তেহরান থেকে হরমুজ: লক্ষ্যহীন যুদ্ধ, কৌশলগত বিভ্রান্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

হরমুজ প্রণালী

বিশেষ প্রতিবেদন |ওয়াসিম আক্রাম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন কেবল আগুনের রেখা। চতুর্থ দিনে পা দিতেই স্পষ্ট— এই সংঘাত সাময়িক সীমিত আঘাতের পর্যায়ে নেই। Donald Trump প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ইরানের হৃদয়ভূমি Tehran-এ সরাসরি আঘাত হানছে। যে শহরকে “মুক্ত” করার রাজনৈতিক ভাষ্য শোনা গিয়েছিল, সেই শহরেই এখন ভারী বোমাবর্ষণ, ধ্বংসস্তূপ, আর লাশের সারি।

অন্যদিকে, নেতৃত্বে গুরুতর আঘাত সত্ত্বেও ইরান পিছু হটার লক্ষণ দেখায়নি। পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যাচ্ছে Tel Aviv, Haifa ও Jerusalem-এর দিকে। সংঘাতের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে।

এই যুদ্ধ এখন কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয়— এটি লক্ষ্য-অস্পষ্টতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক জোটরাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে জর্জরিত এক জটিল ভূরাজনৈতিক সংকট।

বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি: যুদ্ধের নীরব মূল্য

ইরানি সূত্রের দাবি, একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় ১৬০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই প্রক্রিয়া চললেও ঘটনাটি জনমতকে নাড়া দিয়েছে। তেহরানের রাস্তায় মানুষ নেমেছে— সরকারের সমর্থনে নয়, বরং নিহত শিশুদের জন্য শোক প্রকাশ করতে।

২৮শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ তারিখে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে সম্প্রচারিত এই ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত সমুদ্রপথের কাছে দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ঘটনাস্থল ছিল [স্ক্রিন গ্র্যাব/এএফপির মাধ্যমে আইআরআইবি টিভি]
২৮শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ তারিখে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন থেকে সম্প্রচারিত এই ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত সমুদ্রপথের কাছে দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ঘটনাস্থল ছিল [স্ক্রিন গ্র্যাব/এএফপির মাধ্যমে আইআরআইবি টিভি]

মার্কিন পক্ষ থেকেও ছয়জন সেনা নিহতের খবর নিশ্চিত হয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাড়তে পারে। পাশাপাশি ইরানের ১১টি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার দাবি সামনে এসেছে। ইরান পাল্টা দাবি করেছে, তারা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ রাডার স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

রিয়াদ ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে আঘাতের পর দূতাবাস আংশিক বন্ধ। লক্ষাধিক মার্কিন নাগরিককে অঞ্চল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও সরিয়ে নেওয়ার সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনো অস্পষ্ট— যা প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ইরানের আক্রমণের পর দুবাই বিমানবন্দর x.com থেকে নেউয়া ভিডিও

নেতৃত্ব সংকট সত্ত্বেও “মোজাইক ডিফেন্স” এর ফলে যুদ্ধবিরতির জটিলতা

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের আঘাতের পর কমান্ড-চেইন কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে তেহরান তাদের বিকেন্দ্রীভূত “মোজাইক ডিফেন্স” কৌশল সক্রিয় করেছে— যার অর্থ, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বাধীনভাবে যুদ্ধ চালাতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র যদি আলোচনায় বসতে চায়, প্রশ্ন ওঠে— কার সঙ্গে? কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কাঠামো অনিশ্চিত হলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এটি এক ধরনের “এস্কেলেশন ট্র্যাপ”— যেখানে যুদ্ধ থামাতে চাইলেও তা আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিদিন বদলানো বয়ান

ওয়াশিংটনের সরকারি ব্যাখ্যায় স্পষ্ট ধারাবাহিকতার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে:

  • প্রথম দিন: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস
  • দ্বিতীয় দিন: শাসন পরিবর্তন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
  • তৃতীয় দিন: ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা খর্ব করা
  • পরে: আঞ্চলিক আগ্রাসন ঠেকানো
  • সর্বশেষ: “আসন্ন হুমকি” প্রতিরোধে আগাম হামলা

মার্কিন কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠেছে— গোয়েন্দা তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল? প্রশাসন কি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিয়েছে? জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্য অংশের নাগরিক এই যুদ্ধে অসন্তুষ্ট। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাজনৈতিক মূল্যও বাড়বে।

ইসরায়েল-ফ্যাক্টর: কৌশলগত প্রভাবের বিতর্ক

এই সংঘাতে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তীব্র। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতিতে ইসরায়েলের প্রভাবের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে। ট্রাম্প-সমর্থক মহলের একাংশও প্রশ্ন তুলছেন— “অ্যান্টি-ওয়ার” প্রতিশ্রুতি কি ভেঙে গেল? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কি শুধুমাত্র ইসরায়েলের ইশারাতে এই হামলা করল?

এই বিতর্ক কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করছে।

সৌদি আরব ও উপসাগর: জ্বালানি-রাজনীতির টানাপোড়েন

সৌদি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় প্রথমে ইরানকে দায়ী করা হলেও পরবর্তীতে বিকল্প তত্ত্ব সামনে আসে। রিয়াদ তদন্ত করছে। ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে আঞ্চলিক অবস্থান।

এদিকে হরমুযপ্রণালী প্রায় অবরুদ্ধ। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। কাতার সাময়িকভাবে গ্যাস রপ্তানি স্থগিত করেছে। ইউরোপে জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা স্পষ্ট।যদি হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ হয়, তার অভিঘাত কেবল উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না— এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অর্থনীতিতেও তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।

রসদের যুদ্ধ: আগে কার অস্ত্র ফুরোবে?

ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সীমিত। উপসাগরীয় মিত্রদের মজুদ দ্রুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করছে, তাদের কাছে কয়েক মাসের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে।যদি স্থল অভিযান শুরু হয়— বিশেষত পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা লঞ্চ-সাইট ধ্বংস করতে— তবে তা হবে দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী ও ব্যয়বহুল। আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আকাশপথে আধিপত্য স্থাপন করলেই দ্রুত রাজনৈতিক ফল পাওয়া যায় না।

এক্সিট র‍্যাম্প কোথায়?

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে— যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে। অন্যদিকে চীন, ইরানি তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে, প্রকাশ্যে যুদ্ধে না জড়িয়ে হরমুজ খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— একটি আহত, ক্ষতবিক্ষত অথচ এখনও প্রতিরোধক্ষম ইরান কেন আলোচনায় বসবে? যতক্ষণ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব, ততক্ষণ তাদের কৌশলগত লিভারেজ অক্ষুণ্ণ থাকে।

এই সংঘাত এখন কেবল দুই রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়— এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৃহৎ শক্তির কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।লক্ষ্য যদি স্পষ্ট না হয়, কৌশল যদি প্রতিদিন বদলায়, আর মিত্রজোট যদি দ্বিধাগ্রস্ত থাকে— তবে যুদ্ধের সমাপ্তি অনিশ্চিতই থাকে।তেহরান থেকে হরমুজ— আগুনের রেখা এখন বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র ছুঁয়ে ফেলেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই রয়ে যায়,
এই যুদ্ধ কি সীমিত সামরিক অভিযানেই থামবে, নাকি এটি আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেবে— যার মূল্য দেবে গোটা বিশ্ব?

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply