? সে তো চায় নি। অথচ তার দরকার ছিল। কারণ তার কাছে যে কটা টাকা আছে তা জামাল সাহেবের বাড়িতে বাক্সের মধ্যে। কাল তো তাকে শূন্য হাতে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সত্তিই কি মায়েরা অন্তর্যামী? একটা মানুষ যার কোনো উপার্জন নেই সে কীভাবে অভাবের সংসারেও টাকা জমাতে পারে। রাতুল আগেও লক্ষ্য করেছে, মাঝে মাঝে তার বাবাকে অল্প অল্প টাকা বের করে দিতে। কিন্তু কীভাবে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর হয়ত আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। শুধু জানে মা যারা তারা সব পারে।

বাসে উঠে আজ সৌভাগ্য বসত সিট পেয়েছে সে। একটু পরেই ব্যাগ থেকে একটা উপন্যাস বের করল। সমরেশ মজুমদারের ‘ডানায় রোদের গন্ধ’। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বর্তমান সময়ের ঢাকা শহর। সেখানের শিক্ষিত যুবক যুবতীরা কীভাবে সংগ্রাম করে জীবনে জাতে ওঠার চেষ্টা করছে সেটা এ উপন্যাসের উপজীব্য। তুষার আহম্মেদ এ কাহিনীর নায়ক। গ্রামের অভাব ক্লিষ্ট সন্তান। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়তে এসে চাকরির জন্য তার যে লড়াই এবং সেই লড়াই তাকে নিয়ে গিয়ে ফেলবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে ম্যানহাটন শহরে। নায়িকা দিলারা অসুস্থ বাবার এক মাত্র মেয়ে। ভার্সিটিতে পড়ে। কবিতা লেখার সখ তার। শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে হয় আয়ার কাজ নিয়ে পোর্ট সৈয়দ শহরে।

বাস এসে যখন বহরমপুর মোহনা বাসস্ট্যান্ডে দাড়াল তখন বইটা প্রায় শেষের দিকে। ব্যাগের ভিতর বইটা ঢুকিয়ে নেমে পড়ল। এখন বেলা প্রায় এগারোটা। এই সময় এখানে পা রাখার যায়গা থাকে না। তার উপর টোটোর ভিড়। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যে পারছে ঢুকে যাচ্ছে যেখানে খুশি। আজকাল আবার পকেট মারের উৎপাত বেড়েছে। লকডাউনের আগে এমনটা ছিল না। বেশ নিশ্চিন্তে বহরমপুরের যে কোনো প্রান্তে যাওয়া যেত যে কোনো সময়। কিন্তু আজকাল আর সেটা সম্ভব হয় না। সবই অর্থনৈতিক অবনমনের প্রভাব।

বাসস্ট্যান্ড থেকে বেরিয়ে সমবায়িকা মোড়ে দাঁড়িয়ে রাতুল ফোনটা বের করল। লীনাকে একটা ফোন করা দরকার। ঠিক কোথায় যেতে হবে তা তো বলেনি। ফোনটা হাতে নিতেই দেখল পাঁচটা মিসড কল। লীনা ফোন করেছিল।

কল ব্যাক করল রাতুল। একবার রিং করতেই ওপার থেকে অভিযোগ ভেসে এল-

-কি ব্যাপার ফোন তুলছ না কেন?

-সাইলেন্ট মোডে ছিল। বুঝতে পারিনি।

-তুমিতো মহা কেয়ার লেস! রাস্তায় বেরিয়ে কেও ফোন সাইলেন্ট রাখে?

-বুঝতে পারিনি কখন সাইলেন্ট মোড অন হয়েছে।

-আচ্ছা, এখন কোথায় আছ তুমি? জানতে চাইল লীনা।

-আমি তো সমবায়িকা মোড়ে। কোথায় আসব?

-তুমি সোজা ডিএম বাংলোর সামনে চলে এসো।

-আচ্ছা আসছি। বলে ফোন কেটে দিল রাতুল।

দ্রুত পায়ে হেঁটে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেল। কিন্তু আশেপাশে লীনাকে দেখতে পেল না। ঠিক তখনই লীনা আবার ফোন করল-

-তুমি পৌঁছে গেছো?

-হ্যাঁ, কিন্তু কোথায় তুমি?

-তুমি দুমিনিট দাড়াও। কলটা আচমকা কেটে গেল।

রাস্তা পেরিয়ে মাঠের দক্ষিণপশ্চিম কোনে গিয়ে দাড়াল সে। স্কয়ার ফিল্ড নামে খ্যাত এই মাঠ। বলা যেতে পারে এ শহরের প্রাণকেন্দ্র। সারাদিনে কত মানুষের আনাগোনা এখানে তার ইয়াত্তা নেই। গোটা মাঠের চারিধার সুন্দর করে বাধানো হয়েছে। লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা হয়েছে বাধানো অংশ। তার পাশ দিয়ে চার পাঁচ ফুট চওড়া কংক্রিটের রাস্তা। সকালে বিকালে এই পায়ে হাঁটা রাস্তা দিয়ে শহরের নাগরিকরা হাঁটাহাঁটি করে। মাঠের চারিধারে আছে বহু প্রাচীন মেহেগুনি, শিরিশ,কৃষ্ণচূড়া গাছ। তার ছায়া তলে কত মানুষ বসে আছে। কেউ আছে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে। কেউ আছে অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণের সময়ের অপেক্ষায়। আবার কেউ কেউ হতাশ হয়ে মাথা নামিয়ে দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে বসে আছে। কপতকপতির সংখ্যাও নিতান্ত কম নেই। তারা নিজেদের মিথ্যা জীবনের স্বপ্ন বুনছে একে অন্যের হাত ধরে। তাদের কাছে চা কফি বাদাম ছোলা পেয়ারা পৌঁছে দিচ্ছে একদল গরীব ফেরিওয়ালা।

রাতুল একটু ঘন ছায়া খুঁজে নিয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। কোথা থেকে একটা চা ওয়ালা এসে সামনে দিয়ে চলে গেল। তার মাথায় নানান ভাবনা এক এক করে জড় হচ্ছে। লীনা হটাত তাকে এখানে কেন ডাকল? এখানে আসতে বলার কারণ কি? আর কেনই বা সে এলো?

সে কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের সাথে দুএকবার এসেছিল এখানে। তার ভালো লাগেনি। কেন শুধু শুধু সময় অপচয় করবে। পকেট থেকে বারফোনটা বের করে আনমনে নাড়া চাড়া করছে। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। আজকের দিনে যার নিজের হাতে একটা স্মার্টফোন থাকে না তার এভাবে এখানে একদমই মানায় না। কোনো দিন যে কিনতে পারবে তারও সম্ভাবনা নেই। কারণ তাকে বাবার জন্য সবকটা টাকা সঞ্চয় করে রাখতে হবে। এক টাকাও অনর্থক অপচয় করা যাবে না।

-হাই রাতুল। পিছন থেকে লীনা আচমকা ডেকে উঠল। রাতুল চমকে উঠে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল তাকে। একটা সাদা চুড়িদার পরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে আলতো হাসি। উঠে দাড়াল সে। বোকার মত জিজ্ঞেস করল-

-কেন ডেকেছ বলো?

-এখনি শুনবে? খুব তাড়া আছে নাকি?

-না না।

কি বলবে সে বুঝতে পারছে না। এই প্রথম কোনো মেয়ের সাথে দেখা করতে আসা। কি বলতে হয় না হয় কিছুই সে জানে না। অবশ্য গল্প উপন্যাস সিনেমাতে অনেক দেখেছে সে। প্রেমের প্রথম প্রথম এমনই হয়। কিন্তু বাস্তব আর সাহিত্য তো এক জিনিস নয়। তাহলে সে কি লীনার প্রেমে পড়েছে? মনে হতেই রাতুল ভিতরে ভিতরে চমকে উঠল। তা কি করে সম্ভব! কোথায় তার অবস্থান আর কোথায় লীনার। বামন হয়ে এমন স্বপ্ন কেন আসবে তার মাথায়? স্বভাবিক হয়ে রাতুল বলল-

-আসলে তুমি কেন ডেকেছ সেটাই তো জানি না। তাই আর কি।

-ও এই কথা। বলেই লীনা ঘাসের উপর বসে পড়ল। রাতুল এখনও দাঁড়িয়ে আছে ক্যাবলার মত।

-কি হল বসো।

রাতুল একটু দুরত্ব বজায় রেখে বসল।

-বাড়িতে সবাই কেমন আছে? জানতে চাইল লীনা।

-আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে সকলে।

-আর তোমার স্কুলের খবর?

-সবই তো খবরে প্রকাশ। তুমিও জানো।

-স্কুল কবে খুলবে কিছু বলেছে স্যার?

-না, পরিস্থিতি শান্ত না হলে কি করে খুলবে। তাছাড়া স্কুল গেটের সামনেই মার্ডার। আবার রাতুলের মনটা ভারি হয়ে গেল। তার শুধু মনে হয়, কেন এই মানুষগুলো এমন করে। এরা কি বোঝে না, নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে। ভাই হয়ে ভাইকে হত্যা করছে।

লীনা বুঝতে পারে রাতুলের মনের অবস্থা। প্রসঙ্গ ঘোরাতে সে বলে –

-বেশ তো ভালোই হল। এই কদিন মন দিয়ে প্রস্তুতি নাও। আবার তো পরীক্ষা হবে বলছে।

-আর পরীক্ষা! হলেই বা কি হবে? আমাদের তো আর হবে না।

-এভাবে হাল ছেড়ো না রাতুল। মনে রেখো, একটা চাকরিও যদি লিগ্যালি হয় সেটা যেন তোমার হয়।

রাতুলের মুখে শুকনো হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটি এত পজিটিভ কি করে? এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কেউ যে এভাবে পজিটিভ ভাবতে পারে সেটা ভেবে অবাক হচ্ছে সে।

-আজ রবীন্দ্র সদনে একটা প্রগ্রাম আছে, বেলা দুটো থেকে। তোমার জন্য আমি একটা সিট বুক করেছি?

-কী প্রগ্রাম? আগে বলোনি তো! রাতুলের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

-গেলেই বুঝতে পারবে।

আর প্রশ্ন করেনি সে। লীনা নিশ্চয় খারাপ কিছুতে ইনভলব করাবে না। এতদিনে তাকে রাতুলের একজন নিস্বার্থ শুভাকাঙ্খী বলেই মনে হয়েছে। তায় এখন আর প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। সত্তিই মেয়েটি অমায়িক। সে খনও ভাবেনি এমন একজন মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে পারবে।

রাতুলের ঠিক বামদিকে একটু দূরে দুজন ছেলেমেয়ে হেসে হেসে গল্প করছে। তাদের বয়স কত হবে? বড়ো জোর সতেরো আঠারো। হয়তো তারা খুব ভালো বন্ধু, অথবা প্রেম করছে। এত অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে কি করে লোকে? জীবনটাকে না বুঝেই প্রেম! ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে রাতুল। তাহলে অন্যরাও কি তাকে আর লীনাকে এক সাথে বসে থাকতে দেখে ভাবছে, তারা প্রেম করছে? সে কি করে সম্ভব! কোথায় লীনা আর কোথায় সে। না না তাদের এখানে এভাবে বসা ঠিক হচ্ছে না।

-চা দেব ম্যাডাম চা? চা ওয়ালার আওয়াজে রাতুল সামনে তাকাল। লীনা বলল-

-তুমি কী খাবে চা না কফি?

রাতুলের বাড়িতে শুধুমাত্র শীতের সকালে মাঝে মাঝে মা লাল চা করে। এর বাইরে চা পান করাকে বিলাসীতা বলেই মনে হয় তার। আর কফি সেতো দুরের কথা। তবে দুএকবার সে কফি পান করেছে। বেশ ভালোই লাগে। চা এর থেকে যেন কফির মধ্যে একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে।

-কি হল চা না কফি?

-কফি। কফির কথা বলেই সে মনে মনে অবাক হল। নিজেকে একটু একটু করে অচেনা মনে হচ্ছে তার। মনে পড়ছে, দাদু বলত- ‘সময় আর সুযোগের অভাবে মানুষ যেন মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। বুঝলি দাদুভাই তুই অনেক বড়ো মানুষ হবি। তোকে হতেই হবে। জানিস, রাতুল বেঁচে থাকার অধিকার কেউ তোকে দেবে না। অর্জন করতে হয়। তুই পারবি রাতুল তুই পারবি। পারতে তোকে হবেই’। দাদু আজ বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে কি বলত দাদু? রাতুল কি মানুষ হতে পেরেছে?

কাগজের কফি কাপে চুমুক দিয়ে রাতুল যেন মানুষ হল আরও একটু। এভাবেই একটু একটু করে তাকে মানুষ হতে হবে। সমাজের চোখে তারা যেন মানুষ নয়। তার বাবা অন্যের মুদির দোকানে কাজ করে। সে তো কর্মচারী, মানুষ নয়! মানুষ হতে গেলে লাগবে টাকা। অনেক না হলেও পর্যাপ্ত পরিমানে টাকা। যাদের সেই টাকা নেই তারা এই সমাজের চোখে মানুষ নয়! কেউ কর্মচারী, কেউ টোটোওয়ালা, কেউ শ্রমিক, কেউ মজুর। তারদের মানুষ হতে হবে! রাতুলকে মানুষ হতে হবে! দাদু প্রায়ই বলত- “জাতে উঠতে হবে রাতুল, তোকে জাতে উঠতে হবে।”

-কফি ঠান্ডা হয়ে যাবে তো। কী ভবাছ অত তুমি? লীনা ভেবেছে সে হয়ত স্কুলের কথা ভাবছে অথবা তার ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাবছে। কিন্তু সে কি করে জানবে রাতুল এখন মানুষ হবার কথা ভাবছিল।

-কই কিছু না তো। কথা ঘোরাল সে। দুজনে নীরবে কফি পান করেত লাগল।

হাতে সস্তার একটা ডিজিটাল ঘড়ি পরে রাতুল। এই তার একমাত্র শখ। কবজি উলটিয়ে দেখল, এখন বারোটা তিরিশ বাজে। কোন সকালে পান্তা খেয়ে বেরিয়েছে। বেশ খিদে পেয়েছে তার। বাড়িতে থাকলে এতক্ষন কিছু না কিছু খেয়ে ফেলত। কিন্তু এখানে কি খাবে সে। আসার সময় মা তাকে পাঁচশ টাকা দিয়েছে। তার কাছেও শ’দুয়েক ছিল। সে একা থাকলে সস্তার কোনো হোটেলে সবজী ভাত খেয়ে নিত। কিন্তু সাথে তো লীনা আছে। কোনো রেস্টুরেন্টে যাওয়া দরকার।

-চলো ওঠা যাক। রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল লীনা।

-কেন? দুটো বাজতে অনেক দেরি তো।

-খেতে হবে না? পনে একটা বাজে তো।

লীনা কি অন্তর্যামী? সে তো এতক্ষণ খাবারের কথায় ভাবছিল। ও জানতে পারল কীভাবে? অবাক হয়ে রাতুল জানতে চাইল-

-তুমি বুঝলে কীভাবে যে আমার খিদে পেয়েছে? আমিতো বলিনি।

-সত্যি তুমি বোকা আছো। আমাকে অনেক খাটতে হবে তোমায় নিয়ে।

-তুমি এমন রহস্য করে কথা বলছ কেন? কীভাবে জানলে বলো?

-বলছি চলো।

দুজনে উঠে পড়ল। রাস্তায় উঠে একটা টোটো ধরল লীনা। টোটোওয়ালাকে আদি ঢাকা হিন্দু হোটেলে যাবার কথা জানিয়ে দুজনেই উঠে পড়ল। রাতুল সামনের সিটে বসতে যাচ্ছিল। লীনা তাকে তার পাশে বসার ইশারা করল। একটু জড়োসড়ো হয়ে বসল পাশে।

-জানো ওখানে এত ভ্যারাইটিস রকমের মাছ রান্না হয় কি বলব। বছরের যে কোনো সময়ে যাও। যে মাছ চাইবে ওরা দেবে। রান্নাও হয় অসাধারণ। আমি তো মাঝে মাঝে যাই।

রাতুল কি করে জানবে এত কিছু। সে তো কখনও এসব ভাবতেও পারেনি। মায়ের হাতের রান্না তার কাছে অমৃত। বর্ষার কয়েকটা মাসে গ্রামের খালে প্রচুর মাছ হয়। তখন খুব সস্তা মাছের ঝোল রান্না করে তার মা। সবই দেশি মাছ। চোখ বন্ধ করলেই রাতুল সেসব ঝোলের স্বাদ পায়। আহ মায়ের হাতের রান্না!

-তোমাকে আজ আমি ট্যাংরা মাছের ঝোল খাওয়াবো। দেখবে মুখ থেকে ছাড়াতে পারবে না।

-নিশ্চয় অনেক দাম না? কি বলা উচিৎ না উচিৎ কিছুই যেন রাতুল বুঝতে পারছে না। তাই বোকার মতো এই কথাটাই বলে ফেলল।

-আরে না না। দাম খুব বেশি না। তবে ফুট পথের দোকান গুলোর থেকে একটু বেশি।

হোটেল থেকে বেরিয়ে লীনা আবার একটা টোটো ধরল। রাতুলকে বিল দিতে দেয়নি সে। রাতুল আপত্তি করলেও সে শোনে নি। পাশে বসে রাতুলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল-

-তুমি রাগ করেছ?

-এর পরে কখনও খেলে কিন্তু আমি বিল দেব। অভিমানের সুর চড়িয়ে উত্তর দিল সে।

-আচ্ছা বাবা তাই হবে। এখন বলো কেমন লাগল খেতে?

-একেবারে আমার মায়ের হাতের ট্যাংরার ঝোলের মতো। বিশ্বাস করো মায়ের রান্নার স্বাদ এর থেকেও ভালো। তবে এরা মশলা কিছু বেশি দিয়েছে।

-তাহলে তো একদিন খেতে হয় দেখছি ! কি বলো খাওয়াবে না?

-নিশ্চয়! তবে তো তোমাকে আমাদের বাড়ি যেতে হবে?

-যেতেই তো চাই। বিড় বিড় করে বলে উঠল লীনা। রাতুল ঠিক স্পষ্ট শুনতে পেল না।

-কি বললে?

-না কিছু না। যাব একদিন।

তারপর লীনা কথা ঘোরাল। একথা সেকথা বলতে বলতে টোটো এসে তাদের রবীন্দ্রসদনে পৌঁছে দিল। রাতুল তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে দিল। দুজনে পাশাপাশি হেঁটে প্রবেশ করল সদন চত্তরে। এই কবছরে সদনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। চারিদিকে উঁচু পাচীরে ঘেরা সদন চত্তর। পায়ে হাঁটার রাস্তা গুলো পাথর দিয়ে বাঁধানো। প্রাচীরের ভিতরে অনেক ফুলের গাছ। ঝাও গাছও আছে অনেক গুলো। মূল গেটের সামনে গোল করে ঘিরে সেখানে বিদেশি ফুলের গাছ বসানো হয়েছে। তার দুই পাশ দিয়ে অর্ধবৃত্তাকার পথ চলে গেছে সদনের মূল ভবনের সামন।

এখনও লোকজন তেমন প্রবেশ করেনি। লীনা রাতুলকে নিয়ে রিসেপশনে গেল। সেখানে টিকিট দেখিয়ে সদনের ভিতরে নির্ধারিত আসনের দিকে এগোল।

বাইরের তীব্র আলো থেকে এসে ভিতরটা কেমন অন্ধকার মনে হল রাতুলের। হলের মাঝ বরাবর রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। এখন অনেকটা পরিষ্কার মনে হচ্ছে তার। বিরাট হল ঘর। কলেজে পড়ার সময় একটা প্রগ্রামে এসেছিল সে। তখন এত চাকচিক্য ছিল না। এসি চালানো হয়েছে। বাইরের তুলনায় ভিতরের ঠান্ডাটা বেশ ভালোই লাগছে রাতুলের।

লীনা একেবারে সামনের দিকের দ্বিতীয় সারির দুটো সিট দেখিয়ে রাতুলকে বলল-

-এ দুটো সিট আমাদের। চলো বসে পড়ি।

রাতুল কোনো কথা না বলে বসে পড়ল। তার পাশের সিটে বসল লীনা। এখন একটা বেজে পঁয়তাল্লিশ। অনুষ্ঠান শুরু হতে আরও পনের মিনিট বাকি। রাতুল অবাক বিস্ময়ে চারিকিদ দেখছে। মঞ্চে কত বড়ো বড়ো কালো পর্দা ঝোলানো। একজন সেখানে কি সব পরীক্ষা করছে। মঞ্চের বাম দিকে আছে পোডিয়াম। একজন লোক এসে সাউন্ট সিসটেম পরীক্ষা করে দেখল।

-তুমি আগে কখনও আসনি এখানে?

-কলেজে পড়ার সময় একবার এসেছিলাম। তবে ওই পিছনের দিকে বসে ছিলাম। এত সামনে এই প্রথম।

-আচ্ছা শোনো এখুনি অনুষ্ঠান শুরু হবে।

লীনার মুক থেকে এ কথা বেরতেই মঞ্চের পিছনে উপরের দিকে একটা সাদা কাপড়ের উপর লেখা ফুটে উঠল ‘রবীন্দ্র চর্চায় মূর্শিদাবাদের বাঙালি’। রাতুলের মন আনন্দে ভরে উঠল। বাহ নিশ্চয় খুব ভালো মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান হবে। এবার ঘোষক মাইকে ঘোষণা করলেন। তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, গান কবিতা আবৃত্তি আর রবীন্দ্র আলোচনা আজকের অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

একটু নড়ে বসে রাতুল লীনাকে ধন্যবাদ জানাল, এমন সুন্দর অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দেবার জন্য। পিছনের দিকে দেখল সে, এতক্ষণে অনেক লোকের সমাগম ঘটেছে হলে। বাহ কত সংস্কৃতি মনা মানুষ বাস করে এই শহরে। আর তার গ্রামের মানুষ হয়তো এসব কথা ভাবতেই পারে না। সে নিজেই কি আজ সকাল পর্যন্ত ভাবতে পেরেছিল? তার মনের সুপ্ত মানুষটি যেন সত্তিই আনন্দে আত্মহারা। সে আজ রবীন্দ্র সদনে রবীন্দ্র চর্চার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে, এটা কম কীসের।

-রাতুল আমাকে এবার মঞ্চে যেতে হবে। কিছুক্ষণ পরে তোমার কাছে ফিরে আসব। বলেই লীনা মাঝের রাস্তা দিয়ে মঞ্চে উঠে গেল। তখনি মাইকে সঞ্চালক ঘোষণা করলেন-

-অনুষ্ঠেনে আগত সকল মননশীল নাগরিককে জানাই রাবিন্দ্রীক অভিনন্দন। এখনি আমরা আমাদের অনুষ্ঠান শুরু করছি। আজ উদবোধনী সংগীত পরিবেশনের জন্য আমি অনুরোধ করছি বিশিষ্ট সংগীত ও বাচিক শিল্পী মাননীয়া নাজনীন খন্দেকার লীনাকে। লীনা আপনাকে মঞ্চে আসার জন্য অনুরোধ করছি।

রাতুল হতবাক হয়ে বসে আছে। তার ভাবনা যেন থেমে গেছে। সে কিছুই ভাবতে পারছে না। লীনা মঞ্চে উঠতেই করতালিতে ভরে গেল হল। তাহলে লীনা নিশ্চয় এদের কাছে জনপ্রিয় একজন শিল্পী। তা না হলে এত হাততালি কেন পড়বে? রাতুল হাততালি দিতেও ভুলে গেছে।

লীনার সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে ভরে যাচ্ছে রবীন্দ্রসদন। আর রাতুলের মনে তখন সম্ভব অসম্ভব যত ভাবনারা একসাথে জড়ো হতে শুরু করেছে। কোনো কিছুই সে স্বাভাবিক ভাবে ভাবতে পারছে না। তার মত একজন অতি সাধারণ মানুষের সাথে লীনা কেন এত মিশছে? তার কী এমন যোগ্যতা আছে যা দেখে লীনা তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছে? নাকি তাকে দয়া করছে মেয়েটি?

কখন গান শেষ হয়েছে, করতালিতে ফেটে পড়েছে হল ঘর তা টের পায়নি রাতুল। লীনা এসে পাশে বসে জিজ্ঞেস করল-

-খুব ভালো হয়নি বলো পরিবেশনটা?

অ্যাঁ! গানের সে তো কিছুই জানে না। ভালোমন্দ বিচার করবে কি করে? মুখে বলল-

-এমন বলছ কেন? ভালোই তো গেয়েছ।

-তাহলে তুমি হাত তালি দিলে না কেন?

এবার লজ্জায় পড়েগেল সে। কি বলবে এখন? তার মনের ভিতর তো চলছিল ভুমিকম্পের তোলপাড়। সে তো ঠিকঠাক শুনতেই পায়নি লীনা কী গেয়েছে। লজ্জা লুকাতে মুখে বলল –

-খুব ভালো গেয়েছ।

প্রায় দেড় ঘন্টার অনুষ্ঠান মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখল সে। আর কত কথা যে লীনা তার কানে ফিসফিস করে বলে গেল তার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। অনুষ্ঠান শেষে লীনা রাতুলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিষিষ্ট সাংবাদিক কবি সাহিত্যিক গবেষক দের সাথে। রাতুল এক নতুন জগতের সাথে পরিচিত হল। জীবনের এক নতুন অধ্যায় খুলে গেল।

রবীন্দ্রসদন থেকে বেরিয়ে লীনা দুটো কর্নেটো নিয়ে একটা রাতুলকে দিল। আইসক্রিম খেতে খেতে লীনা বলল-

-চলো হেঁটে যায়।

-কোথায় আবার যাবে?

-কেন তোমাকে বাসে তুলে দিতে।

-আমি তো একাই যেতে পারব। বোকার মত বলে বসলো রাতুল।

-আমি গেলে আপত্তি আছে তোমার?

লীনার এ কথার কোনো উত্তর দিতে পারল না সে। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল লালদিঘীর পাড় বরাবর রাস্তা দিয়ে। দিনের আলোর প্রখরতা কমে এসেছে। বিকেলের সোনালী আলো এসে পড়েছে লীনার মুখে। রাতুল তার মুখের দিকে তাকাতেই অভিভূত হয়ে গেল। একজন নারী যে এত সুন্দর মায়াবী মুখের অধিকারী হতে পারে তা রাতুল ভাবতেই পারছে না। তার ক্লাসের মেয়েগুলোকে দেখেছে, কই তাদেরতো এমন মনে হয়নি কখনও? তবে কি রাতুল লীনার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে ? তা কি করে সম্ভব, কোথায় সে আর কোথায়… না কি সব ভাবছে সে। নিজেই নিজেকে বোঝায়। হয়তো লীনা শুধু মাত্র তাকে বন্ধু মনে করে। তার থেকে বেসি কিছু নয়।

বাসস্ট্যান্ডের কাছে বেশ কিছু বই এর দোকান আছে পরপর। সেখান থেকে লীনা একগুচ্ছের বই কিনে রাতুলের হাতে ধরিয়ে দিল। এত বই রাতুল কখনও এক সাথে কেনার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। সে আপত্তি করা সত্ত্বেও বই গুলো তাকে নিতে হল।

ঠিক তখনি তার পিচ্চি বোন কানিজের কথা মনে পড়ল। সে সাইন্সের বই খুব পছন্দ করে। সামনে রাখা ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির বইদুটো হাতে নিয়ে পাতা উলটে দেখল অনেক দাম। দুটো বই এ প্রাই এগারোশ টাকা। তার কাছে অত নেই। রেখে দিল সে। লীনা সেটা লক্ষ্য করে বলল-

-কার জন্য?

-কানিজ আমার বোনের জন্য। ও খুব পছন্দ করে। কিন্তু…

-ও দুটোও দিন দাদা। দোকানিকে উদ্দেশ্য করে বলল লীনা।

-কিন্তু অনেক দাম তো। বাধা দিতে গেল রাতুল।

-তোমার বোন কি আমার বোন নয়?

লীনার প্রশ্নে রাতুল আর কিছু বলতে পারল না। ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে বাসে উঠল সে। জানলার কাছে এসে লীনা তাকে বাড়ি ফিরে ফোন করতে বলে চলে গেল। যাবার আগে সে দেখতে পেল, বিকেলের শেষ আলোয় লীনাকে যেন কোন এক অজানা জগতের পরীদের মত মনে হচ্ছে। তার ছোয়াতে যেন পৃথীর সব অসুখ সেরে যাবে।

বাস ছুটে চলেছে বাড়ির দিকে। রাতুল তার স্বপ্নের জগত থেকে যেন খুব দ্রুত ফিরে আসছে বাস্তবের মাটিতে। তার বাব মা ছোট্ট বোন, তার এক বছরের চাকরি। চাকরির কথা মনে পড়তেই গতকালকের ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে পড়তেই সে আঁতকে উঠল। সে যে সমাজে বাস করে সেই সমাজ তো এর থেকে ভালো কিছু নয়। শুধু কি তার সমাজ, কান পাতলে যেন বাতাসের মাঝে শোনা যায় অসহায় মানুষের আহাজারি। সে তো সেই মানুষদের একজন।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply