পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ‘সমান্তরাল পুলিশিং’: ওড়িশায় জুয়েল শেখের খুনে রণংদেহি মেজাজে অধীর চৌধুরী

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ‘সমান্তরাল পুলিশিং’: ওড়িশায় জুয়েল শেখের খুনে রণংদেহি মেজাজে অধীর চৌধুরী

চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুরের গড়ে দীর্ঘ ২৫ বছরের আধিপত্যের অবসান ঘটেছে। প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী তৃণমূলের ইউসুফ পাঠানের কাছে ৮৫,০০০-এরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনী লড়াইয়ে হারলেও জননেতার ভূমিকা থেকে যে তিনি সরে দাঁড়াননি, তার প্রমাণ মিলল ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের এক পরিযায়ী শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায়। ওড়িশায় বাঙালি শ্রমিকদের ওপর চলা ‘অত্যাচার’ ও ‘পরিচয়-ভিত্তিক হামলা’র প্রতিবাদে ফের একবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন এই বর্ষীয়ান নেতা ।

জুয়েল শেখ হত্যাকাণ্ড ও ‘বাংলাদেশি’ তকমা ঘটনার সূত্রপাত গত ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫। ওড়িশার সম্বলপুর জেলার ধনিপালিতে মুর্শিদাবাদের সুতি (জঙ্গিপুর) এলাকার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী জুয়েল শেখ এক নৃশংস গণপিটুনির শিকার হন [২, ৩২, ৮৭, ৮৯]। অভিযোগ ওঠে, একদল উন্মত্ত জনতা তাঁকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে আধার কার্ড দেখাতে বাধ্য করে এবং প্রবল মারধর করে। যদিও স্থানীয় পুলিশ দাবি করেছে যে বিড়ি বা সিগারেট নিয়ে বচসা থেকে এই ঝামেলার সূত্রপাত, তবুও শ্রমিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে ।

সম্বলপুরে অধীরের ‘মিশন’ এই ঘটনার খবর পেয়েই গত ৪ জানুয়ারি ২০২৬, অধীর চৌধুরী সম্বলপুরে পৌঁছান। সেখানে তিনি নির্যাতিত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেন এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। অধীর বাবু অভিযোগ করেন, ওড়িশা ও হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলিতে এক ভয়ংকর ‘সমান্তরাল পুলিশিং’ (Parallel Policing) ব্যবস্থা শুরু হয়েছে ]। সেখানে সাধারণ নাগরিক বা ‘গুণ্ডা’ বাহিনী রাস্তায় পরিযায়ী শ্রমিকদের আটকে পরিচয়পত্র দাবি করছে, যা আদতে প্রশাসনের কাজ । তিনি স্পষ্ট জানান, “বাংলভাষী মানেই বাংলাদেশি নয়, এই বিভ্রান্তি দূর করা জরুরি” ।

সাংসদ পদ খোয়ানোর পরেও অধীর চৌধুরী এই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দ্বারে কড়া নেড়েছেন। তিনি রাষ্ট্রপতিকে দুই পাতার এক স্মারকলিপি জমা দিয়ে জানিয়েছেন যে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত হেনস্থা ও বেআইনিভাবে আটকে রাখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও তাঁকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে ।

তৃণমূল ও হুমায়ুন কবীরের ভূমিকা অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরেও এই ঘটনা নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে। সাসপেন্ড হওয়া তৃণমূল বিধায়ক ও জনতা উন্নয়ন পার্টির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর নিহত জুয়েলের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছেন। তবে তিনি পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার ও বিজেপি—উভয়কেই কাঠগড়ায় তুলেছেন ]।ইউসুফ পাঠান এই বিষয়ে উদাসীনতার পরিচয় পাওয়া গেছে ।এখনও পর্যন্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মন্তব্য বা অবস্থানের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

অধীর চৌধুরীর এই তৎপরতা প্রমাণ করে যে সংসদীয় রাজনীতির বাইরেও তিনি এখনও মুর্শিদাবাদ ও বাংলার শ্রমিক শ্রেণির কাছে এক বিশ্বস্ত অভিভাবক। সম্বলপুরের সোনাপল্লির শ্রমিকদের তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে কংগ্রেস তাঁদের পাশে আছে এবং প্রয়োজনে তিনি সেখানেও বড়সড় আন্দোলন শুরু করবেন । তবে প্রশাসনের উদাসীনতা ও পরিচয় নিয়ে এই সংশয় যদি না কাটে, তবে হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকবে, তা বলাই বাহুল।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply