হিমাচল প্রদেশের একটি সরকারি কলেজে ১৯ বছর বয়সী এক দলিত ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও ছাত্র সংগঠন। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের একজন অধ্যাপক এবং কয়েকজন সহপাঠীর দ্বারা দিনের পর দিন র্যাগিং ও জাতিগত বিদ্বেষপ্রসূত হেনস্তার শিকার হয়ে ওই ছাত্রী চরম মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিহত ছাত্রীটি হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালার ‘গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ’-এর প্রথমার্ধের ছাত্রী ছিলেন। গত ২৬ ডিসেম্বর লুধিয়ানার দয়ানন্দ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (DMC) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরই ক্যাম্পাসে দলিত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং জাতিগত বৈষম্যের বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
মৃত ছাত্রীর পরিবার এবং মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, কলেজে ভর্তির পর থেকেই ওই ছাত্রীকে পদ্ধতিগতভাবে হেনস্তা করা হচ্ছিল। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক এবং তিনজন সিনিয়র শিক্ষার্থী মিলে তাঁকে র্যাগিং করতেন। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে জাতিগত মন্তব্য এবং যৌন হেনস্তারও অভিযোগ আনা হয়েছে।
ছাত্রীর বাবা পুলিশকে জানিয়েছেন, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে অভিযুক্তরা তাঁর মেয়ের ওপর মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছিল। এই লাগাতার নির্যাতনের ফলে তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে তাঁকে একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পর অবশেষে লুধিয়ানার হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিমাচল প্রদেশ তো বটেই, জাতীয় স্তরেও বিভিন্ন অধিকার রক্ষা সংগঠন এবং ছাত্র সংগঠনগুলো (যেমন—স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া বা SFI এবং আম্বেদকরবাদী সংগঠনসমূহ) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এটি নিছক একটি মৃত্যু বা আত্মহত্যার ঘটনা নয়, বরং এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলিত শিক্ষার্থীদের ওপর চলমান কাঠামোগত বৈষম্যের একটি নৃশংস উদাহরণ।
মানবাধিকার কর্মীরা দাবি করেছেন:
১. অবিলম্বে অভিযুক্ত অধ্যাপক এবং শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
২. ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলিত ও প্রান্তিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই অভিযুক্তরা এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। ছাত্রীর মৃত্যুর পর প্রশাসনের টনক নড়লেও, অধিকার কর্মীরা মনে করছেন যে প্রভাবশালী অভিযুক্তদের বাঁচাতে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। তাই তাঁরা লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ
প্রবল জনরোষ এবং অধিকার সংগঠনগুলোর চাপের মুখে পুলিশ ইতিমধ্যে অভিযুক্ত অধ্যাপক এবং তিন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং এসসি/এসটি (SC/ST) নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করেছে। ধর্মশালা পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে। অভিযুক্ত অধ্যাপক অশোক কুমারকে ইতিমধ্যেই সাসপেন্ড (সাময়িক বরখাস্ত) করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনে এমন মর্মান্তিক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং দলিত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাদের আন্দোলন আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে।
