মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহনকারী একটি নৌকা থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক সীমান্তের কাছে ডুবে যাওয়ায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং শতাধিক মানুষ নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নৌকাটি থাইল্যান্ডের কো তারুতাও দ্বীপের কাছে, মালয়েশিয়ার লাংকাউই দ্বীপের ঠিক উত্তরে ডুবে যায়।
রবিবার মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ সাতটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে পাঁচজন নারী ও এক কিশোরী রয়েছে। মালয়েশিয়ান মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির (MMEA) প্রধান রমলি মুস্তাফার জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার থাই কর্তৃপক্ষ আরও চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে প্রায় ৭০ জন যাত্রী ছিলেন। এটি ছিল প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গার একটি বৃহত্তর দলের অংশ, যারা তিন দিন আগে রাখাইন রাজ্য থেকে একাধিক নৌকায় করে মিয়ানমার ত্যাগ করেছিলেন।

এখনও পর্যন্ত ঐ দলের আরও দুটি নৌকার কোনো খোঁজ মেলেনি। মালয়েশিয়ার লাংকাউই উপকূলের প্রায় ৫৮৩ বর্গকিলোমিটার (২২৫ বর্গমাইল) এলাকাজুড়ে উদ্ধার অভিযান চলছে।
MMEA প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, উদ্ধারকৃত একজনকে কাপড়ে ঢেকে রাখা হয়েছে এবং আরেকজনকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যখন উদ্ধারকর্মীরা সমুদ্রে নিখোঁজদের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
মালয়েশিয়ার কেদাহ ও পেরলিস সামুদ্রিক অঞ্চলের পরিচালক, ফার্স্ট অ্যাডমিরাল রমলি মুস্তাফা জানান, সন্ধ্যার পর অন্ধকার ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অভিযান বন্ধ থাকলেও সোমবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে তা পুনরায় শুরু করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকাটিতে প্রায় ৭০ জন যাত্রী ছিলেন।
তিনি বলেন, “আমরা সমুদ্র স্রোত, বাতাসের প্রবাহ ও সম্ভাব্য ভেসে যাওয়ার দিক বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধান এলাকা বাড়িয়েছি। এখন অভিযানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ ও আকাশপথ উভয় দিকেই পরিচালিত হচ্ছে।”
অভিযান জোরদার করতে MMEA পাঁচটি উদ্ধার জাহাজ ও একটি বিমান পাঠিয়েছে—এর মধ্যে রয়েছে KM SIANGIN (অন-সিন কমান্ডার), BENTENG 7, PETIR 81, PERKASA 1226, এবং Bombardier CL 415 উড়োজাহাজ।
এদিকে কেদাহ প্রদেশের পুলিশ প্রধান আদজলি আবু শাহ জানিয়েছেন, তেলুক এওয়া উপকূলে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং স্থানীয়দের অনুরোধ করা হয়েছে যেন তারা কোনো রোহিঙ্গা জীবিত অবস্থায় দেখতে পেলে দ্রুত কর্তৃপক্ষকে জানান।
তিনি আরও জানান, পুলিশ ও MMEA একসঙ্গে কাজ করছে নৌকাটি কোথায় ডুবেছে তা নির্ধারণ করতে এবং মানব পাচারকারীদের শনাক্ত করতে, যারা এই বিপজ্জনক যাত্রা সংগঠিত করেছিল।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে লাখো অভিবাসী ও শরণার্থী বসবাস করছে, যাদের অনেকেই অদলিখিত অবস্থায় নির্মাণ ও কৃষিখাতে কাজ করেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা প্রায়ই মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা করেন। এই যাত্রাগুলো প্রায়ই মর্মান্তিক পরিণতিতে শেষ হয়—নৌকাডুবি, নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর খবর নিয়মিতই শোনা যায়।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুরা নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত, দক্ষিণ এশিয়ার “বিদেশি” হিসেবে পরিচিত এবং দীর্ঘ দশক ধরে নিপীড়নের শিকার। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা দক্ষিণ বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। সামরিক জান্তা ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মধ্যে গৃহযুদ্ধের কারণে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি বেড়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, রাখাইনে চলমান সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ বেড়েছে।
রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ (R4R) এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ লিখেছে:
“#Rohingya জনগণ এখনও রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, কারণ সেখানে চলছে নির্যাতন, অপহরণ, হত্যা, জোরপূর্বক শ্রম ও জোর করে সেনা নিয়োগ।”
সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, আরাকান আর্মি অনেক সময় পাচারকারীদের সঙ্গে মিলে রোহিঙ্গাদের বিদেশে পাঠানোর জন্য বিশাল মুক্তিপণ আদায় করছে এবং প্রায়ই তাদের পাচারচক্রের হাতে তুলে দিচ্ছে।
#SaveRohingya এবং #Myanmar হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সংস্থাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে আন্দামান সাগরে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে, তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এর আগে, চলতি বছরের মে মাসে মিয়ানমার উপকূলে দুটি পৃথক নৌডুবিতে অন্তত ৪২৭ রোহিঙ্গার প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)।

