গুয়াহাটি, ২০ আগস্ট:
হিমন্ত বিশ্বশর্মা অসমের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পর থেকেই রাজ্যে সরকারি বিজ্ঞাপন ও প্রচারের খরচ তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে অসম সরকার সংবাদমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী প্রচারে মোট ৪৬০.৮২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অথচ ২০২১ সালের ১০ মে হিমন্ত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগের পাঁচ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞাপনী ব্যয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪৫.০১ কোটি টাকা।
বিধানসভার সরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, বিজ্ঞাপনী বরাদ্দের এই বিপুল বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছে রাজ্যের বৃহত্তম সংবাদমাধ্যম গোষ্ঠী ‘প্রাইড ইস্ট এন্টারটেইনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড’। এই সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং চেয়ারপার্সন হলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার স্ত্রী রিণিকী ভুঁইয়া শর্মা। ২০২১-২২ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বছরেই প্রাইড ইস্ট সরকারি বিজ্ঞাপন বাবদ পেয়েছে প্রায় ২০.১১ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০১০-১১ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত দীর্ঘ ১১টি অর্থবর্ষে সংস্থাটি সব মিলিয়ে পেয়েছিল প্রায় ১০.৪ কোটি টাকা।

গত মাসে বিধানসভায় বিধায়ক ওয়াজেদ আলী চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে অসমের সামগ্রিক বিজ্ঞাপনী ব্যয়ের এই তথ্য পেশ করা হয়। অন্যদিকে প্রাইড ইস্টকে দেওয়া বরাদ্দের হিসাবটি ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট বিধায়ক আসিফ মহম্মদ নজর-এর তোলা প্রশ্নের উত্তরে বিধানসভায় পেশ করেছিল রাজ্য সরকার। প্রাইড ইস্ট বর্তমানে অন্তত দুটি নিউজ চ্যানেল, তিনটি বিনোদন চ্যানেল, একটি নিউজ পোর্টাল এবং বেশ কয়েকটি পত্রিকার পাশাপাশি ‘নিয়মিয়া বার্তা’ নামের একটি সংবাদপত্র পরিচালনা করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবর্ষে প্রাইড ইস্ট পেয়েছিল ৫.৯৫ লাখ টাকা এবং ২০১১-১২ সালে ৭.৭৭ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০.২৭ লাখ টাকায় এবং ২০১৬-১৭ সালে পৌঁছে যায় ৮৫.১৭ লাখ টাকায়। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে তা ১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ১.৩৭ কোটিতে পৌঁছায় এবং ২০২০-২১ সালে দাঁড়ায় ২.৬৮ কোটি টাকায়। তবে ২০২১ সালে হিমন্ত মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরই এই অঙ্কে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে সংস্থাটি পায় ৫.৫২ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ১০.০৫ কোটি টাকায়।
২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে অসম সরকার টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে মোট প্রায় ৩২ কোটি টাকা খরচ করেছিল। যার মধ্যে প্রাইড ইস্ট একাই পেয়েছে মোট টেলিভিশন বরাদ্দের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। নজর-এর প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন তথ্য ও জনসংযোগ মন্ত্রী পীযূষ হাজারিকা জানিয়েছিলেন যে ২০২১ সালে প্রাইড ইস্ট তাদের বিজ্ঞাপনের হার বাড়ায়নি। বর্তমানে তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তরটি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার অধীনেই রয়েছে।
বিজেপি সরকারের অধীনে বিজ্ঞাপনের মাধ্যম হিসেবে প্রিন্ট মিডিয়াতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ পর্যন্ত প্রিন্ট মিডিয়ায় ১২০.৯৮ কোটি টাকা খরচ হলেও পরবর্তী পাঁচ বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৫.৫৫ কোটি টাকায়। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে খরচ ৪.৬৩ কোটি থেকে বেড়ে ৬৯.৭০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং হোর্ডিং ও ব্যানারে খরচ ১৯.৪১ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০.০৪ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়াতেও সরকারি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
সংবাদপত্রের মধ্যে সর্বাধিক বিজ্ঞাপন পেয়েছে ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য আসাম ট্রিবিউন’ (৪৩.১ কোটি টাকা) এবং ‘দ্য সেন্টিনেল’ (৩০.২০ কোটি টাকা)। অসমীয়া দৈনিকগুলির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ‘অসমীয়া প্রতিদিন’ (২১.০৮ কোটি টাকা)। জাতীয় স্তরের সংবাদপত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পেয়েছে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ (২১.২৭ কোটি টাকা), ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ (১২.১৪ কোটি টাকা) এবং ‘দৈনিক জাগরণ’ (১০.৭২ কোটি টাকা)। এছাড়াও আউটডোর বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সমীক্ষক সংস্থা ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’-কে দুই অর্থবর্ষে মোট ৩.৬২ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে, যদিও কোন কাজের জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছে তা বিধানসভার জবাবে উল্লেখ করা হয়নি।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
