দোহা ১৭ ই জানুয়ারি : ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বড় পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (Strategic Mutual Defence Agreement – SMDA) এখন তুরস্কের যোগদানের মাধ্যমে একটি ত্রিপক্ষীয় জোটে রূপ নিতে চলেছে। এই জোটকে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলে অভিহিত করছেন, কারণ এতে একটি দেশের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে—যা ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর মতো।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি এই চুক্তির সম্প্রসারণের জোরালো প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এতে মিশর এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে যেমন কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এই প্রস্তাবের পেছনে প্রধান কারণ হলো ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির অনিশ্চয়তা এবং মুসলিম বিশ্বের স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন। হামাদ বিন জাসিমের মতে, এই জোট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে এবং বহিরাগত হস্তক্ষেপ কমাবে।চুক্তির পটভূমি ও কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিয়াদে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যেকোনো এক দেশের ওপর আগ্রাসনকে উভয়ের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটি ইসরায়েলের কাতারে হামলা সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৫ এবং গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরানে ইসরায়েলের বিস্তৃত আক্রমণের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে।২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তুরস্ক এতে যোগ দেওয়ার জন্য উন্নত পর্যায়ের আলোচনা চালাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজা হায়াত হারাজ জানিয়েছেন, তিন দেশের মধ্যে খসড়া চুক্তি প্রস্তুত এবং এটি প্রায় ১০ মাস ধরে আলোচনায় রয়েছে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুসারে, তুরস্কের যোগদান খুবই সম্ভাব্য।
এই জোট গড়ে ওটার কিছু গুরুত্বপূর্ন কারণ হচ্ছে ইসরায়েলের আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই জোট ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কমানো ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তুরস্ক, আর সৌদি ও পাকিস্তান স্বাধীন নিরাপত্তা চায়। আর সৌদির অর্থনৈতিক শক্তি, পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা ও সেনাবাহিনী, তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি ও সামরিক অভিজ্ঞতা একত্রিত হবে।
যদি এই জোট বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সৌদি আরব পারমাণবিক ছত্রছায়া পাবে, ইরান ও ইসরায়েলের হুমকি থেকে রক্ষা পাবে। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েও সামরিক নির্ভরতা কমবে।পাকিস্তান অর্থনৈতিক সাহায্য, সৌদির অর্থ ও তুরস্কের প্রযুক্তি পাবে। ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত গভীরতা বাড়বে এবং মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের সুযোগ।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হয়েও পশ্চিমা নির্ভরতা কমাবে। উপসাগরীয় প্রভাব বাড়বে, ড্রোন ও প্রতিরক্ষা শিল্প রপ্তানি বাড়বে।
মিশর ও উপসাগরীয় দেশ যদি যোগ দেয়, তাহলে সেনাবাহিনী ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়বে। হামাদ বিন জাসিমের প্রস্তাব অনুসারে, এটি আরব-ইসলামিক ঐক্য গড়বে।
সমগ্র মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা হস্তক্ষেপ কমবে, অর্থনৈতিক-সামরিক সহযোগিতা বাড়বে। এটি ১৯৭০-এর দশকের পর সবচেয়ে বড় মুসলিম ঐক্যের পদক্ষেপ হতে পারে।

এই জোটের সম্ভাব্য ক্ষতি ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য কমবে, হামলার প্রতিরোধ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমবে, অস্ত্র বিক্রি হ্রাস পাবে। ন্যাটোর দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আর এই দিকে ইরানের স্থিতিশীলতা আসতে পারে,কারণ এই জোটটি ইরান বিরোধী না আর কিছু কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আরো শক্ত শালী হয়ে উঠবে ।
ভারতের ক্ষেত্রে কিছু ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে কাশ্মীর ইস্যুতে নিয়ে,কারণ পাকিস্তান শক্তিশালী হয়ে উঠবে তার সাথে যুক্ত আছে তুরুষ্ক, কারণ এর আগেও তারা কাশ্মীরের পক্ষে ছিল।
মুসলিম বিশ্বের জন্য বিপুল পরিবর্তন এই জোট মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড়। এটি পশ্চিমা নির্ভরতা থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাবে। তবে সফলতা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।হামাদ বিন জাসিমের প্রস্তাব অনুসারে, যদি মিশর ও উপসাগরীয় দেশ যোগ দেয়, তাহলে এটি একটি বৃহত্তর ‘আরব-ইসলামিক ন্যাটো’ হয়ে উঠতে পারে। এটি শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঐক্যেরও সূচনা করবে।এই উন্নয়ন মুসলিম দেশগুলোর জন্য নতুন যুগের সূচনা হতে পারে, কিন্তু সতর্কতা ও ঐক্য ছাড়া এটি অস্থিরতাও বাড়াতে পারে। বিশ্ব এখন এই জোটের দিকে তাকিয়ে আছে।

