প্রতিশোধের পথে ইরান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হারানোর দিকে যাচ্ছে

মধ্যপ্রাচ্যে এখন ভয়, অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার এমন এক সময় চলছে যেখানে আকাশ থেকে মৃত্যু যে কোনো মুহূর্তে নেমে আসতে পারে। দুবাই হোক বা দোহা—আজকের মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থান শতভাগ নিরাপদ নয়। সামরিক হোক বা বেসামরিক, কেউই নিশ্চিন্ত নয়। ইরান—যা সম্প্রতি তার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যার পর গভীর শোকে ডুবে আছে—এখন প্রতিশোধের পথে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ হারানোর দিকে যাচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যার পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ৪০টিরও বেশি কমান্ডার ও শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করেছে। এর ফলে ইরানের নেতৃত্বের বড় অংশ কার্যত ‘ডেক্যাপিটেটেড’ হয়েছে। আগেই তার বিমান প্রতিরক্ষা ও বিমান বাহিনী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।
তবু ইরান হাল ছাড়ছে না। তার বিকেন্দ্রীকৃত “মজাইক প্রতিরক্ষা” কৌশল ও বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে ইরান এখন আক্রমণ চালাচ্ছে—রেড লাইন বা নিয়ম-রেখা নিয়ে তেমন কোনো শঙ্কা দেখায় না এবং বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক শক্তির মুখোমুখি হতে দ্বিধা করছে না।
অপারেশন নাম: ইরানের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল বলে রিপোর্ট করা হয়েছে “Operation Epic Fury” নামে; এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান ইসরায়েল ও আমেরিকার লক্ষ্যবস্তুকে মধ্যপ্রাচ্যে বোমাবর্ষণ শুরু করে।

ইরান সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে—বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে আমেরিকার ঘাঁটিগুলো। ইরান সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করলে অন্য দেশগুলোও ফল ভোগ করবে। ব্রিটেনের সাইপ্রাস ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার ঘটনা যুক্তরাজ্যের সমর্থনের পর ঘটেছে বলে রিপোর্ট।

হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার আক্রমণ করে ইরান সমুদ্রপথে তেল পরিবহন বিঘ্নিত করেছে; এর ফলে আন্তর্জাতিক তেল মূল্য দ্রুত বাড়ে এবং শেয়ারবাজারে ধাক্কা লাগে। হুথিদের মাধ্যমে সৌদি আরামকোকে লক্ষ্য করার খবরও এসেছে।
আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি: দুবাই, ওমানের বাণিজ্যিক বন্দর ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোকে আঘাত করে ইরান গালফের অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধে চাপ দিতে চায়।
ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময়; অনুমান করা হয় প্রায় ২,০০০–২,৫০০ কার্যকর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, রেঞ্জ ২,৫০০ কিমি পর্যন্ত। উন্নত সিস্টেমগুলোর মধ্যে ফাত্তাহ হাইপারসনিক ও খোররমশাহর-৪ উল্লেখযোগ্য। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র পুনঃপ্রবেশের সময় ডিকয়-সোয়াম ছাড়ে, যা প্যাট্রিয়ট, থাড ও অ্যারো-৩ মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে। ইরানের ৩১টি স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট নিয়ে গঠিত মজাইক প্রতিরক্ষা নীতি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালে আইআরজিসি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল।

আঞ্চলিক হামলা ও লক্ষ্যবস্তুসমূহ
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি অঞ্চল: রেকর্ডিংয়ের সময় ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছিল; জেরুজালেমে বিস্ফোরণের খবর, তেল আবিবে সাইরেন, এবং দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলে রিপোর্ট অনুযায়ী ১০ জন নিহত ও ১০০+ আহত।


বাহরাইনের মার্কিন নৌঘাঁটিতে বারবার আক্রমণের খবর।
দুবাই—হোটেল ও বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
কুয়েতে সাইরেন চলমান; রিপোর্ট আছে যে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও আক্রমণের শিকার হয়েছে।
ওমানে দুকুম বাণিজ্যিক বন্দর লক্ষ্য করা হয়েছে।
ইরাকে একটি মার্কিন গোলাবারুদ গুদাম ধ্বংস করা হয়েছে।
সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার খবর, ক্ষতি সীমিত।
নৌযান ও বিমান: ইরান দাবি করেছে যে USS Abraham Lincoln এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ারকে চারটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে; যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি, তবে ইরান বলেছে ক্যারিয়ারটি পরে এলাকা থেকে সরে গেছে। একটি আমেরিকান F-15 যুদ্ধবিমান গুলি করে নেমে গেছে—রিপোর্টে বলা হয়েছে সম্ভবত প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের ফ্রেন্ডলি ফায়ারের কারণে।

Smoke rises in the sky after blasts were heard in Manama, Bahrain, on Saturday, February 28, 2026 [Reuters]
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বাহরাইনের মানামাতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর আকাশে ধোঁয়া উড়ছে [রয়টার্স]

রিপোর্ট অনুযায়ী ৩ জন আমেরিকান সার্ভিস মেম্বার নিহত; ইরানে সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি—২০০+ নিহত, যার মধ্যে স্কুলে বোমাবর্ষণে ১৫০+ মেয়ের মৃত্যু বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। গাঁধী হাসপাতাল লক্ষ্যবস্তু হওয়ার খবরও এসেছে, ফলে রোগীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩ জন, ইরাকে ২ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।

স্কুল, হাসপাতাল ও বেসামরিক স্থানে আঘাত—বিশেষত শিশুদের ওপর আঘাত—মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য। বহু পরিবার শোকাহত, আহত ও গৃহহীন। চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা জরুরি।
অর্থনৈতিক প্রভাব: হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহনে বিঘ্নের ফলে আন্তর্জাতিক তেল মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে। গালফের পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে আক্রমণ স্থানীয় অর্থনীতিকে ধাক্কা দিয়েছে।
আঞ্চলিক কূটনীতি: ইরান একা লড়ছে—কোনো মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশ বা বৈশ্বিক শক্তি প্রকাশ্যে ইরানের পক্ষে দাঁড়ায়নি। তবে ইরানের আক্রমণগুলো গালফের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আরও ঘনিষ্ঠ করে দিতে পারে। ইরান মনে করে যুদ্ধবিরতি এখনই মানে পরাজয়; তারা চায় আগে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় মূল্য দিতে বাধ্য করা হোক।
নিউক্লিয়ার ও গোয়েন্দা প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা (IAEA) বলেছে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা আক্রমণের শিকার হয়নি, যা প্রাথমিক হামলার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পেন্টাগন কংগ্রেসকে জানিয়েছে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করতে যাচ্ছিল না—এটি প্রাক-হামলার যুক্তি চ্যালেঞ্জ করে।


অনেক ইরানী দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট; বিদ্রোহ ও প্রতিবাদ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তনের আশা করেছিল, কিন্তু খামেনির হত্যার পরে সিস্টেমের কিছু অংশ অভ্যন্তরীণভাবে সংহত হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডটি রমজান মাসে ঘটায় তা শিয়া সম্প্রদায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি: কাগজে ইরানের জয় অসম্ভব মনে হলেও বাস্তবে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নগুলো জোরালো হয়ে উঠছে—ইরানের কৌশল কী, কতদিন তারা বিশ্বের শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে, এবং এই যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য কী। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরও সামরিক সম্পদ মোতায়েন করে—ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, B-2 স্টেলথ বোমারু, পারমাণবিক সাবমেরিন, ড্রোন ও নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র—তবে লক্ষ্য প্রদর্শন করা হলেও একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা বাড়ায় ঝুঁকি বাড়ে।

বায়ু হামলা ও কৌশলগত আঘাত দিয়ে রেজিম পরিবর্তন আনা কঠিন; স্থল বাহিনী ছাড়া তা অসম্ভবের কাছাকাছি। স্থল অভিযান মানে ব্যাপক হতাহত ও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত—আফগানিস্তানের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা।
যুদ্ধটি যদি আরও তীব্র হয়, তা আঞ্চলিক বিস্তার ঘটাতে পারে এবং মানবিক বিপর্যয়কে গভীর করবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি ঘটে, প্রশ্ন থেকে যায়—পরিবর্তন কোথায় ঘটবে: ইরানে নাকি যুক্তরাষ্ট্রে; অর্থাৎ এই সংঘাতের রাজনৈতিক ফলাফল কাদের ওপর পড়বে।


এই সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা মানুষের কষ্ট ও ভয়কে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। ইরানের শোক ও প্রতিশোধের অনুভূতিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা যায়, তবু সহিংসতা যত বাড়বে নিরীহ মানুষের কষ্ট ততই বাড়বে। আন্তর্জাতিক সমাজের তাত্ক্ষণিক কর্তব্য হলো কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি কেবল আঞ্চলিক নয়—এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। প্রশ্নগুলো এখনো অনুত্তরিত: এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, এবং এর মূল্য কে বহন করবে—সামরিক শক্তি নাকি সাধারণ মানুষ।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply