বিহারের কাটিহার জেলায় এক মুসলিম শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি‘ আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই শ্রমিককে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জোরপূর্বক আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালায় বলে জানা গেছে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মকতুব মিডিয়ার প্রতিবেদনে এই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ওই শ্রমিকের নাম আব্বাস। তিনি একজন দিনমজুর এবং স্থানীয়ভাবে শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ঘটনার দিন তিনি তার নিত্যদিনের কাজের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। সেই সময় কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তার পথ আটকায়। অভিযোগ, পথিমধ্যে তাকে থামিয়ে তার নাম ও পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। যখন তিনি নিজের নাম প্রকাশ করেন, তখন অভিযুক্তরা তাকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, আব্বাস বারবার নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দাবি করেন এবং তিনি যে কাজের সন্ধানে সেখানে গিয়েছেন তা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু অভিযুক্তরা তার কোনো কথায় কর্ণপাত করেনি। তারা তাকে ঘিরে ধরে এবং চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাকে মানসিকভাবেও হেনস্থা করা হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ভীতসন্ত্রস্ত ওই শ্রমিক হাত জোড় করে অভিযুক্তদের কাছে নিষ্কৃতি চাইছেন, কিন্তু আক্রমণকারীরা তাকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, অভিযুক্তরা আব্বাসকে জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ভিডিওতে আক্রমণকারীদের বলতে শোনা যায় যে, ওই শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে। যদিও আব্বাস বারবার কাকুতি-মিনতি করে বলছিলেন যে তিনি স্থানীয় বাসিন্দা এবং শ্রমিকের কাজ করেন, তবুও তাকে নিগ্রহ করা থামানো হয়নি। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটিজেনদের একাংশ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি তুলেছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে বিষয়টি।
পুলিশ ও প্রশাসনের পদক্ষেপ
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কাটিহার জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করছেন এবং ভিডিওতে যাদের দেখা গেছে তাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা গুরুতর অপরাধ। অভিযুক্তদের খুঁজে বের করতে পুলিশি অভিযান চলছে এবং শীঘ্রই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে স্থানীয় মানুষকে শান্ত থাকার এবং কোনো গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যগুলিতে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ মাঝেমধ্যেই খবরের শিরোনামে উঠে আসছে। মানবাধিকার কর্মী ও সচেতন মহলের মতে, পরিচয় বা ধর্মের ভিত্তিতে কোনো শ্রমজীবী মানুষকে এভাবে আক্রমণ করা বা সন্দেহভাজন হিসেবে দেগে দেওয়া একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। কাটিহারের এই ঘটনাটি আবারও সেই উদ্বেগের বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ভুক্তভোগী আব্বাসের পরিবার এই ঘটনায় অত্যন্ত আতঙ্কিত। তারা প্রশাসনের কাছে সঠিক বিচার এবং নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন সবার নজর।
Posted inদেশ
বিহারে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে মুসলিম শ্রমিককে নির্মম মারধর: ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য

Facebook Comments Box
