বাংলার রাজনীতিতে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে ‘মুর্শিদাবাদ যার, বাংলার মসনদ তার কাছাকাছি।’ অন্তত ২০২১ এর ফলাফল দেখে বলায় যায়! ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, এই আপ্তবাক্যটি যেন তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্য থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক প্রচ্ছন্ন ক্ষোভের চোরাস্রোত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর এই ক্ষোভকেই মূলধন করে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে জাতীয় কংগ্রেস।
গত কয়েকমাস ধরে কলকাতার বিধান ভবনের অলিন্দে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস নেতাদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। সম্প্রতি জেলা কংগ্রেসের নেতা মাহাতাব শেখ, হাসান বাপ্পা, জাহাঙ্গীর ফকির এবং সাইদুর রহমান প্রমুখেরা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কখনও গোপনে, কখনও বা প্রকাশ্যে— এই নেতাদের বৈঠকের মূল উদ্দেশ্যই হলো জেলার বিভিন্ন আসন থেকে দলের টিকিট নিশ্চিত করা। এরা ছাড়াও যারা নিয়মিত সম্পর্ক রেখে চলেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সুতির মইদুল ইসলাম এবং আলী রেজা, সামশেরগঞ্জ এর শামসুল আলম, বেলডাঙ্গার প্রাক্তন বিধায়ক শফিউজ্জামান, রাণীনগরের প্রাক্তন বিধায়িকা ফিরোজা বেগম সহ জেলা জেলা স্তরের বেশ কিছু নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসক দলের বিরুদ্ধে যে শাসকবিরোধী হাওয়া (Anti-incumbency) মুর্শিদাবাদে তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে বিধানসভায় নিজেদের আসন সংখ্যা বাড়াতে চাইছে কংগ্রেস।
তবে কলকাতায় বৈঠক বা দৌড়ঝাঁপ যাই হোক না কেন, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসের শেষ কথা এখনও একজনই— অধীর রঞ্জন চৌধুরী। মুর্শিদাবাদের মাটির নাড়ি আর রাজনীতির গতিপ্রকৃতি তাঁর চেয়ে ভালো কেউ বোঝেন না। জেলাজুড়ে তাঁর যে সাংগঠনিক দাপট এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমা রয়েছে, তাতে প্রার্থী তালিকায় তাঁর সিলমোহর ছাড়া কেউ এক ইঞ্চিও নড়তে পারবেন না। শুভঙ্কর সরকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ থাকলেও, জেলা স্তরের টিকিট বণ্টনে অধীর চৌধুরীর সিদ্ধান্তই যে চূড়ান্ত হবে, তা এক প্রকার নিশ্চিত।
এবারের নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের লড়াই কেবল দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী নয়, বরং বহুমুখী হতে চলেছে। শাসক দল তৃণমূলের অস্বস্তি বাড়িয়ে বিদ্রোহী বিধায়ক হুমায়ুন কবির গঠন করেছেন ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’। ভারতপুর ও রেজিনগর এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব অস্বীকার করার জায়গা নেই। তিনি যদি সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে বড়সড় ভাঙন ধরাতে পারেন, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে তৃণমূল এবং কংগ্রেস উভয়ের ওপরই।
অন্যদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবার মুর্শিদাবাদকে নিয়ে বাড়তি পরিকল্পনা সাজিয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে ভোট শতাংশের হারে বিজেপি যে উত্থান ঘটিয়েছিল, বিধানসভায় তারা তাকেই সাফল্যের সোপান বানাতে চায়। বিশেষ করে হিন্দু ভোট সংহতির পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে রেখে তারা ঘর গোছাচ্ছে।
মুর্শিদাবাদের ভোট মানেই সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু সমীকরণের সূক্ষ্ম অঙ্ক। তৃণমূলের বিরুদ্ধে উন্নয়ন এবং দুর্নীতির অভিযোগকে অস্ত্র করছে বিরোধীরা। কিন্তু সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন— কংগ্রেস কি পারবে তাদের পুরনো দুর্গ ফিরে পেতে? নাকি হুমায়ুন কবিরের মতো নির্দলীয় বা নতুন দলগুলি ‘ভোট কাটুয়া’র ভূমিকা পালন করে শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের পথ প্রশস্ত করে দেবে?
এক নজরে বর্তমান প্রেক্ষাপট:
🔹তৃণমূল কংগ্রেস: দুর্নীতির অভিযোগ ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চ্যালেঞ্জ সামলানো।
🔹জাতীয় কংগ্রেস: অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে হৃত জমি পুনরুদ্ধার এবং ময়দানে থাকা এবং সংগঠন যারা তৈরি করছে সে রকম তরুণ মুখদের সামনে আনা।
🔹জনতা উন্নয়ন পার্টি: হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকে থাবা বসানো।
🔹বিজেপি: হিন্দু ভোট ব্যাংক সংহত করে চমকপ্রদ ফলাফল করা।
পরিশেষে বলা যায়, মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস যে ভালো ফল করার আশা করছে তাতে লড়াইটা কেবল প্রার্থী হওয়ার নয়, লড়াইটা হলো সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে ব্যালট বক্সে রূপান্তর করার। অধীর চৌধুরী তাঁর তুরুপের তাস কীভাবে খেলেন, এখন সেটাই দেখার।
Posted inমতামত
মুর্শিদাবাদে প্রার্থী হওয়ার দৌড়: শুভঙ্কর সরকারের সঙ্গে হাসান বাপ্পা ও জাহাঙ্গীর ফকিরের সাক্ষাৎ, নেপথ্যে কোন সমীকরণ?

Facebook Comments Box