সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি জানালেন RSS নেতা, পাল্টা আক্রমণ কংগ্রেসের

সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ বাদ দেওয়ার দাবি জানালেন RSS নেতা, পাল্টা আক্রমণ কংগ্রেসের

দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ (Secular) ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ (Socialist) শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার দাবি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, এই শব্দগুলি ১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় “জোর করে” সংযোজিত হয়েছিল।

অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ড. বি. আর. আম্বেদকর আন্তর্জাতিক কেন্দ্র-এ, যেখানে সংস্কৃতি মন্ত্রকের আওতাধীন ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস (IGNCA) ও সংবাদ সংস্থা হিন্দুস্তান সমাচার সহ আয়োজক সংস্থা হিসেবে অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ঘোষিত জরুরি অবস্থার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মরণ করা হয় — যাকে দেশের নাগরিক অধিকার খর্ব ও কেন্দ্রীকরণের এক কালো অধ্যায় বলে চিহ্নিত করা হয়।

হোসাবলে কংগ্রেস নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “তোমাদের পূর্বপুরুষরা এই অপরাধ করেছে… দেশের কাছে তোমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।”

কংগ্রেসের জবাব: “RSS কখনওই ভারতের সংবিধান মেনে নেয়নি”

পরদিন সকালে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ এক্স (প্রাক্তন টুইটার)-এ লিখে পাল্টা আক্রমণ করেন:

“RSS কখনও ভারতের সংবিধানকে মেনে নেয়নি। ১৯৪৯ সালের ৩০ নভেম্বর থেকেই তারা আম্বেদকর, নেহরু ও সংবিধান প্রণেতাদের বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে সংবিধান মনুস্মৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়নি বলেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি আরও বলেন, “সংবিধান বদলানোর ডাক বহুবার দিয়েছে RSS এবং BJP। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে মোদী নিজেও এই দাবি করেছিলেন। তবে জনগণ স্পষ্টভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।”

জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেন, “জনগণের রায় উপেক্ষা করে RSS ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”

‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দ ঘিরে বিতর্ক

সংবিধানের প্রস্তাবনায় এই দুটি শব্দ সংযোজিত হয় ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনী আইন দ্বারা, ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন জরুরি অবস্থার সময়।

RSS ও তার সমর্থকদের মতে—

  1. এই শব্দগুলি জনগণের মতামত ছাড়াই জোরপূর্বক সংযোজন করা হয়েছে।
  2. ১৯৪৯ সালে গৃহীত মূল প্রস্তাবনায় এই শব্দ ছিল না, তাই মূল আকারে ফেরানো উচিত।
  3. এগুলো গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনাকে প্রতিফলিত করে না, বরং শাসকের আরোপিত আদর্শ হিসেবে পরিণত হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট কী বলেছে?

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে, সুপ্রিম কোর্ট সাবেক আইনমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম স্বামী, ড. বলরাম সিং ও আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায় দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দেয়।

৭ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়:

“এই রিট আবেদনগুলিতে এমন কোনো গুরুতর প্রশ্ন নেই যার বিচার প্রয়োজন। আবেদনকারীদের যুক্তিগুলি স্পষ্টভাবে দুর্বল ও ভিত্তিহীন।”

আদালত ব্যাখ্যা করে যে,

  • ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বলতে বোঝায়: রাষ্ট্র কোনও ধর্মের পক্ষে নয়, আবার বিরুদ্ধেও নয়।
  • ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে বোঝায়: রাষ্ট্রের কল্যাণকামী চরিত্র এবং সমান সুযোগের প্রতিশ্রুতি, কোনও নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আরোপ নয়।

অতীতেও RSS নেতাদের মনুস্মৃতি প্রসঙ্গ

RSS-এর একাধিক শীর্ষ নেতা অতীতে সংবিধান বাতিল করে ‘মনুস্মৃতি’-ভিত্তিক আইন ব্যবস্থা চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল কাঠামো রক্ষা করা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের একাংশ।


জরুরি অবস্থার ৫০ বছর উপলক্ষে আয়োজিত একটি স্মরণসভা আবারও সংবিধানের মূল চরিত্র নিয়ে বিতর্ক উসকে দিল। একদিকে RSS-এর ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ বাতিলের দাবি, অন্যদিকে কংগ্রেসের অভিযোগ—“গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল করার পরিকল্পনা চলছে।” আর সুপ্রিম কোর্ট আগেই জানিয়েছে—সংবিধান পরিবর্তন নয়, মানবিকতা ও ন্যায়ের অগ্রাধিকারই ভারতের মূল চেতনা।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply