বাংলার রাজনীতিতে বড় রদবদল: ঘরওয়াপসি মৌসম নূরের, তৃণমূলের অস্বস্তি কি বাড়ছে?

বাংলার  রাজনীতিতে বড় রদবদল: ঘরওয়াপসি মৌসম নূরের, তৃণমূলের অস্বস্তি কি বাড়ছে?

মালদহ: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের রাজনীতিতে এক বড়সড় পটপরিবর্তন ঘটল। ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ মৌসম নূর পুনরায় তাঁর পুরনো দল জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করলেন। দিল্লির কংগ্রেস সদর দপ্তরে জয়রাম রমেশ, এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক গুলাম আহমেদ মীর এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের উপস্থিতিতে তাঁর এই ‘ঘরওয়াপসি’ সম্পন্ন হয়।

কেন কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে গিয়েছিলেন?

মৌসম নূরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি কংগ্রেসের হাত ধরে এবং তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মালদহ উত্তর কেন্দ্রের কংগ্রেস সাংসদ ছিলেন । ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি রাজ্যে বিজেপিকে রুখতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাথে নির্বাচনী জোটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন । কিন্তু তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি তাঁর এই জোটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং বামপন্থীদের সাথে চলার সিদ্ধান্ত নেয় ]। মৌসম মনে করেছিলেন, বিরোধী ভোট ভাগ হলে বিজেপির সুবিধা হবে। এই মতপার্থক্যের জেরেই ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন ।

তৃণমূলে মৌসমের গুরুত্ব ও প্রাপ্ত পদ

তৃণমূল কংগ্রেসে থাকাকালীন মৌসম নূর যথেষ্ট গুরুত্ব ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পেয়েছিলেন:

  • সাংগঠনিক পদ: তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক এবং মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের দলীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন । এছাড়া তিনি মালদহ জেলা তৃণমূলের সভানেত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ।
  • সংসদীয় ও সরকারি পদ: ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত হলেও, ২০২০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে মনোনীত করেন, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ]। পাশাপাশি তিনি পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন ।

রাজনৈতিক তাৎপর্য: মালদহ-মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের অস্বস্তি

মৌসম নূরের কংগ্রেসে ফেরা মালদহ ও মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। এই অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে গনি খান চৌধুরী পরিবারের গড় হিসেবে পরিচিত । মৌসমের দলত্যাগে তৃণমূল এই জেলায় তাদের অন্যতম প্রধান মুখকে হারাল, যা শাসক দলের জন্য বড় রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হতে পারে ।

বিশ্লেষকদের মতে, মালদহে তৃণমূল ও বিজেপির উত্থানের ফলে কংগ্রেসের যে আধিপত্য আলগা হয়েছিল, মৌসমের প্রত্যাবর্তনে সেই ‘কোটোয়ালি বাড়ি’র ঐতিহ্য আবার একজোট হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এটি বিশেষ করে মালদহ জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েত স্তরে তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্যের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।

INDIA জোট ও বিজেপির ওপর প্রভাব

কেন্দ্রে INDIA জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও রাজ্য রাজনীতিতে কংগ্রেস ও তৃণমূলের এই বিরোধপূর্ণ অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মৌসম নূর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মালদহ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজেপির জন্য প্রভাব: ২০১৯ সালে মৌসমের পরাজয়ের সুযোগ নিয়ে বিজেপি মালদহ উত্তরে জয়ী হয়েছিল । এখন মৌসম কংগ্রেসে ফেরায় যদি সংখ্যালঘু এবং ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস ভোটগুলি পুনরায় সংহত হয়, তবে তা বিজেপির ভোটব্যাঙ্কেও ফাটল ধরাতে পারে। তবে তৃণমূল ও কংগ্রেস আলাদা লড়লে ভোট বিভাজনের চিরাচরিত সুবিধাও বিজেপির কাছে বজায় থাকতে পারে।


মৌসম নূরের এই রাজনৈতিক যাত্রাকে একটি প্রত্যাবর্তনকারী নদীর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। একটি নদী যেমন মূল স্রোত ছেড়ে নতুন খাতে বইতে শুরু করে কিন্তু শেষে তার আদি মোহনাতেই ফিরে আসে, মৌসমও তেমনি সাত বছর অন্য রাজনৈতিক স্রোতে থাকার পর তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক শেকড়ে ফিরে এলেন। এই ফেরা যেমন কংগ্রেসের মৃতপ্রায় সংগঠনে জোয়ার আনতে পারে, তেমনি শাসক দলের সাজানো বাগানে কিছুটা বিশৃঙ্খলাও তৈরি করতে পারে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply