বালেশ্বর,ওড়িশা: ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬-এ ওড়িশার বালেশ্বর জেলায় একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। পিকআপ ভ্যানের হেলপার শেখ মকারন্দ মোহাম্মদ (বয়স প্রায় ৩৩-৩৫ বছর) নামে এক মুসলিম যুবককে গো-রক্ষকদের একটি দল নির্মমভাবে প্রহার করে হত্যা করেছে। আক্রমণকারীরা তাকে পাইপ, ছুরি এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে, এবং ভিডিওতে দেখা যায় যে তাকে জোর করে “জয় শ্রী রাম” স্লোগান দিতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং গরুকে “মা” বলতে বলা হচ্ছে। আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। জনপ্রিয় ফ্যাক্ট-চেকার মোহাম্মদ জুবায়র তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে এই ঘটনা নিয়ে পোস্ট করেন। তিনি লেখেন: “আরও একটি মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা রাইট উইং গুন্ডাদের দ্বারা। বালাসোর, ওড়িশায় ভ্যান হেলপার শেখ মোহাম্মদকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। তার ভাইয়ের অভিযোগ অনুসারে, তাকে জিমের কাছে রাস্তায় আটকে দেওয়া হয় এবং বাপু, পবন, পিন্টু, নেপালি ও চিনু তেলেঙ্গা নামে আক্রমণকারীরা তাকে আক্রমণ করে।” জুবায়রের এই পোস্টে ভিডিও সংযুক্ত ছিল, যা দেখে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই ধরনের মব সহিংসতা এখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এটি নিয়ে আর কেউ বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ হয় না।
বালেশ্বর পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে এবং মব লিঞ্চিংয়ের অভিযোগে মামলা রুজু করেছে। প্রাথমিকভাবে গো-হত্যা প্রতিরোধ আইনের অধীনে ড্রাইভার ও গাড়ীর মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হলেও, পরে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র রিপোর্ট অনুসারে, পুলিশ ভিডিও দেখে আক্রমণকারীদের শনাক্ত করছে। তবে কোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বা মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক নিন্দা বা বিবৃতি আসেনি, যা সমালোচনার মুখে পড়েছে।রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দলগুলি এই ঘটনাকে হিন্দুত্ববাদী সহিংসতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী নেতারা দাবি করেছেন যে এটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলিমদের নিরাপত্তাহীনতার প্রমাণ। তবে বিজু জনতা দল (বিজেডি), যারা ওড়িশায় প্রধান বিরোধী, এই নির্দিষ্ট ঘটনায় এখনও কোনো সরাসরি বিবৃতি দেয়নি (যদিও তারা অতীতে অন্যান্য সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে)। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে অভিযোগ করেছেন যে বিরোধী দলগুলির নীরবতা এই সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করছে।
এই ঘটনা ভারতে ২০১৪ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদী গো-রক্ষকদের দ্বারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলা সহিংসতার একটি ধারাবাহিক অংশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪৪ জন (যার মধ্যে ৩৬ জন মুসলিম) গো-সংক্রান্ত লিঞ্চিংয়ে নিহত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে:
২০১৫: দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাককে গরুর মাংস রাখার অভিযোগে পিটিয়ে মারা হয়।
২০১৭: রাজস্থানে পেহলু খানকে গরু কেনার সময় লিঞ্চ করা হয়।
২০১৭: ট্রেনে জুনাইদ খানকে “বিফ ইটার” বলে ছুরিকাঘাত করে হত্যা।
২০১৯: ঝাড়খণ্ডে তাবরেজ আনসারিকে গাছে বেঁধে “জয় শ্রী রাম” বলতে বাধ্য করে পিটিয়ে মারা হয়।
২০২৩: নাসির ও জুনাইদকে গরু চুরির অভিযোগে পুড়িয়ে মারা হয়।
এই সহিংসতা প্রায়শই হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যেমন বজরং দল বা গৌ-রক্ষা দলের সঙ্গে যুক্ত। রয়টার্স রিপোর্ট অনুসারে, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ২৮ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৪ জন মুসলিম, এবং ৯৭% ঘটনা ২০১৪-এর পর ঘটেছে। এই ধরনের লিঞ্চিং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এবং সমাজে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ ঘটিয়েছে।বালেশ্বর এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। সমাজ, রাজনীতি এবং প্রশাসনকে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে আর কোনো নিরীহ মানুষ এভাবে প্রাণ হারায় না। এই ধরনের ঘটনা দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে ধরে।

Pingback: ওড়িশায় দরিদ্র মুসলিম বিক্রেতার উপর হামলা: সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা – বাংলাকাল