নায়াদিল্লি , ১১ ফেব্ভারুয়ারী : রতের সুপ্রিম কোর্টে সম্প্রতি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে প্রচলিত ‘তালাক-ই-হাসান’ প্রথা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। এই প্রথায় একজন মুসলিম পুরুষ তিন মাসের মধ্যে তিন দফায়, প্রতি মাসে একবার করে ‘তালাক’ উচ্চারণ করে স্ত্রীকে বিচ্ছেদ করতে পারেন। তবে এই তালাক প্রক্রিয়া যখন ওয়াটসঅ্যাপ বা ইমেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, তখন তা নারীর মর্যাদা, সাংবিধানিক অধিকার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ এই বিষয়ে একাধিক আবেদনের শুনানি করেন। এই শুনানিতে আদালত একদিকে যেমন কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তালাকের কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন, তেমনই ওয়াটসঅ্যাপ-ইমেলের মাধ্যমে তালাক ঘোষণার প্রবণতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাংবাদিক বেনজির হিনা নামে এক মহিলা আবেদনকারী তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার স্বামী (যিনি নিজে একজন আইনজীবী) তালাক-ই-হাসান প্রক্রিয়ায় ওয়াটসঅ্যাপ, ইমেল এবং রেজিস্টার্ড ডাকের মাধ্যমে তালাক ঘোষণা করেছেন। আরও গুরুতর অভিযোগ, স্বামী ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ঠিকানায় নোটিশ পাঠিয়ে ‘পোস্টাল মিসচিফ’ করেছেন যাতে নোটিশ ফেরত আসে এবং প্রক্রিয়াটি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ বলে প্রমাণিত হয়। এছাড়া আরেকটি মামলায় এক অশিক্ষিতা স্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, তার স্বামী তাকে ফাঁকা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে তালাকের নথি তৈরি করেছেন। স্বামী আদালতে হাজির না হওয়ায় আদালত তালাকের কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, যতক্ষণ না তালাক বৈধ প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ দম্পতি বিবাহিত বলেই গণ্য হবেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছেন, “এটা ধর্মের প্রশ্ন নয়, এটা মানবতার প্রশ্ন।” তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ওয়াটসঅ্যাপ বা ইমেলের মাধ্যমে তালাক ঘোষণা করা হলে জনগণ আগেভাগেই আদালতের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলতে পারে। তাই এই ধরনের কোনো অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগে উভয় পক্ষের যুক্তি ভালোভাবে শোনা প্রয়োজন। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তালাক-ই-হাসানকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে না, কিন্তু এর অপব্যবহার এবং নারীর প্রতি অবিচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
একটি বিশেষ ক্ষেত্রে আদালত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিয়োগ করেছেন। বেনজির হিনার মামলায় দম্পতির মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা গেছে। আদালত চার সপ্তাহের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এই সময়ে তালাকের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অনুপস্থিত স্বামীকে খুঁজে বের করতে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে তাৎক্ষণিক তিন তালাক (তালাক-ই-বিদআত) নিষিদ্ধ করার পর তালাক-ই-হাসান এখনও আইনত বৈধ। কিন্তু বিভিন্ন জনস্বার্থ মামলায় (পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন) দাবি উঠেছে যে, এই প্রথা ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৫ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে নারীর সমতা, বৈষম্যহীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করছে। আদালত এনএইচআরসি, এনসিডব্লিউ এবং এনসিপিসিআর-এর মতামতও চেয়েছেন এই বিষয়ে।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে তালাকের মতো গুরুতর বিষয় ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া উচিত নয়। এতে প্রমাণের অভাব, জালিয়াতির আশঙ্কা এবং নারীর প্রতি অসম্মান বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরা তালাকের পর মিথ্যা পলিঅ্যান্ড্রি (একাধিক স্বামী) অভিযোগ তুলে স্ত্রীকে হয়রানি করছেন। আদালত এই অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ ভারতীয় সমাজে মুসলিম নারীর অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত আইনের প্রশ্ন, অন্যদিকে সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও নারীর মর্যাদা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করা আদালতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনে এই মামলার চূড়ান্ত রায় কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যই নয়, সমগ্র দেশের নারী অধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রেও দিকনির্দেশক হতে পারে।

