বেঙ্গল রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান: হুমায়ুন কবিরের ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’র আত্মপ্রকাশ ও ২০২৬-এর লক্ষ্য

বেঙ্গল রাজনীতিতে নতুন শক্তির উত্থান: হুমায়ুন কবিরের ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’র আত্মপ্রকাশ ও ২০২৬-এর লক্ষ্য

মুর্শিদাবাদ: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত ও বিতর্কিত মুখ, ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবির, আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নতুন রাজনৈতিক দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (JUP)-এর যাত্রা শুরু করেছেন। ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গার খাগরুপাড়া মোড়ে এক বিশাল জনসভার মাধ্যমে এই দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে [৬৫]। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর কবিরের এই পদক্ষেপ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের শাসক দল এবং প্রধান বিরোধী দল—উভয় শিবিরের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে ।

দল গঠনের প্রেক্ষাপট ও বাবরী মসজিদ বিতর্ক হুমায়ুন কবিরের এই নতুন দল গঠনের মূলে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক সংঘাত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে মুর্শিদাবাদে একটি ‘বাবরী ধাঁচের মসজিদ’ নির্মাণের প্রস্তাব এবং ৬ ডিসেম্বর তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা দেন কবির । তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপকে ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ৪ ডিসেম্বর তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দল থেকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করে। কবিরের দাবি, তিনি মুসলিমদের নিরাপত্তা ও পরিচয়ের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং শাসক দল সংখ্যালঘুদের কেবল ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করছে ।

২০২৬-এর লক্ষ্য: ‘কিংমেকার’ হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হুমায়ুন কবির তাঁর নতুন দলের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল ১৩৫ থেকে ১৮২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছে [৪৩, ৫০]। তিনি দাবি করেছেন যে, তাঁর দল ৯০ থেকে ১০০টি আসন জয়লাভ করে রাজ্যে ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং তাঁর সমর্থন ছাড়া কেউ সরকার গড়তে পারবে না [২১, ৪৩, ৬৪]। কবির আরও জানিয়েছেন যে, তিনি হায়দ্রাবাদের সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল AIMIM-এর সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়ার বিষয়ে আগ্রহী ।

উন্নয়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই দলের নাম ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ রাখার সার্থকতা ব্যাখ্যা করে কবির জানান, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু, ওবিসি (OBC) এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতির মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করা । তিনি অভিযোগ করেন যে, গত ১৪ বছরে তৃণমূল সরকার পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং রাস্তাঘাটের মতো মৌলিক প্রয়োজনে বিশেষ কাজ করেনি । সাম্প্রতিক এক ভাইরাল ভিডিওতে কবির রাজ্যের ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন । তাঁর দাবি, বেসরকারি হাসপাতালগুলি পাঁচ হাজার টাকার বিলকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা লুট করছে এবং এর বিনিময়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া হচ্ছে ।

বিতর্ক ও আইনি জটিলতা হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক জীবন যেমন বর্ণময়, তেমনই বিতর্কেও ঘেরা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় হিন্দুদের নিয়ে তাঁর একটি বিতর্কিত মন্তব্য (‘ভাগীরথী নদীতে ফেলে দেওয়া’) দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল তবে তিনি বলেন এতা মমতা আমাকে দিয়ে করিয়েছিলেন, তিনি পরবর্তীতে দাবি করেন যে এটি সাম্প্রদায়িক হুমকির প্রতিবাদে বলা হয়েছিল ।

দলের যাত্রার শুরুতেই কবির নতুন আইনি জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তাঁর ছেলে গোলাম নবী আজাদ (সোহেল) এক পুলিশ কর্মীকে হেনস্থা করার অভিযোগে আটক হন । কবির এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ এবং তৃণমূলের চক্রান্ত বলে অভিহিত করেছেন। এর প্রতিবাদে তিনি ১ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছেন ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আমি একাই ১০০’ মন্তব্যের পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে হুমায়ুন কবির এখন বড় ‘কিংমেকার’ হতে পারেন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে।

হুমায়ুন কবিরের এই রাজনৈতিক উত্থানকে একটি নদীর তৃতীয় স্রোতের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে; যা মূল প্রবাহের সঙ্গে মিশে শক্তি বাড়াতে পারে অথবা শক্তিশালী ঘূর্ণি সৃষ্টি করে নদীর গতিপথই বদলে দিতে পারে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply