মুর্শিদাবাদ: জেলার লালগোলা থানার পুলিশ ও এক সিভিক ভলেন্টিয়ারের বিরুদ্ধে এক শিক্ষিত পরিবারকে মাঝরাতে বাড়িতে হানা দিয়ে হিরোইন পাচারে ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২৪ নভেম্বর দিবাগত রাতে লালগোলার জাগোরপাড়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। পরিবারের দাবি, সিভিক ভলেন্টিয়ার নিজেই ঘরের কোণে মাদকের প্যাকেট রেখে তাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কর্তা মানজারুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গত ২৪/১১/২০২৫ তারিখ আনুমানিক রাত ২টা ২৫ মিনিট নাগাদ লালগোলা থানার অফিসার রাজেন্দ্র বিশ্বাস, দেবব্রত দত্ত এবং গ্রামের পরিচিত সিভিক ভলেন্টিয়ার্স মো. আলিউজ্জামান (বাবুল) সহ মোট ৬ জন তাদের বাড়িতে হানা দেন। অভিযোগ, প্রথমে দরজায় ধাক্কাধাক্কি, লাথি মারা এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু হয়। এই গোলমালে এলাকার বহু মানুষজন জড়ো হন।
মানজারুল ইসলাম তার বড় দাদা মুজিবুর রহমান-কে ফোন করলে তিনি ছুটে আসেন। মুজিবুর রহমান পুলিশ অফিসারদের কাছে মাঝরাতে এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং গালিগালাজ করা হয় বলে অভিযোগ।
তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই সিভিক ভলেন্টিয়ার মো. আলিউজ্জামান জোর করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। মানজারুল ইসলামের স্ত্রী, খালিদা খাতুন, লক্ষ্য করেন আলিউজ্জামান বারবার তার জ্যাকেটের পকেট থেকে কিছু একটা বের করে রাখার চেষ্টা করছেন। এর কিছুক্ষণ পর আলিউজ্জামান পাশের একটি ঘরে প্রবেশ করে ঘরের এক কোণে কৌশলে তিনটি প্যাকেট রেখে দেন। সেখানে তখন অফিসার রাজেন্দ্র বিশ্বাস, মানজারুলের দাদা মুজিবুর রহমান সহ প্রতিবেশী মেকাইল শেখ এবং তাজেমুল হক উপস্থিত ছিলেন।

মানজারুলের দাদা মুজিবুর রহমান সহ বাকি দুজন সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠে জানতে চান, “আপনি ওটা কী রাখলেন?”
অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, এরপরই সিভিক ভলেন্টিয়ার মো. আলিউজ্জামান নিজেই রাখা প্যাকেটগুলি দেখিয়ে অফিসারকে বলতে থাকেন, “স্যার, পেয়ে গেছি, এখানে আছে!” এই ঘটনা বহু গ্রামবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি পরিবারের।
মানজারুল ইসলামের অভিযোগ, এরপর অফিসার রাজেন্দ্র বিশ্বাস ও দেবব্রত দত্ত তাকে ছাদে নিয়ে গিয়ে মারধর করতে থাকেন এবং জোর করে স্বীকার করাতে চান যে তিনি হিরোইনের ব্যবসা করেন। স্বীকার না করলে পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
মানজারুলের দাদা ছাদে গিয়ে পুলিশ অফিসারদের জানান, তাদের পরিবার কোনো অবৈধ ব্যবসা করে না। তিনি জানান, তার বড় ছেলে কলকাতা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ছে, এক মেয়ে লালগোলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী এবং ছোট ছেলেও আল আমিন মিশনে একাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছে। এমন শিক্ষিত পরিবারকে কেন এভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে, তা জানতে চান এলাকার মানুষজন।
এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে কিছুটা স্তিমিত হয় পুলিশ অফিসারদের আচরণ। কিছুক্ষণ পর লালগোলা থানার ওসি অতনু দাস ঘটনাস্থলে আসেন এবং এসেই প্রশ্ন করেন, “৩০ লক্ষ টাকার হিরোইন কোথা থেকে এলো?”
মুজিবুর রহমান তৎক্ষণাৎ বলেন, “দামটাও যখন আপনার জানা, তখন স্যার আপনিই হয়তো কিনে এনে আমাদের ফাঁসানোর জন্য এনেছেন।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়ে এবং নিজেদের ‘লেজেগোবরে অবস্থা’ দেখে ওসি অতনু দাস ভগবানগোলার এসডিপিও-কে ডাকেন। এসডিপিও এসে বিষয়টি জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান দৃঢ়ভাবে জানান, হিরোইনগুলি এখানে ছিল না, সিভিক ভলেন্টিয়ার মো. আলিউজ্জামান নিজেই এনে এখানে রেখেছেন, যা তিনি সহ এলাকার আরও অনেকে দেখেছেন। পুলিশ অফিসাররা এই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেননি।
এসডিপিও একটি প্যাকেট পরীক্ষা করেন এবং তিনটি প্যাকেট তুলে নিয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সময় ওসি অতনু দাস মানজারুল ইসলামের VIVO Y400 PROO মোবাইল ফোনটি (দুটি সিম সহ – জিও: ৯২৭৮৩৯৩১৪৩ এবং এয়ারটেল: ৮৩৪৫৮০৬২৩৩৪) নিয়ে যান। ওসি জানান, এত রাতে আসার ঘটনা নিয়ে পরিবার যেন পরবর্তীকালে ‘বাড়াবাড়ি’ না করে, তাই তারা একটি ‘নর্মাল রেড’ দেখাবেন এবং দিনের বেলায় ফোন ফিরিয়ে দেবেন। কিন্তু প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত সাড়ে ১০টা পার হলেও) ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ মানজারুল ইসলামের।
মানজারুল ইসলাম আশঙ্কা করছেন, তাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, লালগোলা থানার ওসি অতনু দাসের বিরুদ্ধে আইন বিরুদ্ধ কাজের এই অভিযোগ নতুন নয়, সপ্তাহ দুয়েক আগে মাহমুদুল হাসান নামে একজন স্কুল শিক্ষককে থানায় ডেকে ২১ ঘণ্টা আটকে রেখে বিনা কারণে মারধর করে। অনেক ক্ষেত্রে অনেককে তুলে নিয়ে এসে কোন কারণ ছাড়ায় নেশা মুক্তি কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসবের জন্য একজন ভুক্তভোগী ইতিমধ্যেই হাইকোর্টে রিট পিটিশন ফাইল করেছেন, মানবাধিকার সংগঠনও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করছেন, সাথে রাজ্য মানবাধিকার সংগঠনে অভিযোগ দায়ের করেছেন বিনা কারণে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিব্যক্তি মাহমুদুল হাসান।

