মহারাষ্ট্রের থানে জেলার অম্বলনাথ পুরসভার নির্বাচনে এক নজিরবিহীন এবং চমকপ্রদ রাজনৈতিক সমীকরণ দেখা গেল। রাজ্যে এবং কেন্দ্রে একে অপরের প্রবল বিরোধী হিসেবে পরিচিত বিজেপি ও কংগ্রেস এখানে স্থানীয় স্তরে হাত মিলিয়েছে। মূলত মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনাকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতেই এই অপ্রত্যাশিত জোট গঠন করা হয়েছে বলে খবর। এই ঘটনা শুধু থানে জেলাতেই নয়, বরং গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
অপ্রত্যাশিত জোট ও সমীকরণ
অম্বলনাথ পুরসভার মোট ৬০টি আসনের নির্বাচনে একনাথ শিন্ডের শিবসেনা একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছিল। তারা ২৭টি আসনে জয়লাভ করে, যা ম্যাজিক ফিগার বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ৪টি আসন কম ছিল। অন্যদিকে, বিজেপি ১৪টি, কংগ্রেস ১২টি এবং অজিত পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি ৪টি আসনে জয়ী হয়। এছাড়া কয়েকজন নির্দল প্রার্থীও জয়লাভ করেন।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছিল যে, রাজ্যে মহাযুতির শরিক হিসেবে বিজেপি এবং শিন্ডের শিবসেনা একজোট হয়েই বোর্ড গঠন করবে। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণ সবাইকে অবাক করে দেয়। শিবসেনাকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে বিজেপি স্থানীয় কংগ্রেস কাউন্সিলর এবং এনসিপি (অজিত পাওয়ার গোষ্ঠী)-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘অম্বলনাথ বিকাশ আঘাড়ি’ নামে একটি নতুন জোট গঠন করে।
এই নতুন জোটের ফলে বিজেপির ১৪, কংগ্রেসের ১২, এনসিপির ৪ এবং ১ জন নির্দল কাউন্সিলরকে নিয়ে তাদের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১-এ, যা বোর্ড গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে।
এই জোটের সুবাদে পুরপ্রধান (Council President) পদের নির্বাচনেও বড় জয় পায় বিজেপি। বিজেপি প্রার্থী তেজশ্রী করঞ্জুলে পাটিল তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিবসেনার মনীষা ওয়ালেকরকে পরাজিত করে পুরপ্রধান নির্বাচিত হন। শিন্ডের খাসতালুক হিসেবে পরিচিত থানে জেলায় এবং বিশেষ করে অম্বলনাথে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারা শিবসেনার (শিন্ডে গোষ্ঠী) জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় স্তরে এই জোট গঠন করা হলেও, রাজ্য স্তরের বিজেপি এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে।
বিজেপির পক্ষ থেকে উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবিস কড়া ভাষায় এই জোটের নিন্দা করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট দল মেনে নেবে না এবং যারা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি স্থানীয় ইউনিটকে অবিলম্বে এই জোট ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কংগ্রেসও এই ঘটনাকে দলীয় শৃঙ্খলভঙ্গ হিসেবে দেখছে। দলের রাজ্য নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই অম্বলনাথের ওই ১২ জন কংগ্রেস কাউন্সিলর এবং স্থানীয় ব্লক প্রেসিডেন্টকে দল থেকে সাসপেন্ড (সাময়িক বরখাস্ত) করেছে। কংগ্রেসের বক্তব্য, দলের আদর্শবিরোধী কোনো শক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বরদাস্ত করা হবে না।
স্থানীয় নেতাদের যুক্তি
রাজ্য নেতৃত্বের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্থানীয় বিজেপি ও কংগ্রেস নেতারা এই জোটের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বিগত দিনে অম্বলনাথ পুরসভায় শিবসেনার একাধিপত্যের কারণে দুর্নীতি ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেই ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটাতেই এবং শহরের উন্নয়নের স্বার্থে মতাদর্শগত পার্থক্য ভুলে তাঁরা একজোট হয়েছেন।
বিজেপির স্থানীয় এক নেতার কথায়, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল অম্বলনাথের মানুষকে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন উপহার দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই আমরা রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
সামনেই বুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (BMC) সহ রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরনিগমের নির্বাচন। তার ঠিক আগেই অম্বলনাথের এই ঘটনা মহাযুতির (বিজেপি-শিবসেনা-এনসিপি) অভ্যন্তরীণ ফাটলকে প্রকাশ্যে এনেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শিন্ডের গড়ে বিজেপির এই ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ আগামী দিনে জোটের সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আপাতত অম্বলনাথের এই ‘মহা-নাটক’ মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে চিরশত্রুরাও ক্ষমতার স্বার্থে এক ছাতার তলায় আসতে দ্বিধা করছে না।
