নয়াদিল্লি ২১ জানুয়ারী : ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি তাদের নতুন জাতীয় সভাপতি হিসেবে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হল বিহারের নেতা শ্রী নীতিন নবীনকে। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি বিজেপির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ জাতীয় সভাপতি এবং একই সঙ্গে বিহার থেকে আসা প্রথম ব্যক্তি যিনি এই সর্বোচ্চ সাংগঠনিক দায়িত্ব পেলেন। জে.পি. নাড্ডার পর তিনি দলের দ্বাদশ জাতীয় সভাপতি। দলীয় নেতৃত্ব এই নির্বাচনকে “যুব শক্তি, সংগঠন দক্ষতা ও ভবিষ্যতমুখী রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে তুলে ধরলেও রাজনৈতিক মহলে এটিকে পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রভাব বিস্তারের একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ বলেও দেখা হচ্ছে।
১৯ জানুয়ারি মনোনয়ন পর্বে নীতিন নবীনের পক্ষে মোট ৩৭টি মনোনয়ন জমা পড়ে। তাতে স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গাডকারী এবং বিদায়ী সভাপতি জে.পি. নাড্ডা-সহ শীর্ষ নেতৃত্ব। অন্য কোনো প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ২০ জানুয়ারি দিল্লির বিজেপি সদর দপ্তরে আয়োজিত সাংগঠনিক বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নতুন সভাপতির ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লেখেন, “নীতিন নবীন আমার বস, আমি দলের একজন সাধারণ কর্মী। তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ গড়বে।” এই মন্তব্যকে অনেকেই প্রতীকী বিনয় এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের বার্তা হিসেবে দেখছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লেখেন, “তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিজেপিকে ২০২৯ সালের জন্য আরও শক্তিশালী করবে।” প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, “নীতিন নবীন বিজেপির যুব শক্তির প্রতীক। তিনি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধন।” বিদায়ী সভাপতি জে.পি. নাড্ডা এক্স-এ লেখেন, “আমি নিশ্চিত, তাঁর নেতৃত্বে দল নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে এবং সংগঠন আরও মজবুত হবে।” নীতিন গডকড়ি তাঁকে “গ্রাসরুট লিডার” বলে উল্লেখ করেন, যিনি বুথ স্তরের সংগঠন সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখেন।
নীতিন নবীন বিহারের বাঁকিপুর (পাটনা) কেন্দ্র থেকে পাঁচবারের বিধায়ক। তিনি বিহার সরকারের প্রাক্তন পিডব্লিউডি মন্ত্রী ছিলেন এবং রাজ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ২০০৬ সালে বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহার মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন বিজেপির প্রবীণ নেতা এবং বিহারের চারবারের বিধায়ক। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থাকলেও দলীয় অন্দরমহলে তিনি একজন “হার্ড ওয়ার্কার সংগঠক” হিসেবেই বেশি পরিচিত।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে বিজেপির জাতীয় ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে জাতীয় সভাপতির পদে তাঁর উত্থানের পূর্বাভাস ছিল। বিজেপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জাতীয় সভাপতি হতে হলে অন্তত ১৫ বছর প্রাথমিক সদস্য এবং চার মেয়াদ সক্রিয় সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি প্রার্থীকে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ভারতীয় নাগরিক হতে হয় এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া চলবে না। নীতিন নবীন এই সব শর্ত পূরণ করেন।
বিহার থেকে প্রথমবার বিজেপির জাতীয় সভাপতি হওয়া নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। দলীয়ভাবে কোনো রাজ্য কোটা না থাকলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বড় লক্ষ্য রয়েছে—পূর্ব ভারতের সাংগঠনিক বিস্তার, বিহার ও ঝাড়খণ্ডে বিজেপির ভিত আরও মজবুত করা এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা। বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা-পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের হলেও, সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় সেখান থেকে সভাপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই কম বলে মনে করা হচ্ছিল।
নীতিন নবীনের শক্তির দিক হিসেবে তাঁর তরুণ বয়স, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সংগঠনী দক্ষতা এবং প্রযুক্তি-সচেতন ভাবমূর্তির কথা তুলে ধরছে বিজেপি। দলীয় সূত্রে দাবি, তিনি বুথ স্তরের সংগঠন মজবুত করতে বিশেষভাবে আগ্রহী এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও ডেটা অ্যানালিটিক্সকে রাজনৈতিক কৌশলে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে চান।
তবে সমালোচনাও কম নয়। বিরোধীদের অভিযোগ, তিনি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তপ্রবণ এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল নন। বিহারে তাঁর মন্ত্রীত্বকালে কিছু নাগরিক সংগঠন প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও প্রতিবাদ দমনের অভিযোগ তুলেছিল। এই ধরনের অভিযোগকে বিজেপি “রাজনৈতিক অপপ্রচার” বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং বলেছে, তাঁর প্রশাসনিক রেকর্ড ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নীতিন নবীনের সভাপতিত্ব বিজেপির প্রজন্ম পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তিনি কি সত্যিই যুব নেতৃত্বের নতুন মুখ হয়ে উঠবেন, নাকি এটি ২০২৯ সালের আগে একটি কৌশলগত বাজি—তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বিহার থেকে দিল্লির শীর্ষে পৌঁছে নীতিন নবীন এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখ।
