রয়টার্সের প্রতিবেদন । ৪ মার্চ
আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই ভারত মহাসাগরে ঘটল এক নাটকীয় ও উদ্বেগজনক ঘটনা। ইরানি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ IRIS Dena বুধবার ভোরে শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে বিপদসংকেত পাঠায়। দুপুরের মধ্যেই জাহাজটি ডুবে যায়। ঘটনাটি শুধু একটি নৌদুর্ঘটনা নয়—বরং চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের পরিধি কতদূর বিস্তৃত হয়েছে, তার এক গভীর ইঙ্গিত বহন করছে।
শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি বিপদসংকেত পাঠানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডুবতে শুরু করে। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী Vijitha Herath পার্লামেন্টে জানান, জাহাজে প্রায় ১৮০ জন নাবিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন আহত অবস্থায় উদ্ধার করে গলের Karapitiya Hospital-এ ভর্তি করা হয়েছে।
কিন্তু এখনো ১০১ জন নিখোঁজ। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জাহাজটি কি চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল?
সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত সামরিক তৎপরতার খবর আন্তর্জাতিক মহলে চর্চিত। বিরোধী সাংসদরা পার্লামেন্টে সরাসরি জানতে চান, জাহাজটি কি সেই অভিযানের অংশ হিসেবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে?
কিন্তু শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি। সরকারি নীরবতা কূটনৈতিক মহলে আরও জল্পনা বাড়িয়েছে। এই নীরবতা কি কৌশলগত? নাকি সত্যিই তথ্যের ঘাটতি?
Islamic Republic of Iran Navy-এর জন্য এই ডুবি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান তার নৌবাহিনীকে পারস্য উপসাগরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগর পর্যন্ত সক্রিয় রাখতে চেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে শ্রীলঙ্কা উপকূলে এমন একটি জাহাজডুবি ইরানের ‘পাওয়ার প্রজেকশন’-এর উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এটি হামলার ফল হয়, তবে তা প্রমাণ করবে যে সংঘাতের ভৌগোলিক সীমানা অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আর যদি এটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা দুর্ঘটনা হয়, তবুও তা ইরানের সামরিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করবে।
ভারত মহাসাগরে অস্থিরতা?
শ্রীলঙ্কা ঐতিহ্যগতভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের উপকূলে এমন একটি আন্তর্জাতিক সামরিক ঘটনার সৃষ্টি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। ভারত মহাসাগর ইতিমধ্যেই চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তিধর দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। সেখানে ইরানি যুদ্ধজাহাজের ডুবে যাওয়া নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষণের বাইরে, এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো মানবিক ক্ষয়ক্ষতি। ১০১ জন নাবিকের ভাগ্য এখনো অজানা। তাঁদের পরিবারগুলোর জন্য এই অনিশ্চয়তা এক অসহনীয় অপেক্ষা।
শ্রীলঙ্কা উপকূলে IRIS Dena-র ডুবি কেবল একটি নৌদুর্ঘটনা নয়—এটি বর্তমান সংঘাতের বিস্তার, কৌশলগত বার্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণের অংশ।
সরকারি নীরবতা যত দীর্ঘ হবে, ততই জল্পনা বাড়বে। আর একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধ আর কেবল পারস্য উপসাগরে সীমাবদ্ধ নেই। তার ঢেউ পৌঁছে গেছে ভারত মহাসাগরের গভীরে।