বাড়িতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে গেছে। বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দুই কিমি পথ পায়ে হেঁটে তবে বাড়ি পৌঁছাতে পারে। গ্রামের আর সকলে এই সামান্য পথ টুকুও হাঁটে না, সকলেই টোটোতে করেই যাতায়াত করে। একমাত্র সেই হেঁটে আসে যায়। কারণ দশটা টাকারও তার কাছে এখন অনেক মূল্য।
বাড়িতে ঢুকতেই মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেল রাতুল। মা তাকে নিয়েই যেন কার সাথে কথা বলছে। কাছাকাছি হতেই বুঝতে পারে, তার বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে। মনে মনে হাসল। এই অসময়ে বিয়ে, নিজেরই পথ চলার উপার্জন নেই সে নাকি করবে বিয়ে! মাকে ডাক দিতেই চকিত হয়ে মা বলল-
-রাতুল, এত দেরি হল যে খোকা?
-এমনি মা। বাসটা আসতে অনেক লেট করেছে। বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে সে কলের পাড়ে গেল হাতে মুখে জল দিতে।
-আপনার ছেলে কিন্তু ভাবী অনেক সুন্দর হয়েছে। মেয়ের বাবা দেখলে আর না করবে না।
কলের পাড় থেকে রাতুল সবই শুনতে পেল। ঘরে উঠে চিনতে পারলো ঘটক মহাশয়কে। তার দিকে তাকিয়ে রাতুল জিজ্ঞেস করল-
-কেমন আছেন কাকা?
-ভাল আছি বাবা। তুমি কেমন আছ?
-জী আলহামদুলিল্লাহ্। মা, বাবা এখনও ফেরেনি?
-না, তবে ফেরার সময় হয়ে গেছে। তুই জামাকাপড় ছাড়।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রাতুল নিজের ঘরে গেল। নিজের ঘর বলতে মাত্র দুকামরার একতলা ইটের বাড়ির একটাতে সে থাকে আর একটাতে বাবামা। কোনো আত্মীয় পরিজন এলে অধিকাংশ সময় রাতুলকে ঘর ছাড়তে হয়। অনেক দিন আগে তার বাবা হায়দার আলি ব্যাবসা করে কটা টাকা ইনকাম করেছিল। তা দিয়ে এই ঘর দুটো করেন। প্লাসটার হলেও আজও রং করা হয়নি।
রাতুল ঘরে ঢুকে আলো জ্বালল। একটা সস্তার বাল্ব জ্বলছে। ঘরে ছাতে ঝুলছে খুব কম দামের একটা পুরাতন ফ্যান। গায়ের জামাটা খুলে দেওয়ালে লাগানো হুকে টাঙিয়ে রেখে বিছানায় উঠে বসল। বাইরে থেকে ঘটক ও মা’র কথা কানে আসছে। সেদিকে অবশ্য রাতুলের কোনো লক্ষ্য নেই। সে ভাবছে, বাড়িতে এখন কি জানাবে? কীভাবে বলবে যে এভাবে তার চাকরি করার কোনো ইচ্ছে নেই। সে না চাইলে যে বাবা-মা চাপ দেবে না তাও জানে। কিন্তু বাবার অপারগতার কথা ভাবতেই তার চোখে জল চলে আসে। কি অমানুষিক কষ্ট না তার বাবামা করছে।
-দাদা আমার বইটা এনেছিস? বলতে বলতে ছোটো বোন ঘরে ঢুকল।
-হ্যাঁ এনেছি। কিন্তু তুই এখনি দশমের সাইন্স বই কি করবি?
-পড়বো। আমার নাইনের বই শেষ হয়ে গেছে।
-বলিস কি! সত্যি শেষ হয়েছে?
-হ্যাঁ দাদা। তুই না, আমার কিছুই বিশ্বাস করিস না। কি মনে হয় তোর? তুই একাই সাইন্স বুঝিস আর কেউ বোঝেনা?
-না তা ঠিক নয়। মাত্র পাঁচ মাসে তুই নাইনের পুরো বই শেষ করে ফেলেছিস। আমিও তো কখনও এভাবে পারিনিরে।
-তুই পারিসনি বলে কি আমি পারব না?
-আচ্ছা পরীক্ষা নিই তোর থাম।
-চকলেট লাগবে কিন্তু?
চকলেটের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল পিচ্চি বোনের দিকে। আর কানিজ একের পর এক সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে গেল। বোনের এমন মেধা দেখে রাতুল ভীষণ আপ্লুত। গদগদ হয়ে সে বোনকে জিজ্ঞেস করল অন্যান্য বিষয় গুলোর খবর। কানিজ জানাল সেগুলোও তার শেষ হয়েগেছে। রাতুল একটা বই দিয়ে বলল-
-আচ্ছা ঠিক আছে তোকে আমি দশম শ্রেণির সব বই যোগাড় করে দিচ্ছি। এখন পড়তে বসগে যা।
-যাচ্ছি। দাদা তোর কাজটার কি হল? বোনের উদ্দীপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বলল-
-মনে হচ্ছে হবে।
-সত্যি বলছিস তো?
-হ্যাঁ। কিন্তু বাবামাকে এখনই কিছু জানাস না।
-জানাব না। কিন্তু প্রথম মাসের বেতন পেলে আমাকে অ্যাডভান্স লেবেলের কিছু বই কিনে দিবি বল?
-আচ্ছা দেব। তুই যা।
বাইরে থেকে মায়ের কথা কানে এল। রাতুলের বাবাকে লক্ষ্য করে বলছে-
-এত দেরি করলে যে আজ? কোনো সমস্যা হয়নি তো?
-না গো কোনো সমস্যা হয়নি। দোকান বন্ধ করব ঠিক সেই সময় দুরের এক কাস্টমার এল। মালিক আর ফেরাল না। তাই দেরি। আচ্ছা রাতুল ফেরেনি?
-হ্যাঁ ফিরেছে। তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসো। আমি খাবার বাড়ছি।
খেতে বসে রাতুলকে বাবা জিজ্ঞেস করল তার ইন্টার্ভিউ সম্পর্কে। এতকক্ষন সে ঘরে বসে এটা নিয়েই ভাবছিল। অসুস্থ বাবার অন্যের মুদি দোকানে কাজ করা, বোনের পড়াশোনার খরচ, মায়ের অভাব ক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে সে অন্যায়কে মেনে নিয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাফ বেতনেই চাকরিটা করবে।
রাতুলকে চুপ থাকতে দেখে তার বাবা ভেবেছে এটাও হয়নি। তিনি বললেন-
-ঠিক আছে। অন্য কোথাও চেষ্টা কর। এটা হয়নি বলে ভেঙে পড়িস না।
-না বাবা, এটা মনে হচ্ছে হবে। কিন্তু-
-কিন্তু কি?
-ওরা অর্ধেক বেতন কেটে নেবে।
-ও…
আর কেউ কিছু বলতে পারেনা। কারণ সকলেই জানে রাতুল ঠিক কতটা আদর্শবাদী। এই হাফ বেতন এক প্রকার ঘুষ। এটা মানতে যে তার কেমন কষ্ট হচ্ছে সে সকলেই জানে। মা নিরবতা ভেঙে বলে-
-রাতুল কচুশাকটা আর একটু নে, তুইতো পছন্দ করিস। বলেই পাতে আরও কিছুটা কচুশাক ঘন্ট দিল। চুপচাপ সকলে খেয়ে উঠে গেল।
একটু পরেই কানিজ এসে হাজির। সে দাদার কাছে জানতে চায়, এমন অন্যায় মেনে নিয়ে কেন সে চকরি করবে। নানান কথা ও যুক্তি দিয়ে রাতুল তার পিচ্চি বোনটাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। আসল কারণ সে কিছুতেই বলল না। কানিজ পড়তে চলে গেলে রাতুল হেডমাস্টারকে ফোন করল-
-হ্যালো স্যার আমি রাতুল বলছি।
-হ্যাঁ রাতুল স্যার বলেন, কী সিদ্ধান্ত নিলেন?
-স্যার আমি করব। সেক্রেটারির প্রস্তাবে আমি রাজি আছি।
-খুব ভাল করলেন আপনি। আচ্ছা তবে কাল সমস্ত পেপারস নিয়ে চলে আসেন। দুএকদিনের মধ্যে আপনার জয়নিং করিয়ে দেব।
হেড স্যার কে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা রেখে দিল। ঠিক তখনি আবার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতে লীনার নামটা ভেসে উঠল। হাতে নিয়ে রিসিভ করল-
-হ্যালো।
-কি ব্যাপার কল রিসিভ করলে না তখন?
-তখন ব্যাস্ত ছিলাম। বলো?
-কি হল কাজটার?
-কাল সাক্ষাতে বলব। এখন ভীষণ ক্লান্তি লাগছে। ঘুমাব।
-আচ্ছা রাখছি তাহলে। শুভ রাত্রি।
-শুভ রাত্রি।
ফোন রেখে দেবার পরেও কিছুতেই ঘুম আসছে না রাতুলের। জীবনে এমন পরাজয় তার আগে কখনও হয়নি। সে কখনও অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমন যে সে বাধ্য হচ্ছে আপোষ করতে। আর বিকল্প কোনো উপায় তার ছিল না। কাল সকালে উঠেই যেতে হবে।
স্কুলে যেতে হবে মনে হতেই সেক্রেটারির চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল। এমন মানুষদের জন্যই আজ সমাজটা এরকম। এদের পেটে সামান্য বিদ্যাবুদ্ধি যদি থাকত! শর্তের কথা মনে পড়তেই আতকে উঠল রাতুল। এমন ভয়ঙ্কর মানুষের বাড়িতে থাকতে হবে ভাবা যায় না। আবার চাকরিটাও তাকে করতে হবে। দেখা যাক কি হয়- মনে মনে ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।


Pingback: ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৩ – বাংলাকাল