বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের বিরতির পর পাকিস্তানের সঙ্গে পুনরায় সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপন করতে যাচ্ছে। আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ঢাকা ও করাচির মধ্যে এই সরাসরি ফ্লাইট কার্যক্রম শুরু হবে বলে বুধবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে সরাসরি যোগাযোগের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পুনঃস্থাপন ঘটতে চলেছে।
সুত্রের খবর অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এই রুটে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সময়সূচি অনুযায়ী, প্রতি বৃহস্পতিবার এবং শনিবার এই ফ্লাইটগুলো চলাচল করবে। দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, নির্ধারিত দিনগুলোতে ফ্লাইটটি ঢাকার স্থানীয় সময় রাত ৮টায় উড্ডয়ন করবে এবং করাচি পৌঁছাবে রাত ১১টায়। ফিরতি পথে, করাচি থেকে ফ্লাইটটি মধ্যরাত ১২টায় যাত্রা শুরু করে ঢাকায় অবতরণ করবে ভোর ৪টা ২০ মিনিটে। এই সময়সূচি যাত্রীদের সুবিধার্থে এবং বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই বিমান যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের বিষয়টি কেবল বাণিজ্যিক বা যাতায়াত সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনে একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে উভয় দেশ তাদের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের পর, দুই দেশের মধ্যে এই নতুন করে গড়ে ওঠা উষ্ণতা বা ‘বনহোমি’র ফলস্বরূপই বিমান চলাচল পুনরায় শুরুর এই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও ভৌগোলিক দিক হলো আকাশপথের ব্যবহার। ঢাকা ও করাচির মধ্যে আকাশপথে যাতায়াতের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রুটটি ভারতের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যায়। তবে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এই রুটে চলাচলের জন্য ভারতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ‘ওভারফ্লাইট’ বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করা হয়নি। তবে আমি যে তথ্যের ভিত্তিতে চীনের সহযোগিতার কথা জানিয়েছি, তবে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত Islamabad Post বলা হয়েছে, চীন পাকিস্তানকে তাদের পশ্চিমাঞ্চলের আকাশসীমা (Western China Airspace) ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি বা ‘এক্সক্লুসিভ করিডোর’ দিয়েছে। এর ফলে ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার না করেই ‘নর্দান রুট’ দিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, সংবাদ পোর্টাল tbsnews.net -এর একটি প্রতিবেদনে বিমান কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে যে, ঢাকা-করাচি রুটটি পুনরায় চালু করার জন্য গত কয়েক মাস ধরেই পাকিস্তানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছিল। ২০১২ সালে সর্বশেষ এই রুটে সরাসরি বিমান চলাচল ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর পাকিস্তান সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (PCAA) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করেছে। এই অনুমোদনের আওতায় পাকিস্তানি আকাশসীমার নির্দিষ্ট এয়ার করিডোর ব্যবহারের অনুমতিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনাটি মূলত গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে প্রথম জনসমক্ষে আসে। সে সময় পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফরে এসেছিলেন। তাঁর সেই সফরের সময়ই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, ইসহাক দারের সেই সফরটি ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম কোনো উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। সেই সফরের ধারাবাহিকতা এবং পরবর্তী সময়ে নেওয়া কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোর বাস্তব প্রতিফলন হিসেবেই ২৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ফ্লাইট কার্যক্রমকে দেখা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর ঢাকা ও করাচির মধ্যে এই সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করছে। বাণিজ্যিক আদান-প্রদান বৃদ্ধি এবং যাত্রীদের যাতায়াতের ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ফ্লাইট কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন এবং এর পরবর্তী প্রভাবের দিকে এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ।

