হায়দরাবাদ, ৯ সেপ্টেম্বর:
তেলঙ্গানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিআরএস প্রধান কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের ফার্মহাউসে যাওয়ার রাস্তাকে দুধ ও গোমূত্র দিয়ে ধুয়ে তথাকথিত শুদ্ধ করার অভিযোগ উঠল ভারত রাষ্ট্র সমিতির কর্মীদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি কংগ্রেসের দলিত ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির নেতৃত্ব ওই রাস্তা দিয়ে মিছিল করে যাওয়ার পরই বিআরএস কর্মীদের এমন পদক্ষেপ সামনে আসে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিআরএস নেতৃত্বের এই আচরণকে বর্ণবিদ্বেষী ও সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন বলে তীব্র আক্রমণ শেনেছে শাসকদল কংগ্রেস।
ঘটনার সূত্রপাত তেলঙ্গানার সিদ্দিপেট জেলার এরাভেলি গ্রামে, যেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কেসিআরের নিজস্ব ফার্মহাউস রয়েছে। জানা গিয়েছে, কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব ও বহু সংখ্যক দলিত কর্মী-সমর্থক ওই ফার্মহাউস অভিমুখে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন। এলাকায় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরে কংগ্রেস কর্মীরা মিছিল করে ফার্মহাউসের সংযোগকারী রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যান। যদিও কড়া পুলিশি প্রহরার কারণে তাঁরা ফার্মহাউসের প্রধান গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেননি এবং পথেই তাঁদের আটকে দেওয়া হয়।
কংগ্রেস কর্মীদের সেই বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরই এক চাঞ্চল্যকর দৃশ্যের অবতারণা হয়। অভিযোগ, বিআরএস কর্মীরা দলবদ্ধ হয়ে বালতি ভর্তি দুধ, গোমূত্র ও জল নিয়ে ওই রাস্তায় উপস্থিত হন। এরপর কংগ্রেসের দলিত নেতারা যে পথ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন, পুরো রাস্তাটিতে সেই তরল ঢেলে ঝাঁটা দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার ও তথাকথিত শুদ্ধিকরণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ার একাধিক ছবি ও ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
এই ঘটনার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সরব হয়েছে শাসকদল কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন, দলিত ও প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের প্রতি বিআরএস নেতৃত্বের সুপ্ত ঘৃণাই এই ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনের রাস্তায় এভাবে জাতপাতকেন্দ্রিক বৈষম্য ও তথাকথিত অস্পৃশ্যতার অনুশীলন সংবিধান ও মৌলিক মানবিক মর্যাদার চরম পরিপন্থী। দলিত নেতাদের পদধূলি পড়ায় রাস্তা অপবিত্র হয়ে গিয়েছে ধরে নিয়ে এভাবে দুধ ঢালা সামন্তপ্রভুদের মানসিকতাকেই নির্দেশ করে বলে তোপ দেগেছে কংগ্রেস।
অন্য দিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে দলিত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলিও। দলিত অধিকার রক্ষা মঞ্চের প্রতিনিধিরা এই ধরনের আচরণের তীব্র নিন্দা করে দোষীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে তফসিলি জাতি ও উপজাতি নির্যাতন বিরোধী আইনে মামলা দায়েরের দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দলিতদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাস্তা শুদ্ধিকরণের মতো অবমাননাকর কাজ করতে পারেন না। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সমাজকর্মীরা।
চাপের মুখে পড়ে অবশ্য আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেছে বিরোধী দল বিআরএস। স্থানীয় বিআরএস নেতৃত্বের একাংশের দাবি, এই উদ্যোগের সঙ্গে জাতিভেদ বা দলিত বিদ্বেষের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁদের বক্তব্য, শাসকদল কংগ্রেসের নেতারা রাজনৈতিক উদ্দেশে এলাকায় এসে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছিলেন এবং সেই মিথ্যা প্রচার ও অপশক্তির প্রভাব দূর করতেই প্রতীকীভাবে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। তবে বিআরএস-এর এই সাফাই মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সার্বিকভাবে এই শুদ্ধিকরণ বিতর্ক তেলঙ্গানার রাজ্য রাজনীতিতে জাতপাতের সমীকরণকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
Discover more from বাংলাকাল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
