ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৪

ধারাবাহিক উপন্যাস: ভাগাড় – পর্ব – ৪

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই। ফজরের আজান কানে আসতেই ঘুম ভাঙল। মসজিদ এখান থেকে প্রায় পাঁচ সাতশ মিটার দূরে। বিছানা ছেড়ে ব্রাসে পেস্ট লাগিয়ে গামছা কাঁধে নিয়ে ঘর থেকে বেরল। ভোরের সৌন্দর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করে রাতুল। প্রাতক্রিয়া সেরে হাত মুখ ধুয়ে একেবারে অযু করে নিল। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। 

গামছায় মুখ মুছতে মুছতে ঘরে এলো। একটা হলুদ রঙের টিশার্ট আর ট্রাকপ্যান্ট পরে বেরিয়ে পড়ল। বেরনোর আগে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিল। বারান্দা থেকে নেমে বেশ চওড়া উঠান পেরিয়ে সদর দরজা। দরজার পাশেই একটা ছোট্ট ঘরে দারোয়ান রহিম চাচা থাকে। চাচাও নামাজ পড়ে কিন্তু মাঝে মাঝে আজান শুনতে পায় না। রাতুল ডাক দিল। সে হুড় মুড় করে উঠে গেট খুলে দিতে দিতে বলল-

-আজকাল কি যে হচ্ছে আজান শুনতে পাচ্ছি না। তুমি না ডাকলে নামাজটা কাজা হয়ে যেত।

-সমস্যা নেই, আমি ডেকে দেব রোজ। বলেই সে বেরিয়ে গেল। 

মসজিদে যখন পৌছাল তখন নামাজ শুরু হতে কয়েক মিনিট দেরি আছে। ভিতরে প্রবেশ করে দেখল অন্যান্য দিনের মত আজও গুটি কয়েক সাদা মাথার মানুষ এসেছে। 

নামাজ শেষ করে সোজা ফিরে এলো। স্বাস্থ্য সচেতন হলেও অন্যান্যদের মত বিলাসী মর্নিং ওয়াকে যাবার ইচ্ছা তার হয় না। তাছাড়া এটা গ্রাম, এখানে ওসব বেমানান লাগবে। ফেরার সময় মাঠ মুখি অনেক লোকের সাথে দেখা হয়। সকলেই প্রায় তার দিকে তাকিয়ে সরল হাসি বিলিয়ে দেয়। রাতুল তার উত্তরে হাসি ফিরিয়ে দেয়। কেউ কেউ অবশ্য দুএকটা কথাও বলে। তাদের মধ্যে একজন জাব্বার চাচা। সেই প্রায়ই কথা বলে। লোকটা বেশ ভালো মনের বলেই মনে হয়। তার কথা ওই কেমন আছেন মাস্টার, আমার মেয়ে কেমন পড়ছে, একটু দেখবেন ইত্যাদি। 

ঘরে ফিরে বই নিয়ে বসে পড়ল। সকাল সাতটার সময় দরজায় টোকা পড়ল। এই কিছুদিনেই টোকাটা পরিচিত হয়ে গেছে। সারা রাতদিন যে রহিম চাচা দরজা পাহারা দেয়, সেই সকালের চা, দশটার ভাত, বিকেলের নাস্তা ও রাতের খাবার নিয়ে আসে। রাতুল রেঁধে খাবে বলে জানিয়েছিল জামালকে। কিন্তু তাতে সে রাজি হয়নি। স্বভাবচিত কর্কশ কণ্ঠে বলেছিল-

-আমার বাড়িতে থাকবে আর রান্না করে খাবে তা হতে পারে না। আমার বাড়ির খাবারই মাস্টারকে খেতে হবে। ব্যাস আর কথা বলতে পারেনি রাতুল। শুধু হেডমাস্টারের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে ছিল। তিনি ইশারায় মেনে নিতে বলেছিলেন। না মেনে উপায় ছিল না। কারণ অর্ধেক বেতনে সে বাড়ি থেকে রোজ যাতায়াত করতে পারবে না। আর এই গণ্ড গ্রামে অন্য কোথাও ঘর ভাড়াও পাবেনা সে। আর পাওয়া গেলেও, জামালের ভয়ে কেউ হয়ত তাকে ঘর দেবেই না। তাই অগত্যা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।

দরজায় দ্বিতীয় বার টোকা পড়তেই রাতুল আওয়াজ দিল- খোলা আছে।

বয়স্ক রহিম চাচা একটা সাদা ট্রেতে করে চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। একি দেখছে সে! চায়ের সাথে আস্ত ডিমের টোস্ট তার সাথে ছোট্ট একটা প্লেটে ফল কাটা! রাতুল বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করল-

-কী ব্যাপার চাচা? আজ এত কিছু?

-জানি না বাপজান। বড়োলোকের খেয়াল। বলেই সামনে ট্রে রেখে চলে যাচ্ছিল। দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে বলল-

-কিছু মনে না করলে একটা কথা বলব? ডিম টোস্টে সবে কামড় দিয়েছে রাতুল। রহিম চাচার প্রশ্নের উত্তরে তারদিকে তাকিয়ে বলল-

-অবশ্যই চাচা।

-তুমি একটু সাবধানে থেকো। বলেই অন্য কোনো কথার অপেক্ষা না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। 

মুখের ডিমটোস্ট মুখেই আটকে গেল। কি ব্যাপার আজ হটাত তাকে চায়ের সাথে এত খাবার কেন? একেবারে জামাই আদর যাকে বলে। আর রহিম চাচাই বা তাকে সাবধানে থাকতে কেন বলল? কী ধরনের সবধানতা তাকে অবলম্বন করতে হবে? কিছুই ভেবে পেলো না। কতক্ষণ যে সে এই ভাবে বসে ছিল কে যানে। এই তার এক প্রবলেম হয়েছে আজকাল। সব কিছুতেই বেশি ভেবে ফেলছে। বিছানায় পড়ে থাকা ফোন বেজে উঠতেই রাতুলের হুশ ফিরল। 

কামড়ানো টোস্টটা চিবোতে চিবোতে ফোন তুলে দেখল, কোম্পানির কল। চায়ে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করে ফেলল। একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। খাওয়া যাবে না। কোনো মতে টোস্টটুকু খেয়ে ট্রে টা সরিয়ে রাখল। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল এখন সকাল আটটা বেজে পনেরো মিনিট। মনে মনে হিসাব কষে আবার পড়াতে মন দিল। আজ স্নানের আগে একবার চাচার সাথে কথা বলতে হবে। জানতে হবে ঠিক কি ধরনের সাবধানের কথা তিনি বলতে চাইছেন?

ঠিক এই ভয়টা সে করছিল প্রথম থেকে। না আর জামাল সাহেবের অট্টালিকার কয়েদ খানার স্বেচ্ছা বন্দী বানাবে না নিজেকে। মাত্র এক মাস হয়েছে তার চাকরির। এখনও দশ মাস বাকী। বাড়ি থেকে যাতায়াত করাও সম্ভব নয়। স্কুলেও থাকার কোনো ব্যাবস্থা নেই। এদিকে জামালের বাড়িতে বেশিদিন থাকাও তার পক্ষে অসম্ভব। স্কুলের স্টাফ রুমে বসে এ সব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েছিল রাতুল। 

  -কি অত ভাবছেন রাতুল বাবু? সিনিয়র টিচার বিপিন বাবুর কথায় এক প্রকার চমকে উঠল সে। কিছু না বলে স্বভাব শুলভ হাসি দিল সে। বিপিন বাবু আবার বলে উঠলেন-

-এমন হোপ লেস হবেন না। বয়স কম। নিয়মিত পড়াটা চালিয়ে যান। স্কুল সার্ভিস হলেই ঝাপিয়ে পড়বেন। মনে রাখবেন একটা চাকরি যদি বৈধ ভাবে হয় তাহলে সেটা যেন আপনার হয়। 

আবারও হেসে উঠল সে। এখানে সেই একমাত্র ডেপুটেড, বাকিরা সকলে পার্মানেন্ট। বিপিন বাবু স্যার হিসাবে যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনি কখনও নেগেটিভ ভাবেন না। ছাত্রছাত্রিরা হয়ত সেজন্যই তাকে এত পছন্দ করে। 

-স্যার আপনার কি মনে হয়, এত দূর্নিতির, কেসের জটিলতার পরেও এস এস সি হবে? রাতুলের কথা অনেকটা মৃত্যু পথ যাত্রী যেমন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে ‘আমি বাচব তো’ ঠিক সেরকম শোনাল। রাতুলের কথায় অন্যান্য স্যাররা তার দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। সে মুখ ফসকে এ কথা বলে নিজের কাছেই নিজে বোকা হয়ে গেছে যেন। বিপিন বাবু একটু ভেবে বললেন-

-দেখেন রাতুল স্যার। সরকারের মনের কথা আমরা জানি না। তবে আশাবাদী আমি। যেভাবেই হোক আজ না হলেও কাল স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ করতেই হবে। আর ‘স্যার’ ডাকের স্বাদ যখন আপনি একবার পেয়েছেন, তখন অন্য কাজ করতেও পারবেন না। 

রাতুল মুখে কিছু বলল না কিন্তু মনে মনে বিপিন স্যারের সাথে একমত হল। পাশ থেক রাহেলা ম্যাডাম বললেন-

-শুধু কি স্কুল সার্ভিস, কোনো সেক্টরেই নিয়োগ নেই। সর্বত্র হাহাকার। আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং করে বাড়িতে বসে আছে। 

-আপনার ছেলের কমপ্লিট হয়েগেছে? কিসের উপর করল? সব থেকে বয়স্ক স্যার আনারুল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন। 

-কেমিক্যাল এ। ক্যাম্পাসিং নেই। যেসব কোম্পানি আসছে তারা দশ থেক পনের হাজার মত বেতন দিতে চাইছে। 

-বেকারত্বের সুযোগ আর কি! রাতুলের মুখ থেকে কথাটা আপনা থেকেই যেন বেরিয়ে এল। সকলে তার কথাকে সমর্থন করে মাথা নাড়ল। 

ঠিক তখনি বাইরে কোথাও প্রচন্ড আওয়াজ হল। একটা দুটো তিনটে চারিদিক চুপচাপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। আবার একড়া তীব্র খনখনে আওয়াজ। একটা নয়, এবার অনর্গল শব্দ হতে লাগল। বয়স্ক স্যার আনারুল সাহেব অস্ফুট স্বরে বলে উঠল “আবার শুরু হল”!

রাতুলের আর বুঝতে বাকি নেই কি শুরু হল। লড়াই শুরু হয়েছে। ওগুলো সব বোম আর বন্দুকের গুলি ছোড়ার শব্দ। একটা আতঙ্কের কালো ছায়া সকলের মুখে। হেড মাস্টার ছুটতে ছুটতে এসে স্টাফ রুমে ঢুকলেন। হাফাতে হাফাতে জিজ্ঞেস করলেন-

-স্কুলের কি হবে? 

-এখন ছুটি দিতে হবে না। আনারুল সাহেব বললেন। 

-তাহলে ছেলে মেয়েগুলোর… আতঙ্কে হেড মাস্টারের মুখ থেকে কথা বেরল না আর। তার ভয়ের বিশেষ কারণ হল, সে হিন্দু ধর্মের মানুষ। এটা পুরপুরি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম। নিরীহ মানুষটার ভয় একটু বেশি। আনারুল সাহেব তাকে অভয় দিয়ে বসতে বললেন-

-আপনি বসুন আমি দেখছি। বলেই স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তার সাথে সাথে আরও একজন স্যারকে বেরতে দেখে রাতুলও বেরল। স্কুলে এখন প্রায় হাজার বারোশ ছাত্রছাত্রী আছে। সকলে ভয়ে নিরব হয়ে আছে। খুব ভয় পেলে সমবেত মানুষ হয় খুব চিৎকার করে নয়ত একেবারে নিশ্চুপ হয়ে যায়। প্রতিটা ক্লাস রুমে স্যারদের আসতে দেখে কেউ কেউ ডুকরে কেঁদে উঠল। সকলকে বাইরে বেরতে বারন করে মেন গেটে তালা লাগাতে নির্দেশ দিলেন আনারুল সাহেব। যদিও স্কুলের মাঠের দিকটা পুরপুরি ফাঁকা। 

স্টাফ রুমে ফিরে এসে হেড স্যারকে থানায় ফোন করতে বললেন। 

-আমি করব? 

-আপনি করলে ভালো হবে। আপনি পরিচয় দিন যে হেড মাস্টার বলছি।

থানা থেকে আশ্বাস এল এখনি পুলিশ পাঠানোর। তবুও সবার মুখ থেকে ভয়ের সেই কালো ছায়া সরেনি। এতক্ষণে সব চুপচাপ হয়ে গেছে। কিন্তু রাস্তায় একদল মানুষের ছোটা ছুটি শুরু হয়েছে। নিশ্চয় দুচার জন মার্ডার হল। বিড়বিড় করে উঠলেন আনারুল সাহেব। ‘কবে যে এই মূর্খদের জ্ঞান ফিরবে’। 

রাতুল এতক্ষণে কথা বলল-

-আমাদের এখানে না থেকে প্রতিটা ক্লাস রুমে থাকা উচিৎ। নইলে বাচ্চাদের মাঝে প্যানিক তৈরি হতে পারে। 

-ঠিক বলেছেন। যান যে যার ক্লাস রুমে গিয়ে বসেন। আর সকলেই বলবেন তেমন কিছু হয় নি। অন্য গল্প না করে পড়াতে শুরু করবেন। তাতে ওদের ভয় কেটে যাবে। এই রতন ঘন্টা দাও ক্লাস বসার। দেখো ছুটির ঘন্টা দিও না যেন। 

সকলে উঠে পড়লেন। হেড স্যার বাইরের বারান্দায় গিয়ে পাইচারি করতে লাগলেন। আনারুল সাহেব গিয়ে বললেন

-আপনি আপনার অফিসে গিয়ে বসেন। ভয় পাবেন না। আমরা আছি তো। 

হেড স্যার কিছু না বলে নিজের অফিসে গিয়ে বসলেন। অন্যান্য স্যাররা তখন নিজ নিজ ক্লাস রুমে ভয়ে ভয়ে পড়ানোর অভিনয় করছে। আর কান পেতে আছে কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে কি না। 

কিছুক্ষণ পরেই একটা পুলিশ ভ্যান এসে স্কুল গেটের সামনে থামল। রতন ভয়ে ভয়ে ছুটে গিয়ে গেট খুলে দিল। একজন অফিসার ও চারজন কন্সটেবল স্কুলের ভিতরে ঢুকল। পিছনে পিছনে রতন এলো। হেড স্যারের রুমে ঢুকতেই উঠে দাড়ালেন তিনি। বসতে বললেন সকলকে। অফিসার একটার চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন। বললেন ভায় পাবার কোনো কারণ নেই। পঞ্চায়েতের সামনে বোমা বাজি হয়েছে। কয়েক রাউন্ড গুলিও চলেছে। স্কুলের তাতে ভয় পাবার কিছু নেই। 

এরই মাঝে বেশ কিছু অভিভাবক স্কুলের সামনে হাজির হয়েছে তাদের সন্তানদের নিয়ে যেতে। অফিসার হেড মাস্টারকে স্কুল ছুটি দিতে বললেন। পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। রতন তাড়াতাড়ি ছুটির বেল বাজিয়ে দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্কুল খালি হয়ে গেল। 

আনারুল সাহেব আর রাতুল এসে প্রবেশ করল। অফিসার তাদের দিকে তাকিয়ে উঠে দাড়ালেন। আনারুল সাহেব তাকে বসতে বললেন-

-বসুন স্যার বসুন।

-আমাকে চিনতে পারেন নি স্যার? আমি ইব্রাহিম।

-কোন ইব্রাহিম? স্মৃতি পথে হাঁটার চেষ্টা করলেন। একটু পরেই বললেন-

-ইব্রাহিম শেখ? আমি যাকে ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলতাম?

-হ্যাঁ স্যার আমিই আপনার সেই বাঁদর খলিলুল্লাহ। বলেই হাত বাড়িয়ে দিল। আনারুল সাহেব হাত ধরে বুকে টেনে নিলেন। শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন তার প্রথম জীবনের বাঁদর ছাত্রটিকে। উপস্থিত সকলে অবাক বিস্ময়ে দেখল ছাত্র আর শিক্ষকের অটুট বন্ধন। 

এমন খারাপ সিচুয়েশনেও সকলের মনে একটা প্রশান্তির হাওয়া ছুঁয়ে গেল। এখানে সকলেই শিক্ষক। শিক্ষক জীবনের এই তো পরম প্রাপ্তি। আর কি চায়!

আবার সেই তীব্র আওয়াজ শুরু হল। ঠিক বোঝা যাচ্ছে দুই পক্ষ সামনা সামনি হয়ে গুলি ছুড়ছে। এবার বোমার আওয়াজ একটা দুটো তিনটা… 

পুলিশ অফিসার ইব্রাহিম বলে উঠলেন-

-দুদুটো মরার পরেও এদের সাধ মিটল না! আবার শুরু করল। 

-কি! দুটো মার্ডার হয়ে গেছে? আনারুল সাহেব আঁতকে উঠলেন।

-হ্যাঁ স্যার। আসলে প্রধানকে টার্গেট করেছিল। অল্পের জন্য তিনি বেঁচে গেছেন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত দুজন স্পটেই মারা গেচ্ছে। এখনও প্রধান সাহেব পঞ্চায়েত অফিসে আটকে আছেন। 

সকলে আঁতকে উঠলেন। আর রাতুলের জ্ঞান হারাবার অবস্থা। সে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে বসে পড়ল। আনারুল সাহেব সেটা লক্ষ্য করে তাকে আজ বাড়ি চলে যাবার পরামর্শ দিলেন। অফিসার ইব্রহিম বললেন-

-আমার মনে হয় কয়েক দিন স্কুল ছুটি দেওয়া উচিৎ। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে বোঝা যাচ্ছে না। 

সকলে একমত হলেন। স্কুলের গেটে অনির্দিষ্ট কালের ছুটির নোটিশ টাঙানো হবে। পুলিশের ভ্যানে করে সকল টিচার দের বাসস্টপ পর্যন্ত নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত হল। মুশকিলে পড়ল রাতুল। সে কি করবে। তার ফোনটা ছাড়া সব কিছুই তো জামাল সাহেবের বাড়িতে। তার কি এখন ও বাড়িতে যাওয়া ঠিক হবে। আবার না বলে বাড়ি চলে গেলেও তো খারাপ ভাবতে পারেন। উনি যা মানুষ তাতে তাকে চটানো মোটেই উচিৎ হবে না। 

ঠিক সেই সময় রাতুলের ফোনটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বের করতেই দেখতে পেল, জামাল সাহেব নিজেই ফোন করেছে। রাতুলের হাত কাঁপছে। সকলের দৃষ্টি এখন তার দিকে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন ধরল-

-হ্যালো।

-মাস্টার তুমি আজ বাড়ি চলে যাও অথবা অন্য কোথাও গিয়ে থাকো। নিশ্চয় এতক্ষণে সব শুনেছ?

-জী শুনেছি। আপনি কেমন আছেন। 

-আমি ঠিক আছি। তুমি বাড়ি চলে যাও। কলটা কেটে গেল। আহত মানুষের মত মুখে বলল-

-জামাল সাহেব।

-কি বললেন? হেড মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন।

-বাড়ি চলে যেতে বললেন। 

-আলহামদুলিল্লাহ্‌। বেশ জোরে উচ্চারণ করলেন আনারুল স্যার। 

আর অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি অফিস বন্ধ করে স্যাররা বেরিয়ে পড়লেন। পুলিশ ভ্যানে অনেক ঠাসাঠাসি করে সকলে উঠে পড়লেন। কন্সটেবল কজন উঠলেন গাড়ির উপরে। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল বাসস্টপে। এতটা সময় কারও মুখে কোনো কথা ফোটেনি।

চলবে…

Facebook Comments Box

Discover more from বাংলাকাল

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply