ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ১

ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ১

~আমজাদ হোসেন

মসজিদ থেকে বেরিয়ে জুতো পরার জন্য মাথা ঝুঁকিয়েছে। কানে এলো কে যেন তাকে ডাকছে। এক পাটি জুতোয় পা গলিয়ে মাথা ডানদিকে কাত করে দেখার চেষ্টা করল রাতুল। না কাউকে দেখতে পেল না। অন্য পাটির জন্য মাথা ঝুঁকিয়েছে। তখনি ডাকটা স্পষ্ট হল। জুতো গলিয়ে মাথা সোজা করে উঠে দাড়াতেই দেখতে পেল সামনে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। 

রাতুল জিজ্ঞেস করল- 

-কিছু বলছেন?

-আমার গ্রামের কোনো যুবক তো মসজিদ মুখি হয় না।কিন্তু তুমি? 

-আমি ভিন গ্রামের। এদিকে একটা স্কুলে ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছি।

-খুব ভালো কথা বাবা। তোমাদের মত যুবকরা যদি মসজিদ মুখি হয় তবেই না ইসলামের সাফল্য। আমরা বুড়োরা আর কি করতে পারি বলো। বৃদ্ধের কন্ঠ থেকে আক্ষেপ ঝরে পড়ল। 

-কিন্তু আপনার গ্রামের যুবকরা কেউ সালাত আদায় করেনা কেন? 

-অধিকাংশ অশিক্ষিত। তারা সব নেশায় ডুবে আছে। যে দু’একজন লেখাপড়া করে তারাও মসজিদ মুখি হয় না। কথা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল বৃদ্ধ।

রাতুল আর কিছু না বলে স্কুলের দিকে পা বাড়াবে ভাবছে। বৃদ্ধ আবার কথা বলে উঠল। করুন আকুতির স্বর যেন গলা থেকে বেরিয়ে এলো।

-বাবা একটা উপকার করবে? রাতুল কিছু না বলে তার মুখের দিকে তাকালো।

-আমি গ্রামের কিছু যুবকদের ডাকব। তুমি যদি তাদের বুঝিয়ে বলো সালাতের জন্য। এমন আকুল আবেদন সে কখনও কোথাও শুনেছে বলে মনে হয় না। 

-আমি সাধারণ শিক্ষিত। ধর্মের কতটুকুবা জানি। ইমাম সাহেবকে দিয়ে তাদের বোঝান।

-সে চেষ্টা অনেক করেছি বাবা, কোনো কাজ হয় নি। 

এরপর আর কোনো কথা খাটে না। রাতুল অগত্যা রাজি হয়ে স্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

ইন্টার্ভিউ থেকে বেরিয়ে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রাতুল। চাকরিটা তার হবে কি না কিছুই বুঝতে পারছে না। কেননা বোর্ডে তাকে তেমন কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। সাধারন কথা বার্তা স্যারেদের সাথে। তাহলে কি তাকে নেবে না? আগে থেকেই কি কাউকে সেটিং করে রেখেছে? যদি তা হয়, তাহলে এত দীর্ঘ সময় নিয়ে তার সাথে সদর্থক কথা কেন বললেন? নাকি তাকে নিতে পারে! পাওয়া না পাওয়ার দোলায় তার মন দোদুল্যমান। 

এখন কি করবে সে? কি করা উচিৎ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে কি স্কুল থেকে চলে যাবে নাকি অপেক্ষা করবে হেড স্যারের উত্তরের জন্য। এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে তার মধ্যে। এমন সময় পিয়ন এসে রাতুলকে বলে গেল সে যেন এখনই চলে না যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কুলের সেক্রেটারি আসছেন। তিনি কথা বলে ফাইনাল জানাবেন। 

রাতুল অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে। পিয়ন চলে যাবার সময় তার হাতে এক কাপ গরম লাল চা দিয়ে গেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে সে ভাবতে থাকে –তাহলে কি তার চাকরিটা শেষ পর্যন্ত হবে? তাকে নেবে তারা? ডেমো ক্লাসে ছেলেমেয়ে গুলোর উজ্জ্বল মুখ তার মনে পড়ছে। তারা তার ক্লাসে ভীষন খুশি হয়েছে, সে দেখেই বুঝেছে। তারা নিশ্চয় হেড স্যারকে সদর্থক রিপোর্ট করেছে। তাছাড়া ভাইভার সময় বাকি স্যারেদের আচরণও সদর্থক ছিল বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে কি সত্যি চাকরিটা হবে?

চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে রাতুল শূন্যের দিকে চেয়ে আছে। স্কুলটা খুব বড় নয় আবার খুব ছোটও নয়। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে স্কুলের অবস্থান যেন এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। স্কুলের একদিকে গ্রাম অন্যদিকে ধানক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শুধু ধান আর ধান। চোখ জোড়ানো সবুজ ধানের জমি। সেখান থেকে মৃদুমন্দ হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে রাতুলের দেহমনকে। এমন টেনশনের সময়েও রাতুলের মনে গুন গুন করে বেজে উঠে কত সব গানের কলি। 

পিওন এসে রাতুলের হাত থেকে শূন্য কাপটা নিয়ে বলল- 

-স্যার, আপনার চাকরিটা হবে। চিন্তা করবেন না। আবারও মনের ভিতরে এক সুপ্ত বাসনা দুলে উঠল। 

একটা চাকরি তার সত্যিই খুব দরকার। যদিও এটা কোনো পার্মানেন্ট চাকরি নয়, একবছরের ডেপুটেশন ভ্যাকান্সি। যদি হয় তাহলে অন্তত একবছর প্রতিমাসে তিরিশ হাজারের উপর বেতন। তা দিয়ে আরও কয়েকটা বছর লড়াই করার বল পাওয়া যাবে। চাকরির আকালের বাজারে এটা কম কিসের! 

রাতুলের মাকে খুব মনে পড়ছে এখন। যখনই তার মনে একটু সুখের হাওয়া লাগে তখন প্রথমেই মনে পড়ে তার দুখিনী মায়ের মুখ। কত কষ্ট করে তাকে পড়ালেখা করিয়েছে তা রাতুল ছাড়া আর কেইবা জানে। কোনো এক কালে তার মা প্রাইমারি পাশ করেছিলেন। মায়ের মাথা ছিল ভালো। কিন্তু নানার অভাবের সংসারে পড়ালেখা আর হয়ে ওঠেনি। তায় মা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে আপোষ করেননি। গ্রামের সকলে রাতুলের বাবামাকে পাগল বলতো, ইটভাটার কাজে না পাঠিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য। 

কি এক অদম্য ইচ্ছা রাতুলের বাবা-মাকে দমাতে পারেনি। সংসারে প্রচন্ড অভাব সত্ত্বেও কখনও রাতুলকে কাজে যাবার কথা বলেনি তার বাবামা। তারা শুধু স্বপ্ন দেখে, তাদের সন্তান একদিন অনেক বড়ো মানুষ হবে। চাকরি করবে। সকলে এক নামে চিনবে তাদের অপত্যকে। তারা আজও সেদিনের সেই স্বপ্ন দেখে রোজ।

খুব মনে পড়ছে মাকে। পকেট থেকে ছোট্ট ফোনটা বের করে মাকে ফোন করবে কি করবে না ভাবছে। না থাক আগে কনফার্ম হোক তার পর না হয় জানাবে সে। পকেটে রাখতে যাবে এমন সময় ফোন বেজে উঠল। লীনা ফোন করেছে। সেই তাকে এখানের ভ্যাকান্সির খোঁজটা দিয়েছিল।

কলটা বেজে বেজে কেটে গেল। রাতুল দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ভাবল- থাক, একেবারেই খবরটা দেব। শেষে যদি না হয়। 

এই অসময়ে কোথায় যেন একটা পাখি ডাকছে। কোন পাখি ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ডেকে ডেকে যেন ক্লান্ত হয়ে পাখিটা ফিরে গেছে। চারিদিকে কেমন এক শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করেছে রাতুল। তাহলে কি তার চাকরিটা হবে না? যদি নাই হয় তাহলে তাকে বসিয়ে রেখেছে কেন? না কি হবার সম্ভাবনা আছে। সময় যেন আর কাটতে চায় না। 

সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেল, ধান জমির আল দিয়ে লুঙ্গি পরে একজন কে আসছে। কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল ঠোঁটে আটকে আছে জ্বলন্ত বিড়ি। লুঙ্গি হাটুর উপরে ভাঁজ করে পরা। গায়ে কলার তোলা ডোরাকাটা হাফহাতা গেঞ্জি। 

মাঠ থেকে এসে স্কুলের সামনের টিউবয়েলের জলে পায়ের কাদা ধুয়ে স্কুলের বারান্দায় উঠলেন। পায়ে চটি জুতার বালাই নেই। তার পর সোজা ঢুকে গেলেন হেড মাস্টারের ঘরে। রাতুল লক্ষ্য করেছে, ঢোকার সময় এই আগন্তুক সামান্য পারমিশন টুকুও নেননি। একটু পরেই পিওন এসে হাসি মুখে বলল-

-আসুন স্যার সেক্রেটারি এসেছেন। আপনাকে ডাকছেন। রাতুলের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এমন মানুষ যদি স্কুলের সেক্রেটারি হন তাহলে তো খবর আছে। কি আর করার, মিথ্যা আশা বাইরে রেখে হেড মাস্টারের ঘরের সামনে গিয়ে দাড়াল। পর্দা সরিয়ে অনুমতি চাইল-

-আসব স্যার? হেড মাস্টার সরল গোবেচারা টাইপের মানুষ। তিনি হেসে উঠে বললেন-

-আসুন আসুন। আসুন স্যার। রাতুল ভিতরে প্রবেশ করতেই তিনি একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন-

-বসুন। ইনি হচ্ছে স্কুলের সেক্রেটারি। জামাল সাহেব। উনি এই পঞ্চায়েতের প্রধানও। 

রাতুল সেক্রেটারির দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ জানাল। তার উত্তরে লোকটা কর্কশ কন্ঠে এক নিশ্বাসে বলে গেলেন-

-দ্যাখেন মাস্টার। আপনাকে আমি নিতে পারি। কিন্তু একটা শর্তে। তা হল আপনি যা বেতন পাবেন তার অর্ধেক আমাকে দিতে হবে প্রতি মাসে। তার বিনিময়ে আমার বাড়িতে আপনার থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করে দেব। শুনলাম আপনি বেলডাঙ্গার ওদিক থেকে এসেছেন। অত দূর থেকে তো আর রোজ যাওয়া আসা করতে পারবেন না। আর এখানে এই গ্রামে বাড়ি ভাড়াও পাবেন না। আমার বাড়িতেই থাকবনে, খাবেন আর স্কুল করবেন। বেতন হলে আমাকে অর্ধেক টাকা দিতে হবে। রাজি থাকলে বলুন। আজই হেডমাস্টার সব কাগজ করে দেবে। আমার লোক আছে কোনো সমস্যা হবে না। 

সেক্রেটারি থামার পরপরই আবার বিড়ি ধরালেন। সামনে যে হেডমাস্টার বসে আছেন। এটাযে স্কুল সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রাতুল চুপ হয়ে গেছে। সে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এতক্ষণে সে লক্ষ্য করেছে, ভদ্রলোকের বামদিকের চোখের উপরে বেশ বড়ো একটা কাটা দাগ। সে দাগ গালেও ফুটে উঠেছে। আর বুঝতে বাকি থাকে না, ইনি কে! 

হেড মাস্টার রাতুলকে চুপ থাকতে দেখে বললেন-

-তাহলে স্যার রাজি তো নাকি? রাতুল একটু নড়ে বসে গলা ঝেড়ে বলল-

-স্যার, একেবারে অর্ধেক টাকা! তাহলে তো আমার কোনো কিছুই থাকবে না। পাশ থেকে বিষধর সাপের মত গলা বাঁকিয়ে বিড়ির ধোয়া ছেড়ে বললেন-

-তাহলে মশায় আপনাকে করতে হবে না। অন্য যারা আছে তাদের ডেকে নেব। অনেকেই দিতে রাজি আছে। আপনার পড়ানো ভালো, নাম্বার ভালো তায় বলছি। নইলে- 

রাতুল ঘাবড়ে গিয়ে বলল-

-স্যার, কিছুটা কম করা যায় না? মানে যদি কুড়ি শতাংশ নিতেন, তাহলে আমার বাড়িতে কিছু কিছু পাঠাতে পারতাম।

-দেখুন আপনাদের মতো অত পড়ালেখা করা লোক না আমি। কোনোদিন স্কুলের চৌকাঠ মাড়ায়নি। এখন আপনার ওই প্যাঁচের হিসাব আমি বুঝিনা। যদি করেন তাহলে অর্ধেক লাগবে, ব্যাস। 

-প্লিজ স্যার, গরিব মানুষ। একটু এদিকটা ভাবুন।

-ধ্যাততেরিকে মশায়। বেশি ভ্যাজর ভ্যাজর করেন নাতো। করতে হয় করুন, না হয় না করুন। এই হেড মাস্টার আমি চললাম। আপনি দেখেন। বলেই লোকটা যেভাবে যেদিক থেকে এসেছিলেন, সেভাবে লুঙ্গি ভাঁজ করতে করতে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেলেন। 

রাতুল পাথরের মত বসে আছে। হেড মাস্টারও চুপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর হেড মাস্টার কথা বলে উঠলেন-

-সরি স্যার। আমার কিছু করার নেই। এভাবেই আমাদের চলতে হচ্ছে। অনেক দূর থেকে চাকরি করতে আসি। প্রতিবাদ করতে গেলে কি হবে বুঝতেই পারছেন। 

-তা বলে এভাবে?

-দেখুন স্যার, এটা আপনি নিশ্চয় বুঝে গেছেন যে আমার কিছু করার নেই। এখন আপনার ইচ্ছে।

রাতুল ভেবে পাচ্ছে না সে কি করবে। এই ভাগাড়ের দেশে তাহলে আর কিছুই বাকি নেই। অথচ তার চাকরিটা খুব দরকার। সামান্য একটা ডেপুটেশন ভ্যাকান্সির জন্য যদি এই হয়, তাহলে পার্মানেন্ট পোষ্ট গুলোর ক্ষেত্রে কি হচ্ছে তা আন্দাজ করতে পারছে। এখন তার মাথায় কিছুই আসছে না। এদিকে হেড স্যার তাড়া দিচ্ছে যা বলার তাড়াতাড়ি বলার জন্য।

-স্যার আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিন, বাড়িতে একটু কথা বলে নিই।

-আচ্ছা ঠিক আছে, তা করুন। কিন্তু দেরি করবেন না। এখুনি সেক্রেটারি ফোন করে গালাগালি করতে শুরু করবে।

হেড স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমে বাড়িতে ফোন লাগাল। মা কে জিজ্ঞেস করতেই অন্যান্য বিষয়ের মতো এবারও বলল- দেখ তুই যা ভালো বুঝিস। 

কিছুক্ষণ পর হেড স্যারের ঘরে প্রবেশ করে কোনো ভূমিকা ছাড়া জানিয়ে দিল, সে এভাবে জয়েন করবে না। যদি পূর্ণ বেতন দেয় তবেই জয়েন করতে পারে সে। হেড স্যার কি যেন ভাবলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-

-আপনার মত হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তবে স্যার আপনাকে আমি দুই দিন সময় দিলাম। ভেবে দেখবেন। আপনার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলাম। 

অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। স্কুল থেকে বেরনোর সময় একদল ছাত্রছাত্রী জিজ্ঞেস করছিল কবে থেকে আসছেন তাদের রাতুল স্যার। হাসি মুখে মাথা নেড়ে বিদায় নিলো। হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি সে। 

রাস্তায় আসতে আসতে কত কি ভাবনা তার মাথায় এসে জমেছে। শুধু বার বার তার মনে হয়েছে, সে যেন ন্যায়, নীতি, আদর্শের বোঝা মাথায় নিয়ে এক ভাগাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারদিকে ছড়িয়ে আছে মৃত লাশ। চিল-শকুনি, শেয়াল-কুকুরে কাড়াকাড়ি করছে। তার কাছে সেই সব কাড়াকাড়ির পৈশাচিক উল্লাস যেন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।  

Facebook Comments Box
Show 1 Comment

1 Comment

Leave a Reply