নয়াদিল্লি, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ — ভারতের গণতন্ত্রে স্বাধীন সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আজ দিল্লি হাইকোর্ট একটি সাহসী রায় দিয়েছে। বিচারপতি দীনেশ মেহতা ও বিনোদ কুমারের ডিভিশন বেঞ্চ ২০১৬ সালে এনডিটিভি প্রতিষ্ঠাতা ড. প্রণয় রায় এবং রাধিকা রায়ের বিরুদ্ধে জারি করা আয়কর পুনর্মূল্যায়ন নোটিশগুলি বাতিল করে দিয়েছে। আদালত এই পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’, ‘অধিকারবহির্ভূত’ এবং ‘হয়রানিমূলক’ বলে অভিহিত করেছে। কর বিভাগকে দুজনের প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা করে মোট ২ লক্ষ টাকা জরিমানা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, “এই ধরনের কোনও জরিমানা যথেষ্ট নয়, কিন্তু আমরা এই মামলাগুলিকে কোনও জরিমানা ছাড়া ছেড়ে দিতে পারি না।”এই রায়ের পটভূমি গভীর।
২০১৬ সালের ৩১ মার্চ আয়কর বিভাগ ২০০৯-১০ অর্থবছরের আয় পুনর্মূল্যায়নের জন্য নোটিশ জারি করেছিল। অভিযোগ ছিল, এনডিটিভির প্রমোটার সংস্থা আরআরপিআর হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রণয়-রাধিকা রায় ‘সুদমুক্ত’ ঋণ নিয়েছিলেন, যা আয় হিসেবে গণ্য করা উচিত। কিন্তু ২০১১-১৩ সালে একই বিষয়ে প্রথম পুনর্মূল্যায়ন হয়েছিল, যাতে কোনও অতিরিক্ত কর ধার্য করা হয়নি। দ্বিতীয়বার একই বিষয়ে নোটিশ জারি করা আদালতের মতে অবৈধ এবং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন। আদালত বলেছে, “একই লেনদেন নিয়ে বারবার পুনর্মূল্যায়ন অযৌক্তিক এবং অ্যাসেসির জন্য অপ্রয়োজনীয় হয়রানি সৃষ্টি করে। এতে অনিশ্চয়তা ও অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হয়।”এই রায় শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিকও। এনডিটিভি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতীক ছিল। ১৯৮৮ সালে প্রণয় রায় ও রাধিকা রায় এই চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকেই এটি সরকারি দূরদর্শনের বাইরে স্বাধীন সংবাদ পরিবেশন করে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এনডিটিভি সরকারের সমালোচনায় অগ্রণী ভূমিকা নেয়।
ভারতের অন্যান্য মূলধারার টিভি চ্যানেলগুলি যখন ‘গোদি মিডিয়া’ হয়ে উঠছে, তখন NDTV সরকারের ভুল-ত্রুটি, নীতিগত ব্যর্থতা, সাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক অসমতা, কৃষক আন্দোলন, সিএএ-এনআরসি প্রতিবাদ—সবকিছু নির্ভীকভাবে প্রকাশ করে। এই সাহসের জন্য চ্যানেলটি বারবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।২০১৭ সালে সিবিআই এনডিটিভির প্রতিষ্ঠাতাদের বাড়িতে হানা দেয়। অভিযোগ ছিল আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের ঋণ নিয়ে জালিয়াতি। কিন্তু ২০২৪ সালে সিবিআই ক্লোজার রিপোর্ট জমা দেয়, কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে আয়কর বিভাগের এই বারবার নোটিশ জারি করা অনেকের কাছে রাজনৈতিক চাপের অংশ বলে মনে হয়েছে।
এনডিটিভি সরকারের সমালোচনা করার জন্য যেন ‘শাস্তি’ পেয়েছে।এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক রবিশ কুমারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এনডিটিভি হিন্দির প্রধান মুখ রবিশ কুমার সরকারের সমালোচনায় অগ্রণী ছিলেন। তিনি ‘প্রাইম টাইম’ অনুষ্ঠানে সরকারের ভুল তুলে ধরতেন, সাম্প্রদায়িকতা, কৃষক আন্দোলন, বেকারত্ব, মিডিয়ার স্বাধীনতা—সব বিষয়ে নির্ভীক প্রশ্ন তুলতেন। এর জন্য তিনি মৃত্যু হুমকি পেয়েছেন অগণিতবার। ২০১৮ সাল থেকে তার ফোনে হুমকির কল ও মেসেজের ঝড়। কেউ বলেছে, “তোমাকে পাকিস্তান পর্যন্ত তাড়া করে গুলি করব”, কেউ তার পরিবারের নারী সদস্যদের প্রতি যৌন হিংসার হুমকি দিয়েছে। রবিশ বলেছেন, “এই হুমকিগুলি সংগঠিত, রাজনৈতিক মদতপুষ্ট।” তিনি রাস্তায় ধাক্কা খেয়েছেন, তার বাড়ির ঠিকানা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই চাপের মধ্যেও তিনি লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।
২০২২ সালে গৌতম আদানি গ্রুপ এনডিটিভি অধিগ্রহণ করলে রবিশ কুমার পদত্যাগ করেন। এখন তিনি ইউটিউবে স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করছেন।এনডিটিভির এই যাত্রা ভারতীয় গণমাধ্যমের সংকটের প্রতীক। ২০১৪ সালের পর অনেক চ্যানেল সরকারের সমর্থক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এনডিটিভি শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল। আদালতের আজকের রায় এই স্বাধীনতার জয়। এটি শুধু প্রণয়-রাধিকা রায়ের জয় নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতার জয়। আদালত বলেছে, “এই ধরনের পুনর্মূল্যায়ন সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে।” এই রায় ভবিষ্যতে অন্যান্য সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠানের জন্যও আশার আলো।ভারতের গণতন্ত্রে স্বাধীন মিডিয়া ছাড়া সত্যের পথ অন্ধকার। আজকের রায় সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ।

