নয়াদিল্লি, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহয়ান-এর দু-দিনের ভারত সফর শেষ হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা ও ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফর ভারত–ইউএই সম্পর্ককে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, শক্তি, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির উপর।
১৯ জানুয়ারি দিল্লির ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর আগমনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর দুই দেশ যৌথভাবে ১২টি বড় ফলাফলের ঘোষণা করে, যেগুলোকে সরকার “দ্বিতীয় প্রজন্মের কৌশলগত অংশীদারিত্ব”-এর ভিত্তি বলে বর্ণনা করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রকের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে জানানো হয়, এই সফরের মূল লক্ষ্য ২০২২ সালের CEPA (Comprehensive Economic Partnership Agreement)-এর ওপর ভিত্তি করে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারত–ইউএই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
ভারতের সামগ্রিক লাভ কী?
এই সফরের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো বহুমুখী বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার রোডম্যাপ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,এই চুক্তিগুলো কার্যকর হলে আগামী এক দশকে ভারতের জিডিপিতে ১–২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যোগ হতে পারে, বিশেষ করে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জৈসওয়াল বলেন,
“ইউএই রাষ্ট্রপতির সফর ভারত–ইউএই সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়। এই ১২টি ফলাফল আমাদের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করবে।”
কোন রাজ্যের সবচেয়ে লাভ? গুজরাট এগিয়ে
ঘোষিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে গুজরাটে।
ধোলেরা স্মার্ট সিটিতে ইউএই-এর বিপুল বিনিয়োগ গুজরাট ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স টেক সিটি (GIFT City)-তে ইউএই আর্থিক সংস্থার সম্প্রসারণ নতুন শিল্প করিডর ও কর্মসংস্থান প্রকল্প
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল বলেন,
“এই বিনিয়োগ গুজরাটকে বৈশ্বিক ফাইন্যান্স ও ইন্ডাস্ট্রির হাবে পরিণত করবে।”
তবে মহারাষ্ট্র (HPCL–Adnoc গ্যাস চুক্তির প্রভাব) এবং দিল্লি (স্পেস ও সুপারকম্পিউটিং প্রকল্প)-ও উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হবে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু সমালোচক অভিযোগ তুলেছেন,
“চুক্তিগুলো অতিরিক্ত গুজরাট-কেন্দ্রিক।”
সরকার অবশ্য বলছে, এটি জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
কোন খাতে সবচেয়ে বেশি লাভ?
১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ২০৩২ সালের মধ্যে বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য ভারতের রপ্তানি বাড়াবে ও আমদানি খরচ কমাবে।
২. শক্তি নিরাপত্তা HPCL ও Adnoc-এর মধ্যে LNG চুক্তি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করবে।
৩. প্রতিরক্ষা ও স্পেস যৌথ সামরিক মহড়া, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ISRO–IN-SPACe সহযোগিতা ভারতের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াবে।
৪. প্রযুক্তি ও এআই
সুপারকম্পিউটিং ক্লাস্টার ও ডিজিটাল অংশীদারিত্ব ভারতের এআই ও ডেটা প্রসেসিং শক্তি বাড়াবে।
ঘোষিত ১২টি ফলাফল (সংক্ষেপে)
1. ধোলেরা স্মার্ট সিটিতে ইউএই বিনিয়োগ
2. IN-SPACe-এর মাধ্যমে যৌথ স্পেস উদ্যোগ
3. কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব
4. HPCL–Adnoc LNG চুক্তি
5. ২০০ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য লক্ষ্য
6. GIFT City-তে ইউএই কোম্পানির সম্প্রসারণ
7. সুপারকম্পিউটিং ক্লাস্টার উন্নয়ন
8. আবুধাবিতে ‘হাউস অফ ইন্ডিয়া’ মিউজিয়াম
9. নবায়নযোগ্য শক্তিতে যৌথ প্রকল্প
10. ডিজিটাল ও ফিনটেক সহযোগিতা
11. শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়
12. জলবায়ু ও সবুজ প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব
এই ১২টির বেশিরভাগই এখনো MoU ও Letter of Intent পর্যায়ে রয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
বাস্তব রূপ দিতে না পারলে এগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
একজন বিশ্লেষক বলেন,
“ঘোষণা নয়, প্রকল্পের অগ্রগতি দেখেই এই সফরের সাফল্য বিচার করা হবে।”
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতির এই সফর নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ।
ভারত কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হচ্ছে,অর্থনীতি পাচ্ছে নতুন গতি,তবে রাজ্যভিত্তিক ভারসাম্য ও চুক্তির বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে এই সফরের চূড়ান্ত সাফল্য।
“এই চুক্তিগুলো শুধু বাণিজ্য নয়, ভারতের কৌশলগত স্বার্থও রক্ষা করবে।”
— রণধীর জৈসওয়াল

