ভারতের ওড়িশা রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাঙালি মুসলিম অভিবাসী শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ভুবনেশ্বর শহরে এমনই একটি নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, যা সমাজে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দুজন বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম শ্রমিককে স্থানীয় লোকজন গরুর মাংসের বিরিয়ানি খাওয়ার অভিযোগে প্রচণ্ড মারধর করে এবং পরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ভুক্তভোগীদের মুখ রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা গেছে, এবং ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খাবারের প্যাকেটগুলি হামলার কারণকে নির্দেশ করে। জয়দেব নিউজের একটি ভিডিওতে আহত শ্রমিকের সাক্ষাৎকার, পুলিশের উপস্থিতি এবং অ্যাম্বুলেন্সের দৃশ্য ধরা পড়েছে। এই ঘটনা ওড়িশায় অভিবাসীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতার একটি উদাহরণ।
এই ঘটনার খবর প্রথমে প্রকাশ্যে আনেন ওড়িশার কংগ্রেস নেতা ও সাংবাদিক অমিয় পাণ্ডব (@AmiyaPandav)। ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে লেখেন, “Another Attack on Muslim in Odisha!! Two Bengali Muslim Migrant Workers were beaten brutally and handed over to Police on the allegation of taking beef biryani in Bhubaneswar, Capital city of Odisha!” তাঁর পোস্টে ভিডিও সংযুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকার ও সাংবাদিকদের ট্যাগ করা হয়। এটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অমিয় পাণ্ডবের এই পোস্টের মাধ্যমে ঘটনাটি জাতীয় স্তরে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।এই ঘটনা একক নয়, বরং ২০২৫ সালের শেষ থেকে ওড়িশায় অভিবাসী শ্রমিকদের উপর হামলার একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সাম্বলপুরে একজন বাঙালি মুসলিম শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে লিঞ্চ করা হয়। আরেকটি ঘটনায় বালাসোরে রেলস্টেশনে বাঙালি শ্রমিকদের ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ধেনকানালে একজন খ্রিস্টান পাস্টরকে গরুর গোবর খাওয়ানো এবং জোর করে জয় শ্রী রাম বলানো হয়।
এছাড়া হুগলির একজন মুসলিম কম্বল বিক্রেতাকে আধার কার্ড দেখাতে বাধ্য করে মারধর করা হয়। এসব ঘটনায় বজরং দল, বিজেপি সমর্থক ও স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।ওড়িশায় গরুর মাংস নিষিদ্ধ হলেও রাজ্যের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে গরু বলি ও গরুর মাংস খাওয়ার প্রথা প্রচলিত।
নিয়ামগিরির ডোঙ্গরিয়া কন্ধ, করাপুট-গঞ্জামের সানা পরজা প্রভৃতি আদিবাসী গোষ্ঠী এই প্রথা পালন করে। কিন্তু অভিবাসী মুসলিম শ্রমিকদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ না করে তাদের লক্ষ্য করে সহিংসতা চালানো হচ্ছে। এতে বোঝা যায় যে, এটি শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং জাতিগত ও অভিবাসন-বিরোধী উগ্রবাদের ফল।সমাজে এই ঘটনাগুলির প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। বাঙালি মুসলিম শ্রমিকরা ভয়ে কাজ ছেড়ে পালাচ্ছেন, অনেকে চাকরি হারাচ্ছেন। ওড়িশার অর্থনীতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের অবদান উল্লেখযোগ্য হলেও এই সহিংসতা তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়ছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে অসুরক্ষার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই ঘটনাগুলির নিন্দা করেছে এবং পুলিশের পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছে।এই ধরনের ঘটনা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রশাসনকে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে অভিবাসী শ্রমিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন। সমাজে সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় এই সহিংসতার চক্র আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশের সামাজিক ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Pingback: ওড়িশায় বাঙালি মুসলিম বিক্রেতার উপর হামলা: একটি ঘৃণামূলক অপরাধের ধারাবাহিকতা – বাংলাকাল
Pingback: ওড়িশায় দরিদ্র মুসলিম বিক্রেতার উপর হামলা: সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা – বাংলাকাল