তেহরান, ১ মার্চ ২০২৬ (সংবাদ প্রতিবেদন): মধ্যপ্রাচ্যে যেন আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে যে বিমান হামলা চালানো হয়েছে, তাতে নিহতের সংখ্যা ৮৫-এ পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, সাথে বেড়েছে উত্তেজনাও।

This image grab taken from Iranian state television broadcasted on February 28, 2026, show what it says is the site of deadly US and Israeli strikes that hit a girls’ elementary school in Minab, in the southern Iranian province of Hormozgan near the strategic sea route of the Strait of Hormuz. [Screengrab/IRIB TV via AFP]
রক্তাক্ত শনিবার: মিনাব শহরের বেদনা
স্থানীয় সময় শনিবার সকালে, ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাব শহরের শাজারায়ে তাইয়েবে বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আক্রমণের শিকার হয়। শনিবার ইরানে সাপ্তাহিক ছুটির দিন নয়, বরং কাজের সপ্তাহের প্রথম দিন। তাই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল প্রচুর। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ভেরিফায়েড ভিডিওতে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের দেয়ালে ফুল এঁকে সাজানো ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চারদিকে কালো ধোঁয়া, আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ২৪ থেকে ৪০ জন নিহতের খবর এলেও , ইরানের জরুরি পরিষেবা ও রেড ক্রিসেন্ট সূত্রে নিহতের সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যায় . সর্বশেষ ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারকারী আইআরআইবি-র তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ জনে, যাদের বেশিরভাগই ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ছাত্রী। আহত হয়েছে আরও ৯৩ জন। মিনাবের গভর্নর মোহাম্মদ রাধমেহর জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
সামরিক ঘাঁটির ২০০ ফুট দূরে অবস্থিত বিদ্যালয়টি
প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হলো? সিএনএন-এর ভূ-অবস্থান সংক্রান্ত বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, এই বিদ্যালয়টি মিনাব শহরের একটি ইরানি সামরিক ঘাঁটি থেকে মাত্র ২০০ ফুট দূরত্বে অবস্থিত। ২০১৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রেও বিদ্যালয় ও ঘাঁটিটির পৃথক অবস্থান দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে বলেছে, “বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের ঘটনা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন এবং সেটা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই এই হামলাকে “ইরানি শহরগুলিতে নির্বিচার আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নিরপরাধ তরুণীদের হত্যা করে ইতিহাসের কলঙ্ক হয়ে থাকবে।”
পাল্টা আক্রমণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ‘সত্য প্রতিশ্রুতি-৪’ অভিযানের অংশ হিসেবে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবহরের পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে। দুবাই ও দোহাসহ বিভিন্ন শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস “তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি” ও “সংযম” অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে ইসরাইলের “প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক”-এর দাবিকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। রাশিয়া এই হামলাকে আঞ্চলিক “বিপর্যয়” ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ইরানের পাল্টা হামলাকে “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে।
তেহরানে থমথমে অবস্থা, বন্ধ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শপিং মলসহ জনাকীর্ণ স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তেহরানের রাজপথে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অনেকে শহর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েছেন।
মিনাব শহরের একটি বিদ্যালয়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা রক্তমাখা স্কুলব্যাগগুলোর ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে মানবতার বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। এক ভিডিওতে আর্তনাম করে উঠেছেন এক ব্যক্তি, যিনি হয়তো তার সন্তানকে খুঁজছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হলো যে, যুদ্ধ ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় নির্দোষ শিশুদেরই।
ওয়াসিম আকরামের রিপোর্ট
