আগরতলায় হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা মুসলিম রিকশাচালককে মারধর, বালিতে আংশিক পুঁতে শরীরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ

আগরতলায় হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা মুসলিম রিকশাচালককে মারধর, বালিতে আংশিক পুঁতে শরীরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় এক মুসলিম রিকশাচালককে হত্যার উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, একদল অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত ওই রিকশাচালকের পথ আটকে তাকে বেধড়ক প্রহার করে, বালির নিচে আংশিক পুঁতে ফেলে এবং শরীরে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা চালায়। গত বৃহস্পতিবার এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে।
হামলার শিকার ওই ব্যক্তির নাম দিদার হোসেন। পেশায় রিকশাচালক দিদার আগরতলার অভয়নগর এলাকার বাসিন্দা। মকতুব মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১লা জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ আগরতলার গোর্খাবস্তির কাছে অবস্থিত গাঙ্গাইল নিবেদিতা ক্লাব এলাকায় এই হামলার ঘটনাটি ঘটে।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জানা যায়, চার থেকে পাঁচজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি দিদারের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। প্রাণে বেঁচে ফেরার পর দিদার হোসেন দুর্গা চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়িতে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। নিজের অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন যে, ঘটনার সময় চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত হঠাৎ তার পথ আটকে দাঁড়ায় এবং কোনো কারণ ছাড়াই তাকে নৃশংসভাবে মারধর শুরু করে।
মকতুব মিডিয়ার হাতে আসা এফআইআর (FIR)-এর নথিতে দিদার হোসেনের জবানবন্দি অনুযায়ী লেখা হয়েছে, “পরবর্তীতে তারা আমাকে জোরপূর্বক একটি বালির স্তূপের মধ্যে ঠেলে দেয় এবং আমাকে হত্যা করার স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।”
দিদার আরও জানান, এই বর্বরোচিত হামলায় তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। দুর্বৃত্তরা যখন তাকে হত্যার আয়োজন করছিল, তখন তিনি বাঁচার জন্য চিৎকার ও চেঁচামেচি শুরু করেন। তার আর্তনাদ শুনে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় এবং তিনি কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে যান। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব উর রহমান মকতুব মিডিয়াকে জানান, দিদার হোসেনকে মূলত তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হাবিব উর রহমানের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা প্রথমে দিদারকে তার নাম জিজ্ঞেস করে। নাম জানার পর তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকে।
হাবিব উর রহমান আরও যোগ করেন, “দিদার যখন হামলাকারীদের কাছে জানতে চান যে তার অপরাধ কী, তখন তারা সীমান্তের ওপারে অর্থাৎ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনার কথা উল্লেখ করে।”
পুলিশে দেওয়া অভিযোগে দিদার হোসেন এই ঘটনাকে একটি “জঘন্য, গুরুতর এবং জামিন অযোগ্য অপরাধ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর একাধিক ধারায় মামলা রুজু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০৯ ধারা (খুনের চেষ্টা), ১১৫(২) ধারা (গুরুতর আঘাত করা) এবং ৩২৬ ধারা (অগ্নিসংযোগ বা আগুনের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা)।
এই নৃশংস ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে আগরতলায় তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়। ঘটনার প্রতিবাদে এবং অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবিতে বহু সাধারণ মানুষ একটি প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেন। এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন এবং তিপ্রা মোথা (TIPRA Motha)-র নেতা শাহ আলম।
প্রতিবাদ চলাকালীন মকতুব মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার সময় তিপ্রা মোথা নেতা শাহ আলম পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “অভিযোগ দায়ের করা ছাড়া পুলিশ এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া অন্যান্য হামলার ঘটনাতেও আমরা একই ধরণের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করেছি।”
এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ অভিযুক্তদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে জনমনে ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply