২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় এক আকস্মিক ও ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে একটি “বিশাল সাফল্য” হিসেবে অভিহিত করেছেন । বর্তমানে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।
হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন হস্তক্ষেপের পেছনে প্রধানত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ কাজ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে । মার্কিন সরকারের দাবি অনুযায়ী, মাদুরো সরকার একটি “নারকো-টেররিস্ট” সংস্থা পরিচালনা করছিল এবং মাদক পাচারের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছিল । তবে বিশ্লেষকদের মতে, আসল উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা । কৌশলগতভাবে, ল্যাটিন আমেরিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে নিতে যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপ নিয়েছে ।
হস্তক্ষেপের পদ্ধতি ও কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ কেবল সামরিক অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে, যার ফলে তেল রপ্তানি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশটিতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে । সামরিকভাবে, মার্কিন এলিট ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ রাজধানী কারাকাসের সামরিক ঘাঁটিতে সরাসরি হামলা চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করে। কূটনৈতিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্র মাদুরো সরকারকে “অবৈধ” ঘোষণা করে এবং বিরোধী নেতাদের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে আসছিল ।
প্রেক্ষাপট ও অতীত সম্পর্ক ১৯৯৮ সালে কমিউনিস্ট নেতা হুগো সাভেজ ক্ষমতায় আসার আগে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা ছিল । একসময় ভেনেজুয়েলা মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিত এবং বিনিময়ে মার্কিন অস্ত্র সহায়তা পেত। তবে সাভেজ তেল শিল্প জাতীয়করণ করলে এবং মার্কিন প্রভাব কমাতে শুরু করলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে । ২০০২ সালেও সাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি চেষ্টা হয়েছিল, যা জনগণের প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয়। সাম্প্রতিক হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ধরে ভেনেজুয়েলার উপকূলে নৌ-অবরোধ এবং ড্রাগ কার্টেল দমনের নামে ছোট ছোট সামরিক হামলা চালিয়ে আসছিল ।
জনগণ ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো এই ইস্যুতে তীব্রভাবে বিভক্ত। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর আটক হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানী কারাকাসে তাঁর সমর্থকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং “মাদুরোকে ফিরিয়ে দাও” স্লোগানে বিক্ষোভ করেন। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল এবং প্রবাসে থাকা সাধারণ মানুষ মাদুরোর পতনকে “স্বাধীনতার মুহূর্ত” হিসেবে উদযাপন করছে । বিরোধী নেত্রী এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদো এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের আহ্বান জানিয়েছেন ।
মার্কিন বক্তব্য বনাম বাস্তব উদ্দেশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মাদক নির্মূলের জন্যই এই অভিযান চালানো হয়েছে । তিনি বলেছেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা “পরিচালনা” করবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি আসলে একটি “রেজিম চেঞ্জ” বা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা, যার মূল লক্ষ্য তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা । সাংবাদিক রবিশ কুমারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের কথা বললেও মূলত খনিজ সম্পদের দখল নিতে এবং চীনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করতেই এই হামলা চালিয়েছে ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পর বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে:
- চীন: চীন এই ঘটনাকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর মার্কিন “হেজেমোনিক অ্যাক্ট” বা আধিপত্যবাদী আচরণ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ।
- রাশিয়া: রাশিয়া এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে এবং মাদুরোকে “বৈধ প্রেসিডেন্ট” হিসেবে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ।
- ভারত: ভারত সরাসরি কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য না করলেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) ভারতীয় নাগরিকদের ভেনেজুয়েলা ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে । সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবরের মতে, এই লড়াই গণতন্ত্রের জন্য নয় বরং তেলের জন্য।
- ফ্রান্স: ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বিরোধী নেতা এদমুন্দো গঞ্জালেসকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং মাদুরোর “স্বৈরাচারী” শাসনের অবসানকে স্বাগত জানিয়েছেন ।

