SBI-এর গ্লোবাল মার্কেটস ইউনিট কলকাতা ছেড়ে মুম্বইয়ে

SBI-এর গ্লোবাল মার্কেটস ইউনিট কলকাতা ছেড়ে মুম্বইয়ে

কলকাতা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ – স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই) তার গ্লোবাল মার্কেটস ইউনিট (জিএমইউ) কলকাতা থেকে মুম্বইয়ে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই স্থানান্তরের ফলে রাজ্য হারাবে বার্ষিক প্রায় ২৫ কোটি টাকার জিএসটি রাজস্ব, এবং এটি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আর্থিক কেন্দ্রের মর্যাদাকে দুর্বল করবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পিছনে ব্যাঙ্কের কেন্দ্রীকরণের কৌশল রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে ব্যাঙ্কের দক্ষতা বাড়াতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা এই স্থানান্তরের কারণ, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি-লাভের হিসাব এবং রাজনৈতিক দোষারোপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।এসবিআই-এর গ্লোবাল মার্কেটস ইউনিটটি কলকাতার জীবন সুধা ভবনে অবস্থিত ছিল, যার লিজ চুক্তি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬-এ সমাপ্ত হয়েছে। ব্যাঙ্কের মতে, এই স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য হলো ট্রেজারি এবং ফরেক্স অপারেশনগুলিকে মুম্বইয়ে কেন্দ্রীভূত করা, যাতে অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানো যায় এবং খরচ কমানো যায়।এই ইউনিটটি ব্যাঙ্কের গ্লোবাল ট্রেডিং, ইনভেস্টমেন্ট এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি পরিচালনা করে। মুম্বইয়ে স্থানান্তরের ফলে ব্যাঙ্কের সামগ্রিক অপারেশন আরও সুসংহত হবে, কারণ মুম্বই ভারতের আর্থিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত।তবে এই সিদ্ধান্তটি নতুন নয়; এর আগে ২০২৫ সালের জুন মাসে এসবিআই এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, যা স্থানীয় সিভিল সোসাইটি এবং রাজনৈতিক মহল থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।’ব্যাঙ্ক বাঁচাও দেশ বাঁচাও মঞ্চ’ নামক সংগঠন রাষ্ট্রপতি এবং আরবিআই-কে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে, দাবি করে যে এটি পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক ইকোসিস্টেমকে দুর্বল করবে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি: অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবএই স্থানান্তরের ফলে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে জিএসটি রাজস্বের। বিভিন্ন সূত্র অনুসারে, রাজ্য বার্ষিক ২৫ কোটি টাকা হারাবে, যা ইতিমধ্যে ঋণভারাক্রান্ত রাজ্যের জন্য একটি বড় ধাক্কা।এছাড়া, এই ইউনিটের সাথে যুক্ত চাকরিগুলি মুম্বইয়ে স্থানান্তরিত হবে, যার ফলে স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়তে পারে এবং দক্ষ কর্মশক্তির পলায়ন ঘটবে। কলকাতা, যা একসময় ভারতের ব্যাঙ্কিং হাব ছিল, তার ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা হারাবে, যা রাজ্যের সামগ্রিক আর্থিক খাতকে প্রভাবিত করবে।বৃহত্তর প্রেক্ষিতে, এটি পশ্চিমবঙ্গ থেকে কোম্পানিগুলির পলায়নের একটি ধারাবাহিকতা। তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) শাসনকালে (২০১১ থেকে), প্রায় ৬,৬৮৮টি কোম্পানি রাজ্য ছেড়েছে, যার ফলে জিডিপি শেয়ার ১০.৫% থেকে ৫.৬%-এ নেমে এসেছে
। রাজ্যের প্রতি মাথাপিছু ঋণ সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, এবং যুবকদের অনেকেই অন্য রাজ্যে চাকরির খোঁজে পাড়ি দিচ্ছে
এই স্থানান্তরটি সিঙ্গুর আন্দোলনের মতো ঘটনাগুলির স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, যেখানে টাটা মোটরসের কারখানা স্থানান্তরের ফলে হাজারো চাকরি হারিয়েছে।
কেউ কেউ যুক্তি দেন যে এসবিআই-এর কেন্দ্রীকরণ সামগ্রিকভাবে ব্যাঙ্কের জন্য উপকারী, যা পরোক্ষভাবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাহকদেরও সুবিধা দিতে পারে। তবে রাজ্যের জন্য সরাসরি লাভ নেই; বরং এটি মুম্বইয়ের আর্থিক কেন্দ্রকে আরও শক্তিশালী করবে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে এটি রাজ্যকে অন্যান্য খাতে ফোকাস করতে উৎসাহিত করতে পারে, যেমন আইটি বা পর্যটন, কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।এই স্থানান্তরটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিজেপি নেতারা, যেমন সুকান্ত মজুমদার এবং সুভেন্দু অধিকারী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে দোষারোপ করেছেন, দাবি করে যে ‘সিন্ডিকেট রাজ’ এবং অ্যান্টি-বিজনেস নীতিগুলি কোম্পানিগুলিকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে
। তারা উল্লেখ করেছেন যে টিএমসি শাসনকালে রাজ্যের ঋণ ৭.৭১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, এবং শিল্পোন্নয়নের পরিবর্তে ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স প্রাধান্য পেয়েছে। সিঙ্গুর আন্দোলন, যা মমতার রাজনৈতিক উত্থানের ভিত্তি ছিল, এখন বাংলার অর্থনৈতিক পতনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থকরা কেন্দ্র সরকারকে দোষারোপ করেন, দাবি করে যে এটি কলকাতার ‘পদ্ধতিগত অবহেলা’র অংশ।সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলি মমতাকে এই স্থানান্তর রোধ করতে আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু তিনি এখনও সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেননি। অন্যান্য ইস্যুতে, যেমন ইন্ডিগো বিমান বিভ্রাটে, তিনি কেন্দ্রকে দোষারোপ করেছেন,যা ইঙ্গিত দেয় যে এই ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপকে তিনি দোষী মনে করতে পারেন।তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন যে রাজ্য সরকারের অ্যান্টি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল নীতি, যেমন প্রণোদনা প্রত্যাহার এবং বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়েছে। মমতার শাসনকালে বেকারত্ব এবং অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।

এসবিআই-এর এই স্থানান্তরটি পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি সতর্কতা। ক্ষতিগুলি স্পষ্ট—রাজস্ব হানি, চাকরি হারানো এবং আর্থিক মর্যাদা হ্রাস—যখন লাভ নগণ্য। রাজনৈতিক দোষারোপে মমতা সরকারের নীতিগুলি প্রধানত দোষী, যদিও কেন্দ্রের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। রাজ্যকে পুনরুদ্ধার করতে দরকার সংস্কার এবং বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ। অন্যথায়, বাংলার অর্থনৈতিক পতন অব্যাহত থাকবে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply