উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি সমাজকর্মী উমর খালিদের মুক্তি ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে সরব হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮ জন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা। গত ৩০ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিনয় কোয়াত্রাকে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়ে তাঁরা এই আরজি জানিয়েছেন। মূলত ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জিম ম্যাকগভার্ন এবং জেমি রাসকিনের নেতৃত্বে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চিঠির মূল বক্তব্য সূত্রের খবর, এই চিঠিতে মার্কিন আইনপ্রণেতারা উমর খালিদের দীর্ঘকালীন বিচারহীন বন্দিদশা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ‘ইউএপিএ’ (UAPA)-র আওতায় খালিদকে যেভাবে বছরের পর বছর জামিনহীনভাবে আটকে রাখা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনি মানদণ্ডের পরিপন্থী। চিঠিতে সই করেছেন সেনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন, পিটার ওয়েলচ এবং প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য প্রমিলা জয়পাল, রাশিদা তলাইব, জান শাকোস্কি ও লয়েড ডগেট। চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ভারত সরকারকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে হয় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, নতুবা তাঁকে মুক্তি দিতে হবে। আইনপ্রণেতাদের মতে, প্রাক-বিচার আটক দণ্ড নিজেই এক প্রকার শাস্তিতে পরিণত হয়েছে এবং এটি ভারত ও আমেরিকার যৌথ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
মামদানি ও ম্যাকগভার্নের উদ্যোগ এই চিঠির কয়েক দিন আগেই নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি উমর খালিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে একটি হাতে লেখা বার্তা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি খালিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে লিখেছিলেন, “তিক্ততা নিয়ে তোমার কথাগুলো আমি প্রায়ই ভাবি, আর নিজেকে তা গ্রাস করতে না দেওয়ার গুরুত্বের কথাও মনে পড়ে। তোমার বাবা–মায়ের সঙ্গে দেখা করে সত্যিই ভালো লেগেছে।আমরা সবাই তোমার কথা ভাবছি।” খালিদের পরিবারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা করার পর মামদানি এই বার্তা পাঠান। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের এই চিঠির ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রেক্ষাপট রয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে জিম ম্যাকগভার্ন ওয়াশিংটনে উমর খালিদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং তখনই তিনি এই বিষয়টি নিয়ে সরব হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জোহরান মামদানির বার্তার পরেই এই ৮ জন আইনপ্রণেতার পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক স্তরে বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচার বিভাগীয় বিষয়ে বিদেশের এই হস্তক্ষেপ নিয়ে দেশে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। বিজেপির মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে দাবি করেছেন যে, ভারতের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এ বিষয়ে বাইরের কোনো উপদেশের প্রয়োজন নেই। তিনি বিষয়টিকে ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন যে, এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপর অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস মার্কিন আইনপ্রণেতাদের এই দাবির পাশে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেসের দাবি অনুযায়ী, খালিদ বা অন্যান্য কর্মীদের জামিন না দেওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আইনি নীতি অনুযায়ী ‘জামিন একটি নিয়ম, জেল ব্যতিক্রম’। ইন্ডিয়ান-আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল (IAMC) মার্কিন আইনপ্রণেতাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘শক্তিশালী পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) প্রাক্তন ছাত্র উমর খালিদকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল গ্রেফতার করে। তাঁর বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ করার অভিযোগ রয়েছে। চার্জশিটে পুলিশ দাবি করেছে যে, খালিদ এবং অন্যান্যরা মিলে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এই দাঙ্গা বাধানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও খালিদের আইনজীবীরা চার্জশিটের তথ্যের সত্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছেন। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে তাঁর জামিনের আবেদন বিবেচনাধীন রয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে বোনের বিয়েতে যোগ দিতে আদালত তাঁকে কিছুদিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিল। ৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও মামলার বিচার শুরু না হওয়াকে কেন্দ্র করেই এই আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের পক্ষে এই বিষয়ে এখন কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি ।
