ওড়িশা :ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস (২৬ জানুয়ারি) একটি জাতীয় উৎসব, যা সংবিধানের প্রবর্তন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক। কিন্তু ২০২৬ সালের এই দিনে ওড়িশার কোরাপুট জেলায় একটি অভূতপূর্ব নির্দেশ জারি হয়েছে, যা সারা দেশে বিতর্কের ঝড় তুলেছে। জেলা কালেক্টর ও জেলাশাসক মনোজ সত্যবান মহাজন (Manoj Satyawan Mahajan) ২৪ জানুয়ারি একটি আদেশ জারি করে ২৬ জানুয়ারি মাংস, মুরগি, মাছ, ডিম এবং অন্যান্য সব আমিষ খাবারের বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। এই নির্দেশ তহসিলদার, ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার (বিডিও) এবং পৌরসভার কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আদেশে কোনো সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। শুধুমাত্র বলা হয়েছে যে এটি প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে। এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন—প্রজাতন্ত্র দিবসের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের কী সম্পর্ক? এটি কি ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়? আবার কেউ কেউ এটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রচেষ্টা বলে সমর্থন করেছেন।
ওড়িশায় আমিষ খাদ্যের প্রচলন খুবই বেশি। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5) অনুসারে, ওড়িশার মাত্র ২.৬৫% মানুষ নিরামিষভোজী। বাকি প্রায় ৯৭% মানুষ নিয়মিত আমিষ খান। কোরাপুটের মতো আদিবাসী অধ্যুষিত জেলায় মাছ-মাংস দৈনন্দিন খাদ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী এবং সাধারণ মানুষের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে বলছেন, এটি শুধুমাত্র একদিনের ব্যাপার হলেও, এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ভারতে নতুন নয়। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে জাতীয় দিবস বা উৎসবে আমিষ বিক্রি নিষিদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত এবং অন্যান্য রাজ্যের কয়েকটি পৌরসভা মাংস-মাছ বিক্রি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল। এসব নির্দেশ প্রায়শই ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কারণে জারি করা হয়, যা বিরোধী দলগুলির তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। বিরোধীরা বলেন, এটি খাদ্য স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত পছন্দের উপর আক্রমণ।
কোরাপুটের এই ঘটনা দেশের খাদ্য বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বের প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। ভারত একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশ, যেখানে নিরামিষ এবং আমিষ উভয়ই সমানভাবে সম্মানিত। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একদলের খাদ্যাভ্যাসকে অন্যদের উপর চাপিয়ে দেওয়া কি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই নির্দেশ কি শুধুমাত্র প্রতীকী, নাকি এর পিছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?
সামাজিক মাধ্যমে অনেকে এই নির্দেশকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, প্রজাতন্ত্র দিবসে সকলের সমান অধিকার উদযাপন করা উচিত, খাদ্য নিয়ে বিভেদ সৃষ্টি নয়। আবার কিছু লোক এটিকে ‘হিন্দু সংস্কৃতি রক্ষা’র অংশ বলে দেখছেন।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলি সকলের অনুভূতি ও অধিকারকে সম্মান করতে হবে। খাদ্যাভ্যাস ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, এবং এতে হস্তক্ষেপ না করে সকলের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখাই উচিত।

