রাজ্যের ৪৫০টিরও বেশি বিএড কলেজকে শোকজ নোটিস পাঠাচ্ছে সরকার

রাজ্যের ৪৫০টিরও বেশি বিএড কলেজকে শোকজ নোটিস পাঠাচ্ছে সরকার

কলকাতা, ৩ সেপ্টেম্বর:

রাজ্যের সাড়ে চারশোরও বেশি বিএড কলেজকে শোকজ নোটিস পাঠাতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। উচ্চশিক্ষা দফতরের পক্ষ থেকে পরিচালিত বিশেষ পরিদর্শনে নির্ধারিত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে না পারার কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কলেজগুলিকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য ২১ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে এবং তাদের অনুমোদন বা অ্যাফিলিয়েশন বাতিলের মতো কড়া সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।

রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, রাজ্যজুড়ে পরিচালিত এই ব্যাপক পরিদর্শনের পরেই শিক্ষক শিক্ষণ কলেজগুলির প্রকৃত পরিচালনা পরিস্থিতি প্রকাশ্যে এসেছে। শিক্ষক তৈরির নামে কোনোভাবেই কোনো ধরনের বাণিজ্যিক দোকান বা ডিগ্রি বিক্রির চক্র চালাতে দেওয়া হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করেছেন।

দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যে থাকা মোট ৬০২টি বিএড কলেজের মধ্যে ২৬৫টি প্রতিষ্ঠান শিক্ষক শিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার মতো ন্যূনতম যোগ্যতাই রাখে না। উচ্চশিক্ষা দফতরের বেঁধে দেওয়া একাধিক মূল শর্ত পূরণ করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মন্ত্রী জানান, প্রায় ১৭টি কলেজ জাতীয় শিক্ষক শিক্ষণ পর্ষদ বা এনসিটিই-র যাবতীয় নিয়ম লঙ্ঘন করে একাধিক সমান্তরাল কেন্দ্র পরিচালনা করছিল। এছাড়া ৫১টি কলেজ হয় তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল অথবা নথিবদ্ধ ঠিকানায় তাদের কোনও বাস্তব অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে কলেজ ভবনের পরিবর্তে মুদির দোকান পর্যন্ত দেখতে পেয়েছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা।

বাইরের রাজ্য থেকে এসে ডিগ্রি নেওয়ার প্রসঙ্গে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী মন্তব্য করেন, বাংলা থেকে মেধা পাচারের কথা প্রায়ই শোনা যায়, কিন্তু বিএড কলেজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগ কলেজের শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হওয়া সত্ত্বেও গোয়া এবং উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ডিগ্রি নিতে আসছেন। তারা কীভাবে ক্লাস করেন বা পড়াশোনা বোঝেন, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বহু ক্ষেত্রে ক্লাস না করেই কেবল টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি কেনাবেচা চলছিল। এই চক্র কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও জানান, প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমের মুখ্যসচিবের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরেই সেই চিঠি উচ্চশিক্ষা দফতরের হাতে আসে এবং তারপরেই এই রাজ্যব্যাপী চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬২ হাজার শিক্ষার্থী বিএড ডিগ্রি অর্জন করছেন।

ইতিমধ্যেই বিএড কোর্সে ভর্তির সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে উচ্চশিক্ষা দফতর, যেখানে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর কথা বলা হয়েছে। তবে মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সরকারের নির্ধারিত সমস্ত শর্ত পূরণ করতে পেরেছে এমন মাত্র ১৫১টি কলেজই কেবল এবারের ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে। পরিদর্শনের জন্য ১০০ নম্বরের একটি মূল্যায়ন সূচক নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে কলেজগুলির সামগ্রিক গড় নম্বর দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১.৫ শতাংশ। এর মধ্যে ১১৪টি কলেজ ৩০ শতাংশের নিচে নম্বর পেয়েছে এবং ১২১টি কলেজের পরিকাঠামো, শিক্ষকের উপস্থিতি ও শিক্ষার গুণগত মান চরম উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাকাল-কে ফলো করুন

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply