বৈশালী, বিহার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬: বিহারের বৈশালী জেলায় আরও একবার ঘৃণামূলক হয়রানি ও সাম্প্রদায়িক প্রোফাইলিংয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। স্থানীয় এক মুসলিম ফেরিওয়ালা রবিউল শেখকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করে তীব্র অপমান ও হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম বিক্রম সিং রাজপুত।
ভিডিওতে দেখা যায়, বৈশালীর রাস্তায় মাথায় করে কম্বল বিক্রি করছিলেন রবিউল শেখ। হঠাৎ বিক্রম সিং রাজপুত তার কাছে এসে আধার কার্ড দেখাতে বলেন। রবিউল জানান, তার আধার কার্ড ঘরে রাখা আছে। এই কথা শুনেই বিক্রম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রবিউলের বাংলা উচ্চারণের অজুহাতে তাকে বাংলাদেশি বলে অভিহিত করেন। “তুমি বাংলাদেশি, এখানে কী করছ? তোমার মতো লোকেরা এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে,” এমন কথা বলে তিনি তীব্র গালাগালি শুরু করেন। রবিউল বারবার বলার চেষ্টা করেন যে তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং তার কাছে সমস্ত কাগজপত্র আছে, কিন্তু বিক্রম কোনো কথা শোনেননি।উত্তেজিত হয়ে বিক্রম বলেন, “পুলিশকে ডাকব, তোমাকে ধরিয়ে দেব। বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, এখানে তোমরা ঘুরে বেড়াবে?” তিনি রবিউলকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে অপমান করতে থাকেন এবং পুলিশে অভিযোগ করার হুমকি দেন। রবিউল ভয়ে ও অসহায়তায় চুপ করে থাকেন।
পুরো ঘটনাটি কয়েকজন স্থানীয়ের মোবাইলে ধরা পড়ে, যা পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।এই ঘটনাটি গত ১৭ জানুয়ারির একটি ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। ওই দিনও বৈশালীতে বিক্রম সিং রাজপুত ও তার সঙ্গীরা এক বৃদ্ধ মুসলিম ফেরিওয়ালাকে মারধর করেন। তারা বৃদ্ধের আধার কার্ড দেখে ‘নকল’ বলে দাবি করেন এবং বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অজুহাতে হিংসাত্মক আচরণ করেন। সেই ভিডিওতেও দেখা যায়, তারা বৃদ্ধকে মাটিতে ফেলে লাথি-ঘুষি মারছেন এবং অশ্লীল গালাগালি দিচ্ছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এটিকে স্পষ্ট ঘৃণামূলক অপরাধ (হেট ক্রাইম) বলে অভিহিত করেছেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং অ্যাক্টিভিস্টরা বিহার পুলিশকে ট্যাগ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। টিম রাইজিং ফ্যালকন, মহম্মদ জুবায়েরসহ অনেকে এই ঘটনাকে “সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের চরম উদাহরণ” বলে মন্তব্য করেছেন।বাংলাভাষী মুসলিমদের প্রতি এমন সন্দেহ ও হয়রানি বিহার, ওড়িশা, অসমসহ বিভিন্ন রাজ্যে বেড়ে চলেছে। অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অশান্তির খবরের প্রভাবে এই ধরনের ভিজিলান্টে (স্বয়ংসেবক) আচরণ বাড়ছে।
যদিও আধার কার্ড, ভোটার আইডি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এই লোকেরা সাধারণ নাগরিকদের হয়রানি করছেন।বৈশালী পুলিশ এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। অভিযুক্ত বিক্রম সিং রাজপুতের বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারের খবরও পাওয়া যায়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে #JusticeForRabiulSheikh এবং #StopHateCrimes ট্রেন্ড। অনেকে মনে করেন, এই ধরনের ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতির উপর আঘাত।এই ঘটনা দেশের সামনে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে—কোনো সাধারণ নাগরিকের কি অধিকার আছে অন্য নাগরিকের পরিচয়পত্র যাচাই করার? আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কি পুলিশের নয়? বিহার সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে এই ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া। অন্যথায় এই ধরনের হয়রানি আরও বাড়তে পারে এবং সামাজিক সম্প্রীতি বিপন্ন হতে পারে।
