গাজায় প্রবল ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ধসে মৃত এক শিশু-সহ চারজন মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

গাজায় প্রবল ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি ধসে মৃত এক শিশু-সহ চারজন মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

গাজা: যুদ্ধের ক্ষত এখনও দগদগে। তার মধ্যেই প্রকৃতির রোষে আবারও বিপর্যস্ত গাজা। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির জেরে গাজা উপত্যকায় একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এই বিপর্যয়ে এক শিশু, দুই মহিলা ও এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে প্যালেস্তিনীয় সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ।
সোমবার সন্ধ্যা থেকেই গাজা জুড়ে নিম্নচাপের প্রভাবে শুরু হয় প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বর্ষণ। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল গাজার বহু বাড়িঘর। প্রবল বৃষ্টির তোড় এবং দমকা হাওয়া সহ্য করতে না পেরে সোমবার রাতে সেই জরাজীর্ণ কাঠামোগুলোর কয়েকটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় ওই চারজনের। এছাড়াও গাজা সিটির বিভিন্ন প্রান্তে ফাটল ধরা বাড়ি ও অস্থায়ী আস্তানা ধসে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ঝড়ের দাপটে গৃহহীন হাজারো মানুষ
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এই ঝড় যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে নেমে এসেছে। হাজার হাজার প্যালেস্তিনীয়, যারা যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারিয়ে তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারা এখন চরম বিপাকে। সোমবার রাতের প্রবল বাতাস ও বৃষ্টিতে উপকূলবর্তী এলাকার অসংখ্য তাঁবু ছিঁড়ে গেছে, উপড়ে গেছে খুঁটি। ফলে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন অসংখ্য উদ্বাস্তু পরিবার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের অবস্থা শোচনীয়। ঝড়ের তোড়ে তাঁবু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ স্থানীয় মসজিদ এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বিল্ডিংগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সেই ভবনগুলোও কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
শীতের কামড়ে আরও মৃত্যুর আশঙ্কা
ইউনিসেফ ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে যে, এই শীতে গাজায় শিশুদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই প্রবল ঠান্ডায় জমে ছয়টি প্যালেস্তিনীয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার ওপর এই নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের অভাবে ধুঁকছে গাজার বিশাল জনসংখ্যা। তার মধ্যে এই ঝড় ও বৃষ্টি স্বাস্থ্য সংকটকে আরও গভীর করে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা ৭১,০০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশ নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যা ১,৭১,০০০-এর বেশি। যদিও ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছে, তবুও গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এরপরও ইসরায়েলি হামলায় ৪২৪ জন প্যালেস্তিনীয় নিহত এবং ১,১৮৯ জন আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সংঘাতের এই ধারাবাহিকতা এবং তার সঙ্গে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ গাজাবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

ঝড়ের কারণে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বেড়েছে। আমেরিকা, স্পেন এবং গ্রিসের মতো দেশগুলো গাজায় শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে মার্কিন কংগ্রেসের নতুন বিলে ইসরায়েলকে সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব এবং প্যালেস্তিনীয় তহবিলে শর্ত আরোপের বিষয়টি বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেমে জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ (UNRWA)-র অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ ও জল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়ায় ত্রাণের কাজ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গাজার এই করুণ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে দ্রুত কোনও স্থায়ী সমাধানের দিকে। কিন্তু যুদ্ধ, অবরোধ এবং এখন প্রকৃতির এই রুদ্ররোষে গাজার সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চয়তার অন্ধকারেই ডুবে আছে।

Facebook Comments Box
Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply