৫০ জন মুসলিমকে বিচারবহির্ভূত মেরে ফেলা হয়েছে

৫০ জন মুসলিমকে বিচারবহির্ভূত মেরে ফেলা হয়েছে

কলকাতা :২০২৫ সাল জুড়ে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন উঠে এল। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইনের শাসন নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে চর্চা চলছে, ঠিক তখনই সামনে এল এক হাড়হিম করা পরিসংখ্যান। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যম ‘মাকতুব মিডিয়ার’ প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত এক বছরে ভারতে অন্তত ৫০ জন মুসলিম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের (Extrajudicial Killings) শিকার হয়েছেন। সবথেকে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুর মিছিলের পেছনে রাষ্ট্র প্রশাসনের  পাশাপাশি অভিযোগের তির উঠেছে হিন্দুত্ববাদী কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর দিকেও।
‘মাকতুব মিডিয়া’-র ওই প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নথিবদ্ধ হওয়া মোট ৫০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
প্রথমত, এর মধ্যে ২৩টি হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়েছে ‘স্টেট অ্যাক্টর’ বা রাষ্ট্রপ্রশাসন। পুলিশি এনকাউন্টার হেফাজতে মৃত্যু কিংবা প্রশাসনিক অভিযানের নামে বলপ্রয়োগের জেরে এই ২৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ। উত্তর ভারত সহ দেশের একাধিক রাজ্যে অপরাধ দমনের নামে যে ‘এনকাউন্টার নীতি’ বা ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ দেখা গিয়েছে, তাকেই এই মৃত্যুর জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে ওই রিপোর্ট।
দ্বিতীয়ত, বাকি ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ বা হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থীদের হাতে। গোরক্ষার নামে গণপিটুনি (Mob Lynching), ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা কিংবা নিছক বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে। রিপোর্টিতে দাবি করা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের ঘটনায় পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা দেখা গিয়েছে, অথবা অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার বিচার নয়, বরং দেশের সামাজিক স্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ চিত্র। মাকতুব মিডিয়ার রিপোর্টে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ডগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি বা ‘টার্গেটেড ভায়োলেন্স’-এর অংশ। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে ও পরে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীব্র করতে এই ধরনের ঘটনাগুলিকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
মানবাধিকার কর্মীদের একাংশ বলছেন, বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ বা মব জাস্টিসের এই প্রবণতা দেশের সংবিধান ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। কোনো ব্যক্তি অপরাধী হলেও তার বিচার পাওয়ার অধিকার সাংবিধানিক। কিন্তু পুলিশ বা উন্মত্ত জনতা যখন নিজেরাই বিচারক ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করে, তখন আইনের শাসন ভেঙে পড়তে বাধ্য।
রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে
স্বভাবতই, এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তুমুল বাদানুবাদ। বিরোধী দলগুলো এই রিপোর্টকে হাতিয়ার করে কেন্দ্র সরকারের ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর স্লোগানকে তীব্র কটাক্ষ করেছে। তাদের অভিযোগ, শাসক দলের প্রশ্রয়েই দেশে এমন অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, সংখ্যালঘুদের ওপর এই নির্যাতন আসলে সংখ্যাগুরু তোষণের রাজনীতিরই ফলশ্রুতি।
অন্যদিকে, শাসক শিবিরের তরফে এই রিপোর্টকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পাল্টা দাবি, ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য বিদেশি চক্রান্তের অংশ হিসেবে এই ধরনের নেতিবাচক খবর পরিবেশন করা হচ্ছে। মাকতুব মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ একাধিক সংগঠন।
বিতর্ক যতই থাকুক, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে ৫০ জন নাগরিকের বিচারবহির্ভূত মৃত্যু কোনো সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রাষ্ট্র যদি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি (Culture of Impunity) চলতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে। এখন দেখার, এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের ভিত্তিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা দেশের শীর্ষ আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো পদক্ষেপ করে কি না।

Facebook Comments Box
Show 2 Comments

2 Comments

Leave a Reply