মুস্তাফিজের বিদায়: ভারতের জন্য কৌশলগত আশীর্বাদ নাকি বড় ভুল হিসাব?

PTI

ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনীতির সীমারেখা যখন ধূসর হয়ে যায়, তখন মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে মাঠের বাইরের সমীকরণই বড় হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) শুরুর প্রাক্কালে ঠিক এমনটাই ঘটেছে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রে। রেকর্ড ৯.২০ কোটি রুপিতে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) তাকে দলে নিলেও বিসিসিআই-এর বিশেষ নির্দেশে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি । এই সিদ্ধান্তটি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে কতটা লাভজনক বা ক্ষতিকর, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।

মুস্তাফিজের বিদায়: নেপথ্য কারণ ও অতীত পরিসংখ্যান মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার কারণ কোনোভাবেই চোট বা ফর্ম নয়। বরং বাংলাদেশে সাম্প্রতিক হিন্দু সংখ্যালঘু হত্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে ভারতে সৃষ্ট তীব্র জনরোষ এবং রাজনৈতিক চাপের মুখেই বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ মুস্তাফিজ বর্তমানে তার ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে রয়েছেন। কেকেআর থেকে বাদ পড়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেই তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম বোলার হিসেবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৪০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন

ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপের বিরুদ্ধে মুস্তাফিজের রেকর্ড ঈর্ষণীয়। সম্প্রতি এশিয়া কাপে ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবকে আউট করে তিনি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হন। আইপিএলে ৬০ ম্যাচে ৬৫ উইকেট নেওয়া এই ‘কাটার মাস্টার’ ভারতের মন্থর পিচে সবসময়ই এক আতঙ্কের নাম।

ভারতের জন্য সম্ভাব্য সুবিধা কৌশলগতভাবে মুস্তাফিজের অনুপস্থিতি ভারতীয় ব্যাটারদের জন্য এক বড় স্বস্তি হতে পারে, কিন্তু সামনে বিশ্বকাপ আর আগে বাংলাদেশের এই বলার কে ভারতীয় সবাই খেলার সুযোগ হারালো। মুস্তাফিজ বিশেষ করে ডেথ ওভারে তার বিষাক্ত স্লোয়ার এবং কাটার সামলানো যেকোনো বিশ্বমানের ব্যাটারের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ । আইপিএলে ভারতের তরুণ ব্যাটাররা তার বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাকে মোকাবিলা করা তাদের জন্য আরও জটিল হতে পারত। এছাড়া, দেশের জাতীয় আবেগ ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার খাতিরে বিসিসিআই-এর এই সিদ্ধান্তটি জনমতকে শান্ত করতে সাহায্য করেছে ।

ঝুঁকি ও ভুল হিসাবের সম্ভাবনা তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। মুস্তাফিজের মতো একজন বৈচিত্র্যময় বাঁহাতি পেসারকে হারানো আইপিএলের প্রতিযোগিতামূলক মানকে কিছুটা হলেও ক্ষুন্ন করবে । কেকেআর-এর মতো দলগুলো যারা ইডেন গার্ডেনসের মন্থর পিচকে মাথায় রেখে তাকে দলে নিয়েছিল, তারা এখন বড় ধরনের কৌশলগত সংকটে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। মুস্তাফিজ ইস্যুতে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ইতিমধ্যে ভারতে নির্ধারিত তাদের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ।বিসিবি সিধান্ত নিয়েছে আই পি এল এর খেলা তারা সম্প্রচার করবে বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন ক্রিয়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। যা ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য নেতিবাচক ।

বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে ট্যাকটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি একজন ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবে মুস্তাফিজের অভাব কেবল একজন বোলার হিসেবে নয়, বরং একজন ‘বাঁহাতি অ্যাঙ্গেল’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে অনুভূত হবে। ইডেন গার্ডেনসের মতো পিচে মুস্তাফিজের কাটার ও অফ-স্পিন ধরলে তা ডানহাতি ব্যাটারদের জন্য খেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে ]। কেকেআর-এর বোলিং লাইনআপ এখন অনেকাংশেই পাথিরানার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা দলের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

সার্বিকভাবে বিচার করলে, মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি স্বল্প মেয়াদে ভারতের জন্য রাজনৈতিকভাবে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি কৌশলগত ও কূটনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একে ‘কোলেটারাল ড্যামেজ‘ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিবেশী দেশের সাথে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক ‘পাকিস্তানিকরণ’-এর পথে হাঁটলে তা কেবল খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্বকেই আঘাত করে না, বরং দক্ষিণ এশীয় ক্রিকেটের সমৃদ্ধ ইতিহাসকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয় । পরিশেষে বলা যায়, মুস্তাফিজের অনুপস্থিতি ভারতের ব্যাটিং লাইনআপের জন্য সাময়িক স্বস্তি আনলেও, বিশ্বকাপ ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতার নিরিখে এটি বিসিসিআই-এর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply