বেঙ্গালুরুতে মর্মান্তিক ঘটনা: প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তরুণীকে খুন করে ফ্ল্যাটে আগুন দিল প্রতিবেশী কিশোর

বেঙ্গালুরুতে মর্মান্তিক ঘটনা: প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তরুণীকে খুন করে ফ্ল্যাটে আগুন দিল প্রতিবেশী কিশোর

বেঙ্গালুরু: ভারতের সিলিকন ভ্যালিতে নারী নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন চিহ্ন তুলে দিল এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বেঙ্গালুরুর রামমূর্তিনগর এলাকায় এক ৩৪ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে তার ১৮ বছর বয়সী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় আক্রোশের বশে ওই কিশোর তরুণীকে হত্যা করে এবং খুনের প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করতে ফ্ল্যাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা বলে মনে করা হলেও, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টে উঠে আসে আসল সত্য।
নিহত তরুণীর নাম শর্মিলা কুশলাপ্পা (৩৪)। তিনি ম্যাঙ্গালুরুর বাসিন্দা ছিলেন এবং বেঙ্গালুরুর অ্যাকসেঞ্চার (Accenture) নামক এক স্বনামধন্য আইটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি রামমূর্তিনগরের সুব্রহ্মণ্য লেআউটে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। গত ৩রা জানুয়ারি রাতে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে।
পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৩রা জানুয়ারি রাত প্রায় সাড়ে ১০টা নাগাদ ওই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক শর্মিলার ফ্ল্যাট থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন। আতঙ্কিত হয়ে তিনি দ্রুত দমকল বাহিনীকে খবর দেন। দমকল কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ফ্ল্যাটের ভেতর রান্নাঘরের কাছে শর্মিলাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ এবং দমকল বাহিনী ধারণা করেছিল যে শর্ট সার্কিট বা অন্য কোনো কারণে ফ্ল্যাটে আগুন লেগেছিল এবং ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে শর্মিলার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর পুরো তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। রিপোর্টে দেখা যায়, শর্মিলার শরীরে ধস্তাধস্তির চিহ্ন রয়েছে এবং তার মৃত্যু আগুনের ধোঁয়ায় নয়, বরং শ্বাসরোধের কারণে হয়েছে। এছাড়া তার শরীরে আগুনের যে ক্ষতগুলো ছিল, তা মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে সৃষ্টি হয়েছে বলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানান। এরপরই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় করা খুন।



পুলিশের বিশেষ দল তদন্তে নেমে প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তদন্তে উঠে আসে শর্মিলার পাশের ফ্ল্যাটেই মায়ের সঙ্গে থাকত ১৮ বছর বয়সী কার্নাল কুরাই (Karnal Kurai ) নামের এক কিশোর। সে কুর্গ (কোডাগু) জেলার বিরাজপেটের বাসিন্দা এবং বর্তমানে একটি কলেজে পিইউ (PU) ছাত্র।
ফরেনসিক প্রমাণ এবং শর্মিলার বন্ধু কে. রোহিতের বয়ানের ভিত্তিতে পুলিশ কার্নালকে সন্দেহের তালিকায় রাখে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। পুলিশের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে ওই কিশোর এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করে।
পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে অভিযুক্ত কার্নাল জানায়, সে শর্মিলাকে পছন্দ করত। ঘটনার দিন অর্থাৎ ৩রা জানুয়ারি রাত ৯টা নাগাদ সে স্লাইডিং জানালা দিয়ে শর্মিলার ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। সেখানে সে শর্মিলাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয় এবং তার প্রতি নিজের ভালোলাগার কথা জানায়। কিন্তু শর্মিলা সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং তাকে অবিলম্বে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কার্নাল শর্মিলাকে আক্রমণ করে এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

হত্যার পর অভিযুক্ত কিশোর প্রমাণ লোপাটের এক ভয়াবহ ছক কষে। ধস্তাধস্তির সময় শর্মিলার পোশাকে রক্তের দাগ লেগে গিয়েছিল। পুলিশ যাতে তাকে সন্দেহ না করতে পারে, সেজন্য সে শর্মিলার শরীর থেকে পোশাক সরিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর সে ওই জানালা দিয়েই নিজের ফ্ল্যাটে পালিয়ে যায়। কিন্তু সেই আগুন দ্রুত ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রীতে ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীদের নজরে আসে।

বেঙ্গালুরু পুলিশ অভিযুক্ত কার্নাল কুরাইকে হত্যা এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাকে তিন দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, “এটি একটি অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। অভিযুক্ত কেবল হত্যাই করেনি, অপরাধ ঢাকতে পুরো বিল্ডিংয়ের বাসিন্দাদের জীবন বিপন্ন করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আমরা সমস্ত ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছি এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনা বেঙ্গালুরুর কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা একা থাকেন, তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পুলিশ এবং আবাসন কর্তৃপক্ষগুলোকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও একজন নারীর ‘না’ বলার অধিকারকে সম্মান না জানিয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরই পরিচায়ক।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply