৫০ জনের মধ্যে ৪৭ জন মুসলিম: ভর্তি তালিকা ঘিরে বিতর্ক, চাপ ও অনুমতি প্রত্যাহার—শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী মেডিক্যাল কলেজের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট

৫০ জনের মধ্যে ৪৭ জন মুসলিম: ভর্তি তালিকা ঘিরে বিতর্ক, চাপ ও অনুমতি প্রত্যাহার—শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী মেডিক্যাল কলেজের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট

মেধাভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পড়ুয়াদের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক ও বিক্ষোভের মধ্যেই জম্মু ও কাশ্মীরের একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সের অনুমতি প্রত্যাহার করে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন। ঘটনাটি আবারও প্রশ্ন তুলছে—উচ্চশিক্ষায় মেধা কি সাম্প্রদায়িক চাপের মুখে টিকে থাকতে পারছে

জম্মু ও কাশ্মীরের রেয়াসি জেলার কেকরিয়ালে অবস্থিত শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল এক্সেলেন্স (SMVDIME)—একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলেজটি ৫০টি এমবিবিএস আসনের জন্য অনুমোদন পায়। অঞ্চলে চিকিৎসা শিক্ষার পরিকাঠামো জোরদার করার লক্ষ্যে এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম ব্যাচের ভর্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই কলেজটি এমন এক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, যেখানে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে ওঠে শিক্ষার মান নয়, বরং ভর্তি হওয়া পড়ুয়াদের ধর্মীয় পরিচয়।

ভর্তি তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, ৫০ জন পড়ুয়ার মধ্যে ৪৭ জন মুসলিম, একজন শিখ এবং মাত্র দু’জন হিন্দু। ভর্তি প্রক্রিয়াটি জাতীয় যোগ্যতা-সহ প্রবেশিকা পরীক্ষা (NEET)-এর মেধা তালিকা ও বিদ্যমান নিয়ম অনুসারেই সম্পন্ন হয়েছিল। তবুও এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—হিন্দু তীর্থস্থানের নামে একটি কলেজে মুসলিম পড়ুয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এই প্রশ্ন একটি প্রশাসনিক ইস্যু ছাড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিতর্কে পরিণত হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই গড়ে ওঠে ‘শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী সংগ্রাম সমিতি’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির দাবি ছিল, কলেজের ভর্তি তালিকা হিন্দুদের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং এই মেডিক্যাল কলেজে মুসলিম পড়ুয়াদের ভর্তি হওয়া উচিত নয়। তাদের বক্তব্যে বলা হয়, একটি ধর্মীয় তীর্থস্থানের নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজে কেবল হিন্দু শিক্ষার্থীদেরই পড়ার অধিকার থাকা উচিত। এই দাবিকে কেন্দ্র করে জম্মু শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়, সিভিল সেক্রেটারিয়েটের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি হয় এবং কলেজ বন্ধের দাবিও ওঠে। কিছু সংগঠনের তরফে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই হস্তক্ষেপ করে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (NMC)। কমিশনের তরফে কলেজে একটি আকস্মিক পরিদর্শন চালানো হয়। পরিদর্শনের পর জানানো হয়, কলেজে শিক্ষাদানকারী কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, টিউটর ও সিনিয়র রেসিডেন্টের সংখ্যা নির্ধারিত মানদণ্ডের নিচে, রোগীর উপস্থিতি কম এবং একাধিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য এমবিবিএস কোর্স চালানোর অনুমতি প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে এই সিদ্ধান্তের সময়কাল ও প্রেক্ষাপট নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। কারণ, যেসব ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলি কলেজকে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেওয়ার সময়ও বিদ্যমান ছিল কি না, তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই। সমালোচকদের মতে, ভর্তি তালিকা প্রকাশের পর ধারাবাহিক চাপ ও বিক্ষোভ না হলে এই ‘সারপ্রাইজ’ পরিদর্শন আদৌ হতো কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। ভর্তি শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনুমতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই পদক্ষেপকে নিছক প্রশাসনিক বলে মানতে নারাজ অনেকেই।

সরকারি ভাবে জানানো হয়েছে, এই কলেজে ভর্তি হওয়া পড়ুয়াদের অন্য সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অতিরিক্ত আসনের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হবে এবং কোনও শিক্ষার্থী তাদের আসন হারাবে না। তবুও এই ঘটনা ভারতের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি প্রত্যাহারের বিষয় নয়; এটি সেই বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে মেধাভিত্তিক ভর্তি প্রক্রিয়া পড়ুয়াদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক চাপের মুখে পড়ছে, এবং সেই চাপের মধ্যেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।


Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply