পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক এক রাজনৈতিক সমাবেশ ঘিরে উঠে এসেছে এক গভীর হতাশা ও প্রশ্নের চিত্র—যেখানে মানুষের আবেগ, দারিদ্র্য এবং সরল বিশ্বাস যেন একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে ‘দেখানোর রাজনীতি’র অংশ হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রিয় অভিনেতা Mithun Chakraborty-এর নাম ভাঙিয়ে হাজার হাজার মানুষকে সভায় আনা হলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি উপস্থিতই হননি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে দিকটি সামনে এসেছে, তা হলো—এই ভিড়ের বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গের ভোটার নন। বরং তারা এসেছেন প্রতিবেশী রাজ্য Bihar থেকে—দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিক, যারা সাধারণত আলু তোলার মতো কৃষিকাজে নিযুক্ত। প্রতিদিন ৩০০ টাকার বিনিময়ে মাঠে কাজ করা এই মানুষগুলোকেই নাকি বাস-ট্রাকে করে এনে দাঁড় করানো হয়েছে রাজনৈতিক সভায়, শুধু ভিড় বাড়ানোর জন্য।
যে মানুষগুলো সারাদিন মাটির সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের কাছে এই ৩০০ টাকা বড় প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনকেই কাজে লাগিয়ে তাদের রাজনৈতিক মঞ্চে নিয়ে আসা হয়েছে বলে অভিযোগ। তাদের অনেকেই জানতেন না সভার উদ্দেশ্য কী, বা তারা কাদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছেন—তারা শুধু জানতেন, দিন শেষে কিছু টাকা পাবেন।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশেষ করে প্রবীণ মানুষদের টানা হয়েছে এক ভিন্ন কৌশলে—“মিঠুনদাকে দেখা যাবে” এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বহু মানুষ, বিশেষ করে বয়স্করা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন শুধুমাত্র একবার প্রিয় অভিনেতাকে সামনে থেকে দেখার আশায়।
কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও যখন Mithun Chakraborty-এর দেখা মিলল না, তখন ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে হতাশা ও ক্ষোভ। এক বৃদ্ধা বলছিলেন—“ছোটবেলা থেকে সিনেমা দেখেছি, একবার সামনে থেকে দেখব ভেবেছিলাম… আমাদের কেন এমন আশা দেখানো হলো?”
এই পুরো ঘটনায় যেন দুটি ভিন্ন বাস্তবতা একসঙ্গে ধরা পড়েছে—একদিকে দরিদ্র শ্রমিক, যারা পেটের দায়ে ‘ভাড়া করা ভিড়’-এর অংশ; অন্যদিকে আবেগপ্রবণ সাধারণ মানুষ, যারা বিশ্বাস করে এসেছিলেন, কিন্তু ফিরে গেলেন ভাঙা মন নিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কৌশল গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যখন ভিড় দেখানোর জন্য বাইরের রাজ্যের অ-ভোটার শ্রমিকদের আনা হয়, এবং সাধারণ মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টানা হয়, তখন প্রকৃত জনসমর্থনের ধারণাটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
যদিও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করছে, তবুও মাঠপর্যায়ে উঠে আসা অভিজ্ঞতা এক ভিন্ন গল্প বলছে—একটি গল্প, যেখানে দারিদ্র্য, প্রতিশ্রুতি এবং প্রতারণা একসূত্রে গাঁথা।
দিনের শেষে, সেই শ্রমিকরা ফিরে গেছেন হয়তো ৩০০ টাকা নিয়ে, আর প্রবীণ মানুষগুলো ফিরেছেন গভীর হতাশা বুকে নিয়ে। রাজনৈতিক মঞ্চে হয়তো করতালি হয়েছে, কিন্তু সেই করতালির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে অসংখ্য মানুষের নীরব প্রতারনায়।