বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ: মুর্শিদাবাদ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে আবারও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এই পবিত্র কবরস্থানের জমিতে মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ বেআইনিভাবে একটি দোতলা ভবন নির্মাণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারী কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি কমিটির সভাপতি সানোয়ার শেখ, তিনি ৩১ জুলাই, ২০২৪ তারিখে জেলা পরিষদকে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি জানান যে, ওয়াকফ সম্পত্তির উপর নির্মিত ১২৮টি দোকানের উপর জেলা পরিষদ কোনো অনুমোদন ছাড়াই দোতলা ভবন তৈরি করছে এবং অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করার দাবি জানান।
জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় সানোয়ার শেখ গত ১৬ জুলাই, ২০২৪ তারিখে সরাসরি ওয়াকফ বোর্ডের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)-কে লিখিত আবেদন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় CEO ১৮ জুলাই, ২০২৪ তারিখে মুর্শিদাবাদ জেলাশাসককে একটি চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বলেন। তবে, অভিযোগ অনুযায়ী, আজ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ চলছে।

দীর্ঘদিনের বিবাদ: অতীত থেকে বর্তমান
কারবালা ওয়াকফ সম্পত্তি মূলত একটি বিশাল কবরস্থান, যা বহরমপুর শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে শিবডাঙ্গা বদরপুর মৌজায় অবস্থিত। এর মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিঘা। এই জমি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০০২-০৩ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তৎকালীন জেলা পরিষদের সভাধিপতি সচ্চিদানন্দ কান্ডারী ৩৭৭ খতিয়ানের ২৩৩ দাগের একটি অংশ পরিবর্তন করে ১ নং খতিয়ানে নিয়ে আসেন এবং এর উপর ১২৮টি দোকান তৈরি করেন। এই ঘটনা সেই সময় তীব্র জনঅসন্তোষের সৃষ্টি করে এবং ব্যাপক আন্দোলনের জন্ম দেয়।

২০০৭ সালে বহরমপুরের তৎকালীন মহকুমা আধিকারিকের তত্ত্বাবধানে একটি আপোষ মীমাংসা করা হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয় যে, দখলকৃত জমি আপাতত দখলমুক্ত করার চেষ্টা না করে, যেটুকু জমি কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটুকু সীমানা নির্ধারণ করে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়া হবে। সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে এবং মোতওয়াল্লী কমিটি এর তদারকি করবে। সেই অনুযায়ী কাজও হয়েছিল।
কিন্তু গত বছরখানেক আগে বর্তমান তৃণমূল পরিচালিত জেলা পরিষদ সেই ১২৮টি দোকানের উপর দোতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করলে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য জেলা পরিষদ ও মোতওয়াল্লী কমিটির মধ্যে একাধিকবার বৈঠক হলেও কোনো সমাধান সূত্র বের হয়নি।
বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু: নয়নজুলি
এই বিবাদের মূল কারণ হলো একটি নয়নজুলি (খাল)। জেলা পরিষদের দাবি, এই নয়নজুলি ২৩৪ দাগের অংশ এবং দোকানগুলো সেখানেই নির্মিত হয়েছে। অন্যদিকে, মোতওয়াল্লী কমিটির দাবি, নয়নজুলি ২৩৩ দাগের অংশ এবং দোকানগুলো ২৩৩ দাগের কিছু অংশ দখল করে তৈরি হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে, বহরমপুরের প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও মুর্শিদাবাদ কবরস্থান বাঁচাও কমিটির সদস্য ডা. এম. আর. ফিজা বলেন, “সিএস এবং আরএস মানচিত্র অনুযায়ী, নয়নজুলি ২৩৩ দাগের অংশ। মানচিত্র অনুযায়ী জমির পরিমাণ পূরণের জন্য এই নয়নজুলিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
এছাড়াও, আরও কিছু প্রশ্ন উঠেছে:
- কীসের ভিত্তিতে ৩৭৭ খতিয়ানের ২৩৩ দাগ পরিবর্তন করে ১ নং খতিয়ান করা হয়েছিল?
- ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি ১ নং খতিয়ান হয় এবং পরে ১০৯৪ খতিয়ানে রূপান্তরিত হয়। এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হলো?
- ২৩৩ এবং ২৩৪ দাগের মধ্যবর্তী রাস্তাটি কি ওয়াকফ সম্পত্তি, নাকি এটি ব্রিটিশ আমলের জেলা বোর্ডের রাস্তা?
অনেকের অভিযোগ, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিকে রাজ্যজুড়ে অনেক কবরস্থানকে ১ নং খতিয়ানে নিয়ে আসা হয়েছিল, যা কার্যত ওয়াকফ সম্পত্তিকে সরকারি সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করার শামিল।
রাজনৈতিক কোন্দল ও দুর্নীতির অভিযোগ
মুর্শিদাবাদ জেলা ওয়াকফ সম্পত্তি সুপারভাইজার কমিটির সদস্য ডা. এম. হাসনাত জানান, কারবালা ছাড়াও আরও অনেক ওয়াকফ সম্পত্তি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির কারণে বেদখল হচ্ছে। তিনি বলেন, “বারো বিঘা কবরস্থানের জায়গায় রাণী স্বর্ণময়ীর মূর্তি স্থাপনের বায়না করা হয়েছে এবং বাইশ পল্লীর ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে বাজার বসানো হয়েছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমান তৃণমূল পরিচালিত জেলা পরিষদ সিপিআইএম পরিচালিত জেলা পরিষদের শুরু করা দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।
এসডিপিআইয়ের জাতীয় সম্পাদক তায়েদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বহরমপুরে ওয়াকফ সম্পত্তি দখলের সূচনা হয়েছিল কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর হাত ধরে, পরে সিপিআইএম এতে গতি দেয়, এবং এখন তৃণমূল সেই ধারা বজায় রেখেছে। তিনি আরও দাবি করেন, সিপিআইএম-এর জেলা অফিস এবং দক্ষিণবঙ্গ রাজ্য পরিবহন নিগমকে দেওয়া বাস টার্মিনালও ওয়াকফ সম্পত্তির উপর নির্মিত হয়েছে।
কিছু এলাকাবাসী বর্তমান মোতওয়াল্লী কমিটির একাংশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগও এনেছেন। তাদের মতে, ১২৮টি দোকান থেকে যে ভাড়া আসছে, তার পুরোটা জেলা পরিষদের তহবিলে জমা হচ্ছে না।

ওয়াকফ বোর্ড এবং মোতওয়াল্লী কমিটির ব্যর্থতা?
প্রশ্ন উঠেছে, দখল ঠেকাতে বা পুনরুদ্ধার করতে ওয়াকফ বোর্ড এবং মোতওয়াল্লী কমিটি কতটা সফল? স্থানীয়দের অভিযোগ, কমিটিতে যোগ্য সদস্যদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতাদের পছন্দের লোকজন স্থান পায়, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তারা বলছেন, রাজনৈতিক নেতা, মোতওয়াল্লী কমিটির কিছু সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করা হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট ২০২৫, জেলা পরিষদ ও ওয়াকফ বোর্ডের যৌথ মাপজোখে প্রমাণিত হয় যে, জেলা পরিষদ ওয়াকফ সম্পত্তি দখল করে রেখেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, জেলা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে মাপ শেষ করে এবং পরে ডিএলআরও-এর মাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডকে ভুল তথ্য দিয়ে চিঠি পাঠায়। ওয়াকফ বোর্ড প্রথমে রিপোর্টে অস্বীকৃতি জানালেও, পরে লিখিত আবেদনের পর জানায় যে মাপে প্রমাণ হয়েছে জেলা পরিষদ কোনো দখল করেনি।
এর প্রতিবাদে মোতওয়াল্লী কমিটি ৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বোর্ডকে লিখিতভাবে জানায় যে তারা এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন এবং বোর্ড এককভাবে রিপোর্ট তৈরি করেছে। ১৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কমিটির বৈঠকে কোনো সমাধান হয়নি। বৈঠক থেকে বেরিয়ে সানোয়ার শেখ জানান, তারা আদালতের দ্বারস্থ হবেন।
তারা ইতিমধ্যে ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান এবং ২১ আগস্ট ২০২৫ মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ২২ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তারা জেলার সব সাংসদ, কয়েকজন বিধায়ক এবং সভাধিপতির সঙ্গে বৈঠক করবেন। যদি এর পরেও কোনো সমাধান না হয়, তবে পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা করা হবে। ওয়াকফ সম্পত্তি বাঁচানোর এই লড়াই এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই দেখার।
