বন্দে ভারত এক্সপ্রেস: মোদী সরকারের প্রচারের ফাঁপা দাবি এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস: মোদী সরকারের প্রচারের ফাঁপা দাবি এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ

ভারতের রেলওয়ে ব্যবস্থায় ভান্ডে ভারত এক্সপ্রেসকে মোদী সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযানের একটি প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রথম চালু হওয়া এই ট্রেনটি ভারতের প্রথম সেমি-হাই-স্পিড ট্রেন হিসেবে পরিচিত, যা সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে চলতে সক্ষম এবং পরীক্ষামূলকভাবে ১৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতি অর্জন করতে পারে।

এটি সম্পূর্ণভাবে এয়ার-কন্ডিশন্ড চেয়ার কার সার্ভিস, যা ৮০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বের শহরগুলিকে যুক্ত করে বা ১০ ঘণ্টার কম সময়ের যাত্রায় ব্যবহার করা হয়।ট্রেনটিতে ১৬টি কোচ রয়েছে, যার মধ্যে আধুনিক সুবিধা যেমন জার্ক-ফ্রি কাপলার, উন্নত সাসপেনশন সিস্টেম, রিজেনারেটিভ ব্রেকিং এবং শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত।যাত্রীদের জন্য সুবিধা হিসেবে স্বয়ংক্রিয় দরজা, ওয়াই-ফাই, ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম এবং উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে।

সম্প্রতি, বন্দে ভারতের স্লিপার সংস্করণ চালু হয়েছে, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রোটোটাইপ হিসেবে উন্মোচিত হয়।এই ট্রেনটিতে ১৬টি কোচ রয়েছে, যা ৮২৩ যাত্রীকে ধারণ করতে পারে এবং তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত: ফার্স্ট ক্লাস (১এসি), সেকেন্ড ক্লাস (২এসি) এবং থার্ড ক্লাস (৩এসি)।২০২৬ সালে ১২টি স্লিপার ট্রেন চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে হাওড়া-কামাখ্যা, গুয়াহাটি-কলকাতা ইত্যাদি রুট অন্তর্ভুক্ত।এই ট্রেনগুলি ১০০০-১৫০০ কিলোমিটারের রুটে চলবে এবং রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো প্রিমিয়াম সার্ভিস প্রদান করবে।মোদী সরকার এই প্রকল্পকে ভারতের রেলওয়ে আধুনিকীকরণের প্রতীক হিসেবে প্রচার করে, কিন্তু বাস্তবে এটি সরকারের ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।বন্দে ভারতের প্রচার যতটা জোরালো, তার সেবার মান ততটাই নিম্নমানের।

সম্প্রতি, কলকাতা-গামী বন্দে ভারত ট্রেনে যাত্রীরা পচা চাল, শক্ত রুটি এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভিযোগ তুলেছেন, যা ৩০০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়া যাত্রীদের জন্য অপমানজনক।সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায় যাত্রীরা স্টাফের সঙ্গে তর্ক করছেন, কারণ খাবারে ডাল বা পনির অনুপস্থিতি এবং অতিরিক্ত রান্না করা চাল।এটি একক ঘটনা নয়;

২০২৪-২৫ সালে আইআরসিটিসি খাবারের মান নিয়ে ৬,৬৪৫টি অভিযোগ পেয়েছে, যার মধ্যে ভান্ডে ভারতও অন্তর্ভুক্ত।একটি ঘটনায় যাত্রী খাবারে কীটপতঙ্গ পেয়েছেন, অন্যটিতে মেয়াদোত্তীর্ণ জুস পরিবেশন করা হয়েছে, যার জন্য ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস স্লিপার বন্দে ভারতের শুধুমাত্র শাকাহারী (নিরামিষ) মেনুকে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উদাহরণ বলে সমালোচনা করেছে, যা মাছ-মাংসপ্রিয় অঞ্চলের যাত্রীদের অসুবিধা সৃষ্টি করে।

মোদী সরকারের রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবকে ‘রিল মিনিস্টার’ বলে সমালোচনা করা হয়, কারণ তিনি এক্স-এ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ভিডিও পোস্ট করেন কিন্তু সেবার মান উন্নয়নে ব্যর্থ। বন্দে ভারতের অগ্রাধিকারের কারণে অন্যান্য ট্রেনগুলি বিলম্বিত হয়, যা সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ায়।শীতকালে সিগন্যালিং সমস্যা এবং খাবারের নিম্নমান এই ট্রেনের খ্যাতিকে কলঙ্কিত করেছে।

সরকারের ফোকাস প্রিমিয়াম ট্রেনে, যখন সাধারণ কোচের যাত্রীরা ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকেন।এই প্রকল্পের খরচও প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিটি ট্রেনের নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়, কিন্তু ক্যাটারিং চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালে কোচি সাপ্লায়ারকে পুরনো খাবারের জন্য বন্ধ করা হয়েছে, কিন্তু সমস্যা অব্যাহত।

মোদী সরকারের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ স্লোগান ফাঁপা, কারণ বন্দে ভারতের কিছু অংশ বিদেশী প্রযুক্তি থেকে নেওয়া। উৎপাদন বিলম্বিত হয়েছে, এবং ২০২৬ সালেও সম্পূর্ণ রুট কভারেজ অর্জিত হয়নি।সরকারের এই ব্যর্থতা ভারতের রেলওয়েকে পিছিয়ে দিয়েছে। যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ উন্নত হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, ভারতে প্রচারের নামে যাত্রীদের প্রতারিত করা হচ্ছে। খাবারের মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে, আধুনিকীকরণের দাবি হাস্যকর। মোদী সরকারের কেন্দ্রীয়তাবাদী নীতি রাজ্যগুলির অভিযোগ উপেক্ষা করে, যেমন তৃণমূলের মেনু সমালোচনা।উপসংহারে, ভান্ডে ভারত মোদী সরকারের প্রচার যন্ত্রের একটি অংশ মাত্র। এটি যাত্রীদের সুবিধা বাড়ানোর পরিবর্তে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। সরকারকে অ্যাকাউন্টেবল করতে হবে, খাবারের মান উন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাধারণ রেলওয়ে উন্নয়নে ফোকাস করতে হবে। অন্যথায়, এই ‘ভান্ডে’ ভারত শুধুমাত্র একটি ফাঁপা স্বপ্ন থেকে যাবে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply